চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচারে শিশুদের ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ মাদক কারবারি চক্র । দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের পেটের ভেতর ইয়াবা ঢুকিয়ে পাচার করা হচ্ছে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় । সম্প্রতি আনোয়ারায় দুই শিশুর পেট থেকে ৬ হাজার ৬১৫ টি ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে শিশুদের ‘ মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র । পাঁচ বছর আগেও একই কায়দায় পাঁচ রোহিঙ্গা শিশুর পেট থেকে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছিল । তবে বারবার শিশুদের আটক ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে । গত শনিবার দিবাগত রাত ২ টার দিকে আনোয়ারা উপজেলার তৈলারদ্বীপে কক্সবাজার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চট্টগ্রামে আসা শারমিন আকতার ওরফে ইসমত আরা নামে এক নারীকে আটক এবং ৯ ও ১২ বছর বয়সী দুই শিশুকে হেফাজতে নেয় র্যাব -৭ । এরপর তাঁদের চমেক হাসপাতালে নেওয়া হলে শিশু দুটির পেট থেকে ৬ হাজার ৬১৫ টি ইয়াবা বড়ি বের করে আনা হয় । র্যাবের তথ্যে , শিশু দুটির বাড়ি বান্দরবানের
চট্টগ্রাম
» দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে শিশুদের ব্যবহার করছে চক্রটি । » ৫ বছর আগে পাঁচ রোহিঙ্গা শিশুর পেটে পাওয়া যায় ইয়াবা । » মূল হোতাদের না খোঁজায় এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে দাবি মানবাধিকারকর্মীদের । » চক্রের হোতাদের ধরতে র্যাবের অভিযান চলছে : র্যাব
আলীকদম উপজেলায় । অন্যদিকে শারমিনের বাড়ি কক্সবাজার চকরিয়া থানার পূর্ব ডোমখালী গ্রামে । র্যাব - ৭ - এর লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো . তাওহিদুল ইসলাম বলেন , কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের একটি সংঘবদ্ধ মাদক কারবারি চক্র দীর্ঘদিন ধরে অসহায় এবং হতদরিদ্র শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের শরীরে করে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় ইয়াবা পাচার করে আসছে । তাওহিদুল বলেন , গ্রেপ্তার নারী মাসে আট হাজার টাকা এবং বাড়িতে বাজার করে দেওয়ার কথা বলে ওই দুই শিশুকে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা থেকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে যায় । সেখানে তাদের ইয়াবাভর্তি পলিথিনের পোঁটলাগুলো
গিলিয়ে তা পাচার করছিল । শারমিন ইতিপূর্বে আরও দুবার একই শিশুদের ব্যবহার করে পেটের ভেতরে করে ইয়াবার চালান চট্টগ্রামে নিয়ে এসেছিলেন বলে জানান এই র্যাব কর্মকর্তা । তিনি বলেন , চক্রের হোতাদের ধরতে র্যাবের অভিযান চলছে ।
পাঁচ বছর আগে প্রথম ধরা পড়ে ২০২১ সালের ৯ মে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে হেফাজতে নেওয়া পাঁচ রোহিঙ্গা শিশুর পেটের ভেতর থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ইয়াবা পাওয়া যায় । র্যাব - ৭ - এর তৎকালীন উপ- অধিনায়ক মেজর নাসির উল হাসান খান তখন বলেন , টেকনাফের রোহিঙ্গা লেদা ক্যাম্পের এসব শিশুর শরীরে
এসব ইয়াবা ঢোকানো হয়েছিল । প্রতি হাজার ইয়াবা বহনের জন্য তাদের ১০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা ছিল । আরও অন্তত দুবার এভাবে তারা ইয়াবার চালান চট্টগ্রাম পৌঁছে দেয় বলে আটক শিশুরা জানিয়েছে । চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন , সাধারণত ইয়াবা প্লাস্টিকে পেঁচিয়ে ছোট ছোট ক্যাপসুলের মতো বানিয়ে গিলে পেটে নেওয়া হয় । এভাবে মাদক বহন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ । কোনো ক্যাপসুল দুর্ঘটনাবশত অন্ত্রে আটকে গেলে বা ফুটা হয়ে গেলে বহনকারীর গুরুতর শারীরিক জটিলতা এমনকি তাৎক্ষণিক মৃত্যুও হতে পারে । তিনি বলেন , ক্যাপসুলের ভেতরের মাদকদ্রব্য শরীরে ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত বিষক্রিয়া হতে পারে । এ ধরনের পরিস্থিতিতে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয় । ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা জানা গেছে , চমেক হাসপাতালে দুই শিশুর পেটের ভেতর থেকে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় র্যাব বাদী হয়ে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানায় একটি মামলা করেছে । পাঁচলাইশ থানার ওসি মোজাম্মেল হক বলেন , দুই শিশু এবং ওই নারীকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে ।
শিশুদের পেটে ইয়াবার পোঁটলা শেষ পৃষ্ঠার পর শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলে পেটে করে ইয়াবা পাচারে জড়িত নায়কদের কখনো খুঁজে বের করা হয় না বলে জানান বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের ( বিএইচআরএফ ) মহাসচিব এ এইচ এম জিয়া হাবীব আহসান । তিনি বলেন , ‘ শিশুদের পেটে মাদক বহন বা গর্হিত কাজে ব্যবহার করলে তারা অপরাধী হবে না , অপরাধী তাঁরাই হবেন , যাঁরা শিশুদের ব্যবহার করছেন । তিনিই হবেন মূল আসামি । তাঁদের কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন এবং আমাদের প্রচলিত আইনেই এ ধরনের শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে । ' হোতাদের না খোঁজায় এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে জানিয়ে জিয়া হাবীব বলেন , ‘ এখানে দেখা যায় , যার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে , তাকেই আসামি করা হয় । কে তাকে দিল সেটা , খতিয়ে দেখা হয় না । যার কারণে এসব শিশুর জীবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে ।
তাদের যদি ব্যবহার করা না হতো , তারা কখনোই এই মাদক কারবারে ভিক্টিমাইজ হতো না । ”
পর্যবেক্ষণে যা বলেছেন আদালত গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামে ২১ টি ইয়াবাসহ আটক ১৬ বছরের এক ছিন্নমূল শিশুর বিরুদ্ধে করা মামলার আদেশে আদালত বলেছেন , শিশু বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয় ; বরং শিশুকে সংশোধন , সুরক্ষা ও সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা । আদালতের পর্যবেক্ষণে , শিশুটি সংগঠিত মাদক কারবারি নয় ; বরং দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাকে সামান্য টাকার বিনিময়ে মাদক বহনে ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় । প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । আদালত আরও বলেছেন , কোনো শিশুকে মাদক বহনে ব্যবহার করা শিশু আইন , ২০১৩ - এর ৭৯ ( ১ ) ধারায় স্বতন্ত্র অপরাধ ।