নিয়োগ, অর্গানোগ্রামের বাইরে পদোন্নতি এবং প্রাপ্যতার অতিরিক্ত ভাতা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে। শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় এমন বেশ কিছু আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। যেখানে নিয়ম না মেনে নেয়া সিদ্ধান্তের আর্থিক দায় পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল ও সরকারি অর্থের ওপর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩২টি খাতে মোট ২ হাজার ৩৯৬ কোটি ৯৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৯৮ টাকার অডিট আপত্তি তুলেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। এর মধ্যে ৪০টি খাতকে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম বা এসএফআই হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব খাতে আপত্তির পরিমাণ ৩৬৫ কোটি ১ লাখ ২১ হাজার ৮৬৮ টাকা।
অডিটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনবল ব্যবস্থাপনা ও বেতন-ভাতা সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তেই বড় অঙ্কের আপত্তি তৈরি হয়েছে। অর্গানোগ্রামের বাইরে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত বেতন-ভাতা পরিশোধের ঘটনায় ৪৭ কোটি ৩৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৮ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। আবার বিধিবহির্ভূতভাবে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশন দেয়ায় অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৫৪ হাজার ৮১৯ টাকা।
নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের তথ্য রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে চাওয়া যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করায় ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৪ টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্গানোগ্রামের বাইরে বা অতিরিক্ত পদে নিয়োগের মাধ্যমে আরও ৪৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৪৭ টাকা ব্যয়ের আপত্তি রয়েছে।
বিভিন্ন ধরনের ভাতার ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিভিন্ন ভাতা দেয়ায় ৩২ কোটি ৭৪ লাখ ৬ হাজার ৩৪৮ টাকার আপত্তি এসেছে। এর মধ্যে শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব ভাতা বাবদ দেয়া ১০ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫৪ টাকা এবং বই ভাতা বাবদ ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৭৭ টাকা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিককাল ভাতা দেয়ার বিষয়টিও নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের ভাতা দেয়ায় আপত্তির পরিমাণ ৩৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩ হাজার ৫৩৪ টাকা। একইভাবে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত বা প্রাপ্যতা ছাড়াই সম্মানী দেয়ার ঘটনায় ৬৪ লাখ ৩ হাজার ৫৫৫ টাকার আপত্তি রয়েছে।
গবেষণা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অডিট অধিদপ্তর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও ডিন ভাতা হিসেবে ৫ কোটি ৫৩ লাখ ৮৯ হাজার ১৮৭ টাকা দেয়ার তথ্য মিলেছে। অডিটের মতে, সংশ্লিষ্ট বিধিতে স্বশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গবেষণা ভাতা পাওয়ার বিধান নেই। শিক্ষা ছুটিতে থাকা শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট দেয়ার ঘটনাও নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে অতিরিক্ত বেতন দেয়ায় ১ কোটি ৯০ লাখ ১১ হাজার ৩৮৬ টাকা আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। বেতন-ভাতার বাইরেও বাড়িভাড়া ও অবসর সুবিধা নিয়ে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আপত্তি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বসবাস করেও নির্ধারিত হারের চেয়ে কম বাড়িভাড়া কর্তন করায় ২০ কোটি ৪২ লাখ ১৭ হাজার ২৯১ টাকা এবং প্রাপ্যের চেয়ে বেশি বাড়িভাড়া দেয়ায় ১৪ কোটি ৬২ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৬ টাকার আর্থিক ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে অবসর গ্রহণের বয়স ৫৯ বছরের বেশি গণনা করে অতিরিক্ত বেতন-ভাতা ও ছুটি নগদায়ন সুবিধা দেয়ার ঘটনায় ২১ কোটি ৯২ লাখ ৩৭ হাজার ১৪ টাকার আপত্তি রয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কাজ শেষ না করেও ঠিকাদারদের পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বাজেয়াপ্ত না করায় ৫৭ কোটি ৯১ লাখ ৩ হাজার ৮২৩ টাকা এবং চুক্তিমূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত বিল দেয়ায় ৩০ কোটি ৯৫ লাখ ৬২০ টাকার আপত্তি তুলেছে অডিট।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ৭৮টি নন-এসএফআই খাতে ২ হাজার ৩১ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার ৩০ টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে। এসবের মধ্যে দোকানভাড়া বকেয়া, অগ্রিম অর্থ সমন্বয় না করা, বাজেটের বাইরে ব্যয়, গবেষণা প্রকল্পের প্রতিবেদন জমা না দেয়া, এফডিআর করতে সিন্ডিকেটের অনুমোদন না নেয়া এবং অব্যয়িত প্রকল্পের অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত না দেয়ার মতো বিষয় রয়েছে।
এই অডিট আপত্তিগুলো এখনো সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাইনি। অধিদপ্তর জানায়, এই প্রতিবেদন মেলার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জবাব দেয়ার পাশাপাশি অনেকক্ষেত্রে সংশোধনেরও সুযোগ পাবে। অডিট আপত্তি মানেই সবসময় দুর্নীতি নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা অধিশাখা) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান বলেন, আপত্তির বিষয়ে জবাবের সুযোগ মিলবে। যথাযথ জবাব না মিললে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অডিট অধিদপ্তরের আপত্তির আওতায় আসা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউজিসি।