Image description

প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার জোট ও রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী থেকে রাজনীতিতে তার পথচলা শুরু হয়। প্রথমে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, পরে দীর্ঘদিন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মন্ত্রী। সেই বিএনপি ছেড়ে ২০০৬ সালে গঠন করেন নতুন দল। এরপর কখনো বিএনপির সঙ্গে, কখনো আলাদা অবস্থান, আবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ফেরা ও যুগপৎ আন্দোলনের অংশীদার হিসেবেও দেখা গেছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন ও মতবিরোধের জেরে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক পথচলায় আবারও নতুন মোড় এসেছে। অলি আহমদের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক সব সময় মসৃণ ছিল না। বিভিন্ন সময় বিএনপির নেতৃত্ব ও কৌশলের সমালোচনা করেছেন তিনি। ২০১৯ সালে বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেছিলেন এলডিপি চেয়ারম্যান।

২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত জোটের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেয় তার দল এলডিপি। জোট তাকে সাতটি আসন ছাড় দিলেও কোনো আসনেই এলডিপির প্রার্থী জয় পাননি। এর কয়েক মাস পরই রাজনীতির আরেক নতুন সমীকরণে অলি আহমদকে সামনে আনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। ২০২৬ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাকে জোটের প্রার্থীও করা হয়। অর্থাৎ যে বিএনপি রাজনীতি দিয়ে অলি আহমদের উত্থান, সেই বিএনপির প্রার্থীর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তাকে দাঁড় করানো হয়েছিল।

জানা গেছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য সংসদ ও সংসদের বাইরে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে জামায়াতে ইসলামী। অতীতে জামায়াতে কোনো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। কিন্তু অলি আহমদ রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাই যে কোনো ইস্যুতে তাকে সামনে রেখে সমালোচকদের কিছুটা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছে জামায়াত। একাধিক সূত্র জানায়, জোটের শুরুর দিকে এলডিপির পক্ষ থেকে আগেই দাবি ছিল, জোট ক্ষমতায় এলে কর্নেল অলিকে রাষ্ট্রপতি করতে হবে। তখন জামায়াতসহ সব দলই আশ্বাস দিয়েছিল। এসব কারণে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়।

এলডিপির দাবি, সবশেষ বিএনপির সঙ্গে জোট ছাড়ার কারণে বিএনপির শীর্ষ নেতারা দায়ী। লন্ডনে থাকাকালীন প্রতি মাসে বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান কর্নেল অলির সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েসের উত্তর দিতেন। তিনি আর নির্বাচনে করবেন না এটাও বিএনপি চেয়ারম্যানকে আগেই জানিয়েছিলেন। কিন্তু তপশিল ঘোষণার পর তারেক রহমান, বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ প্রায় দুই মাস তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। মোবাইল করলেও তারা ফোন রিসিভ করতেন না। এসব কারণেই এলডিপি জোট থেকে বেরিয়ে গেছে।

এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। এর আগে গত জুন মাসে তিনি কালবেলাকে বলেন, দল হিসেবে আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, আগের থেকেও শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি হলো খাওয়া-পাওয়ার রাজনীতি। আদর্শগত রাজনীতি শুধু ইসলামী দলগুলো করে। সৎভাবে রাজনীতি করলে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন। অলি আহমদ বলেন, আমার সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি-মন্ত্রী-এমপি মিলে ৩২ জন ছিল। এদের মধ্যে প্রায় ২৭ জন মারা গেছে। তাদের জায়গাগুলোও পূরণ করা যায়নি। কারণ এখন দলে যোগ দেওয়ার আগেই শর্ত থাকে, তাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে কি না। তার পরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

আর দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. বিল্লাল হোসেন মিয়াজি কালবেলাকে বলেন, কর্নেল অলি আহমদকে বিএনপি জোটে প্রাপ্ত মর্যাদা না দেওয়ার কারণে আমরা অন্য জোটে যোগ দিয়েছি। কোনো লোভ-লালসার জন্য জন্য নয়। কর্নেল অলির সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে তিনি হয়তো কোথাও যেতেন না।

তিনি বলেন, কর্নেল অলি জামায়াতের কারণে ২০০৬ সালে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেননি। বরং দুর্নীতির কারণে তিনি দল ছেড়েছিলেন। পরে আবারও ২০১২ সালে জোটে যোগদান করার পর প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৩-১৪ সালে আন্দোলনের সময়েও তিনি জেল খেটেছেন। কারাগার থেকে মুক্তির পর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াকে নিয়ে বই লিখেছেন। খালেদা জিয়ার কারাগারে গেলেও এলডিপির নেতাকর্মীরা আন্দোলন করেছেন।

জিয়াউর রহমানের হাত ধরে রাজনীতিতে পথচলা: কর্নেল (অব.) অলি আহমদ রাজনীতিতে আসার আগে ছিলেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তিনি। জিয়াউর রহমানের পরিচালিত জেড ফোর্সে অধীনে যুদ্ধ করেন এবং বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ‘বীরবিক্রম’ খেতাব পান তিনি। সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হলে তিনি তার একান্ত সচিব ছিলেন। ১৯৭৭-৭৮ সালে জিয়াউর রহমান যখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় অলি আহমদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭৮ সালে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি’ প্রতিষ্ঠার পর জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে কর্নেল অলি বিএনপিতে যোগদান করেন। তখনো তার চাকরির বয়স ৯ বছর ছিল।

১৯৮০ সালে উপনির্বাচনে অংশ নিয়েও প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাজনীতিতে তার উত্থানের পুরোটাই সময়ই বিএনপির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে ওঠেন দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ১৯৮৪ সালে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। ১৯৯১ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির প্রথম সরকারে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পরে ১৯৯৬ সালের দুটি সংসদ নির্বাচনেই বিএনপির সংসদ সদস্য হয়েছিলেন অলি আহমদ।

বিএনপি থেকে পদত্যাগ, নতুন দল গঠন: ২০০১ সালে নির্বাচনের আগে চারদলীয় জোট গঠনকে কেন্দ্র করে বিএনপির প্রথম দূরত্ব তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য হলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি তিনি। কিন্তু মন্ত্রিসভায় জায়গা পান জামায়াতের তৎকালীন দুই শীর্ষ নেতা। এসব কারণের পাশাপাশি দলের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা সময়ে অলি আহমদের অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। বিশেষ করে চারদলীয় জোটে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়েও তার আপত্তি ছিল বলে সেই সময়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। ওই সময় অলি আহমদের সমর্থকরা মনে করতেন, জামায়াতের বিরোধিতার কারণেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে স্থান পাননি অলি।

এরই ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির পদসহ সব পদ থেকে পদত্যাগ করেন অলি আহমদ। তার সঙ্গে বিএনপির আরও কয়েকজন নেতাও সেই সময় দল ছাড়েন। ওই বছরের ২৬ অক্টোবর সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ‘বিকল্পধারা’র সঙ্গে সমঝোতা করে গঠন করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। প্রতিষ্ঠার সময় প্রয়াত বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন সভাপতি, অলি আহমদ নির্বাহী সভাপতি এবং প্রয়াত অবসরপ্রাপ্ত মেজর এম এ মান্নান মহাসচিব। সেই সময়ে এলডিপিতে বিএনপির ৩২ জন সাবেক মন্ত্রী ও এমপিও যোগদান করেছিল। নতুন এই রাজনীতি দলকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা তৈরি হয়েছিল। তবে বি. চৌধুরী ও অলি আহমদের এই পথচলা বেশিদূর এগোয়নি। মতপার্থক্যের কারণে ২০০৭ সালেই অলি আহমদের ‘এলডিপি’ ও বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ‘বিকল্পধারা’ আলাদা হয়ে যায়। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে এককভাবে এলডিপির ‘ছাতা’ প্রতীকে নির্বাচন করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে অলি আহমদ সংসদ সদস্য হন।

আবার বিএনপি জোটে ফেরা: বিএনপি ছেড়ে নতুন দল গঠন করলেও অলি আহমদের রাজনৈতিক পথ শেষ পর্যন্ত বিএনপি থেকে পুরোপুরি আলাদা থাকেনি। প্রায় ৬ বছর পর আবারও বিএনপি জোটে যোগদান করেন কর্নেল অলি। ২০১২ সালে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট গঠিত হলে যোগ দেয় এলডিপি। এরপর বিএনপির সঙ্গে থেকেই ২০১৪ সালের নির্বাচন করেছিল এলডিপি। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতেও তাকে সক্রিয় দেখা গেছে। এর পর ওই বছরের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ‘ছাতা’ প্রতীকে নির্বাচন করেন অলি আহমদ। সেই নির্বাচনে তিনি প্রথমবার পরাজিত হন। সেই সময় ২০ দলীয় জোটের মুখপাত্রের দায়িত্বে ছিলেন অলি আহমদ। কিন্তু নির্বাচনের পর আবারও বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে। ২০১৯ সালে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ না নেওয়ার পক্ষে ছিলেন তিনি। এর পর ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ২০ দলীয় জোট বিএনপি ভেঙে দেয়। এর পর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে অংশীদার হয়েছিল এলডিপি।

২০২৫ সালে নতুন মেরূকরণ ও জামায়াত জোটে যোগদান: ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণ শুরু হলে বিএনপির সঙ্গে এলডিপির দূরত্ব আবার বাড়তে থাকে। বিশেষ করে সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কাছ থেকে ১৪টি আসন চেয়েছিল এলডিপি। কিন্তু বিএনপি এত আসনে ছাড় না দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের দেড় মাস আগে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন অলি আহমদ। এর চার দিন পর ২৮ ডিসেম্বর জামায়াত জোটে যোগদান করেন। তবে এবারের রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল রাজনৈতিক মহলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কারণ, একসময় বিএনপির সঙ্গে জোটে জামায়াতের প্রভাব নিয়ে অলি আহমদের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। সেই তিনিই প্রায় দুই দশক পর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন। অলি আহমদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে আরেকটি বড় অবস্থান পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন অনেকে।

তবে নির্বাচনে জোট থেকে ৭টি আসনে ছাড় পেলেও দলের সব প্রার্থীই পরাজিত হয়েছেন। এমনকি চার দশক পর নিজের আসন চট্টগ্রাম-১৪ থেকে তার ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুক বিএনপির জসিম উদ্দিন আহমেদের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন। এর মধ্যে রাজনীতি দুই কূল হারিয়েছেন তিনি।