দেশে প্রতিবছর এক কোটি টনের বেশি আলু উৎপাদিত হয়। এর বড় একটি অংশ কৃষকরা সরাসরি বাজারে বিক্রি করেন।
সংশ্লিষ্ট সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে দেশের ৩৫১টি কোল্ড স্টোরেজে প্রায় ৩৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪০০টির বেশি বাণিজ্যিক কোল্ড স্টোরেজে মোট ধারণক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টন।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অধীনে বীজ আলু প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য সারা দেশে ৩০টি কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে। তবে এখানে শুধু সরকারিভাবে আলুবীজ রাখা হয়। গত মৌসুমে দেশে এক কোটি ১০ লাখ টনেরও বেশি আলু উৎপাদিত হয়েছিল।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে কোল্ড স্টোরেজে রাখাসহ কৃষকের প্রতি কেজি আলুর খরচ ১৮ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত পড়ে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে অনেক এলাকায় কৃষকরা এর চেয়ে কম দামে আলু বিক্রি করেছেন। ফলে উৎপাদন ভালো হলেও কৃষকের লাভ নিশ্চিত হচ্ছে না।
ভাড়া নিয়ে কৃষকের ক্ষোভ : আলু সংরক্ষণের খরচ নিয়ে কয়েক বছর ধরেই কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন গত বছর হিমাগারে আলু রাখার ভাড়া কেজিপ্রতি আট টাকা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন কৃষকরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গত বছর কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া কেজিপ্রতি ছয় টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হিমাগার ভাড়া বেড়ে গেলে এর প্রভাব শুধু কৃষকের ওপর পড়ে না; শেষ পর্যন্ত খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ে। কারণ সংরক্ষণ, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় যোগ হয়ে আলুর বিক্রয়মূল্য বাড়ে। গত আগস্ট মাসে আলু চাষিরা সংবাদ সম্মেলন করে আগামী মৌসুমে হিমাগারভাড়া কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ চার টাকা নির্ধারণের দাবি করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে রাজশাহীর চাষিরা অভিযোগ করেন, হিমাগার মালিকরা অযৌক্তিকভাবে ফের আলু সংরক্ষণে হিমাগারভাড়া বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধিতে চাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আলু বিক্রি করে চাষিরা কোনো লাভ তো করতে পারছেই না, বরং হিমাগারভাড়া মেটাতেই সব শেষ হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় আলুর হিমাগার পরিচালনা অসম্ভব বলছেন মালিকরা। তাঁরা বলছেন, প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণে খরচ দাঁড়ায় সাত টাকা ১১ পয়সা। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফা আজাদ চৌধুরী বাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, আগে ভাড়া ছয় টাকা ৭৫ পয়সা ছিল। সম্প্রতি আবার সেটি কমিয়ে করা হয়েছে ছয় টাকা। ২৫টি জেলার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন খরচ হিসাব করে এই টাকা কমানো হয়েছে। এতে মালিকরা ১৭২ কোটি টাকা থেকে বঞ্চিত হবেন। তিনি বলেন, ‘ভাড়া কমানোর জন্য আমাদের কোল্ড স্টোরেজের ওপর হামলা করা হচ্ছে। আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে। আমরা নিরুপায়।’ ৩৪ লাখ টনের মধ্যে এখনো ২৩ লাখ টন আলু কোল্ড স্টোরেজে জমা আছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘লোকসান দিয়ে তো আমরা ব্যবসা করতে পারব না।’
হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কেজিপ্রতি ৭৫ পয়সা কমিয়ে ছয় টাকা করায় প্রায় ১৭২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতির মুখে পড়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। সংগঠনটির মতে, চলতি বছর হিমাগারশিল্পে বিদ্যুতের দাম ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় বাড়লেও হিমাগার মৌসুমের মাঝপথে এসে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর তড়িঘড়ি করে ভাড়া কমিয়েছে। আয় কমে যাওয়ায় মালিকরা ব্যাংকঋণ পরিশোধ করতে পারবেন না। ফলে অনেক হিমাগার বন্ধ হয়ে দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংগঠনটি।