Image description

বিচারাঙ্গনের অনিয়ম ও দুর্নীতি দূরীকরণে পদক্ষেপ নিতে প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুবউদ্দিন খোকন। তিনি বলেছেন, আমরা ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। অনেকের সঙ্গে বৈঠক করেছি। বাইরেও অনেক আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছি। সবার মধ্যেই বিচার বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তিনি বলেন, মামলার তদবিরে দুর্নীতি, লিস্ট আনতে দুর্নীতি, শুনানিতে দুর্নীতি, কিছু কিছু জুডিশিয়াল অফিসারের দুর্নীতি—এমন অভিযোগ আইনজীবীদের কাছ থেকে আসছে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে লিস্ট আনতে দুর্নীতি, আপিল বিভাগে লিস্ট আনতে দুর্নীতি—এসব বিষয় নিয়েও আইনজীবীরা কথা বলেছেন। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বার সভাপতি।

প্রধান বিচারপতির কাছে দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি মুক্ত করতে হবে। অন্য জায়গায় দুর্নীতি থাকতে পারে, কিন্তু দুর্নীতির বিচার হয় সুপ্রিম কোর্টে। আর সুপ্রিম কোর্টে যদি বিচারপ্রার্থীদের মামলা করতে গিয়ে তদবির করতে হয়, সব জায়গায় টাকা দিতে হয়—এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

বার সভাপতি বলেন, আবারও আমি প্রধান বিচারপতির কাছে দাবি করছি—আপিল বিভাগ, হাইকোর্ট বিভাগ এবং সারা দেশের প্রত্যেকটি আদালতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। হাইকোর্ট বা নিম্ন আদালতে যেসব অনিয়ম হচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব জুডিশিয়াল অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, এই সুপ্রিম কোর্টে গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের সময় অনেক বিচারপতির আচরণ রাজনৈতিক ছিল। আজ আড়াই বছর হয়ে গেছে। একজন প্রধান বিচারপতি চলে গেছেন, আরেক জন প্রধান বিচারপতি এসেছেন; কিন্তু তারা এখনো সুপ্রিম কোর্টে বহাল তবিয়তে আছেন। তাদের আচরণ ও কনডাক্ট বিবেচনা করে আমি মনে করি, আমি দাবি করি—তাদের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে প্রেরণ করা হোক। মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন অবকাশকালীন ছুটির পর আপিল বিভাগে কমপক্ষে তিনটি বেঞ্চ গঠন এবং প্রয়োজনে নতুন বিচারপতি নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, মামলায় তথ্য গোপন ও প্রতারণার অভিযোগে নবীন এক আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা কস্ট আরোপের ঘটনায় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বাদানুবাদে জড়ান বার সভাপতি মাহবুবউদ্দিন খোকন। মঙ্গলবার প্রকাশ্য আদালতে এমন ঘটনার সৃষ্টি হলে এজলাস ছেড়ে যান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও আপিল বিভাগের বিচারপতিগণ। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে ঘটনার পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য আসে বিভিন্ন মহল থেকে।

ঐ ঘটনা নিয়ে বুধবার জাতীয় সংসদেও আলোচনা হয়। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান পয়েন্ট অব অর্ডারে প্রসঙ্গটি সংসদে তোলেন। জবাবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সঙ্গে ঘটেছে। এটা একটা ইনফরমাল বডি। রাষ্ট্রের কোনো অর্গানের মধ্যে পড়ে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আমি ঐ ঘটনাটিকে বৈধতা দিচ্ছি। তিনি বলেন, বিচারালয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। এটা বার ও বেঞ্চের সম্পর্কের বিষয়। অনেক সময় দেখা যায় আমরা আইনজীবী হিসেবে কখনো প্রতিপক্ষ আইনজীবীর সঙ্গে, আবার কখনো বেঞ্চের সঙ্গে ফাইট করছি। কিন্তু বাইরে গিয়ে আবার এক হয়ে যাই। তবে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে কেউ ঘটাবেন না বলে তিনি মনে করেন। আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর মাহবুবউদ্দিন খোকন বক্তব্য দিতে দাঁড়ান। তখন স্পিকার বলেন, এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এতে সংসদ কনভিন্সড।

গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার খোকন বিচারাঙ্গনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় ছাড়াও আইনজীবীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়েও বক্তব্য রাখেন। তিনি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য তৈরি করা অস্থায়ী টিনশেড স্থাপনাকে ‘বস্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে তা উচ্ছেদের দাবি জানান। বার সভাপতি বলেন, এই সুপ্রিম কোর্টে ‘বস্তি’ থাকবে কেন? আইনজীবীদের বসার জায়গা নেই, হাঁটার জায়গা নেই। আমাদের কোনো বিল্ডিং নেই। আগামী এক মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গণ থেকে বস্তি উচ্ছেদ করতে হবে। এক মাসের মধ্যে যদি ‘বস্তি’ উচ্ছেদ না করা হয়, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। আর যদি না হয়, পরবর্তী সময়ে আইনজীবীরা কোনো পদক্ষেপ নিলে এর দায়-দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি বহন করবে না।

সেক্রেটারি থেকেও আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অ্যাটর্নি জেনারেল

কীভাবে অবস্থান নেন

বিচারপতিদের এজলাস ত্যাগের ঘটনা নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য সম্পর্কে বার সভাপতি বলেন, আমি সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি। সুপ্রিম কোর্টে আমাকে আইনজীবীরা ১১ বার নির্বাচিত করেছেন। বার কাউন্সিলে সারা বাংলাদেশের আইনজীবীরা তিন বার ৯১ শতাংশ, ৯২ শতাংশ ভোট দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করেছেন। আমি আইনজীবীদের কথা বলব, বিচারপতিদের কথা বলব—প্রধান বিচারপতির কাছে। তিনি বলেন, এখানে অ্যাটর্নি জেনারেলের কোনো কাজ আছে? তিনি কে? তার বক্তব্যই অপ্রাসঙ্গিক। আমাদের আলোচনা, আমাদের দাবি—কোনোটিতেই তিনি প্রাসঙ্গিক নন। তার বক্তব্য অনভিপ্রেত। বার সভাপতি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল তো সুপ্রিম কোর্ট বারের সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি কীভাবে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন? আমি বিস্মিত, আমি হতবাক ও বিস্মিত।