Image description

ধোঁয়া ওঠা ফুটন্ত গরম পানীয় পানের অভ্যাস খাদ্যনালির ক্যানসারের (স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা) ঝুঁকি তিন গুণেরও বেশি বাড়িয়ে দেয় বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। এই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বিশেষ করে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মানুষেরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

যুক্তরাজ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি খোদ বাংলাদেশেও দৈনন্দিন সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মাত্রাতিরিক্ত গরম চা পানের অভ্যাস দীর্ঘদিনের। এই অভ্যাসই এখন খাদ্যনালিতে মারাত্মক টিউমার বা ক্যানসার সৃষ্টির প্রধান অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। 

বুধবার যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের পপুলেশন হেলথ বিভাগ পরিচালিত এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ইউকে বায়োব্যাংক ও মিলিয়ন উইমেন স্টাডি’র আওতায় যুক্তরাজ্যের প্রায় ৯ লাখ ৮০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনযাত্রা ও চিকিৎসা তথ্য বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা চালানো হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন, চা বা কফির ভেতরের কোনও রাসায়নিক উপাদানের কারণে নয় বরং অতি উচ্চ তাপমাত্রার তরল গলায় ঢালার কারণে খাদ্যনালির অভ্যন্তরীণ দেয়াল পুড়ে গিয়েই এ ক্যানসারের উৎপত্তি ঘটে। 

অন্ননালির ক্ষত ও ভৌগোলিক বিপৎসীমা

বিশ্বজুড়ে এপিডেমিওলজিস্ট বা রোগতত্ত্ববিদরা দীর্ঘদিন ধরেই খাদ্যনালির স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা শনাক্তে ইসোফেজিয়াল ক্যানসার বেল্ট বা একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বলয় লক্ষ করে আসছেন। উত্তর চীন, মধ্য এশিয়া ও ইরানের গোলেস্তান প্রদেশ হয়ে এই অঞ্চলটি বাংলাদেশ, উত্তর ভারত ও পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত। এসব অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রথাগতভাবেই ফুটন্ত গরম চা সঙ্গে সঙ্গে চুমুক দিয়ে পান করতে অভ্যস্ত, যেখানে পানীয়ের তাপমাত্রা প্রায়ই ৬৫ থেকে ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি থাকে। অক্সফোর্ডের এই নতুন গবেষণা প্রমাণ করেছে, ব্রিটেনে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের মধ্যেও একই ধরনের অভ্যাস বজায় থাকায় তাদের ক্ষেত্রেও শারীরিক ক্ষতির হার সমানভাবে উচ্চ। 

 

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা উষ্ণ বা সহনীয় তাপমাত্রায় চা-কফি পান করেন, তাদের তুলনায় যারা খুব গরম পানীয় পানে অভ্যস্ত, তাদের খাদ্যনালির ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩ গুণ বেশি। যারা সাধারণ গরম অবস্থায় পান করেন, তাদের ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকি প্রায় ১ দশমিক ৭ গুণ। দিনে ছয় কাপ বা তার বেশি অতি গরম পানীয় পানকারীদের ক্ষেত্রে এই বিপদের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শহর থেকে গ্রামের হাট-বাজারের টং দোকান কিংবা গৃহস্থালি সবখানেই টগবগে ফুটন্ত লাল চা বা দুধ চা সরাসরি কাচের গ্লাস বা কাপে পরিবেশনের রেওয়াজ বহু পুরনো। অনেক বাংলাদেশিই গরম চা দীর্ঘক্ষণ রেখে ঠান্ডা হয়ে যাওয়া একেবারেই পছন্দ করেন না বরং ধোঁয়া ওঠা অবস্থায় দ্রুত চুমুক দেওয়াই সেখানে তৃপ্তির মূল অনুষঙ্গ।

প্যাথলজিস্টদের মতে, ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রার তরল যখন খাদ্যনালির অভ্যন্তরীণ কোমল কোষে আঘাত করে, তখন সেখানে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পোড়া ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এর ফলে অভ্যন্তরীণ কোষে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ শুরু হয় এবং কোষের স্বাভাবিক ক্ষয়পূরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। কয়েক দশক ধরে একটানা এমন তাপীয় আঘাত চলতে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত হতে গিয়ে জেনেটিক মিউটেশনের শিকার হয়, যা পরবর্তীতে মারাত্মক ক্যানসারে রূপ নেয়। 

ক্যানসারের ধরনে সুস্পষ্ট বিভাজন

খাদ্যনালির ক্যানসার মূলত দুই প্রকারের হয়ে থাকে-অ্যাডেনোকার্সিনোমা এবং স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা। অক্সফোর্ড পপুলেশন হেলথের জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিষয়ক এপিডেমিওলজিস্ট ও প্রধান গবেষক ড. কেরেন পেপিয়ার জানান, ফুটন্ত গরম পানীয় মূলত খাদ্যনালির ওপরের ও মধ্যবর্তী অংশের স্কোয়ামাস লাইনিংকে ধ্বংস করে। পশ্চিমা দেশগুলোতে গ্যাস্ট্রিক রিফ্লাক্স ও স্থূলতার কারণে অ্যাডেনোকার্সিনোমার হার বেশি হলেও বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে জিনগত ও অভ্যাসগত কারণে স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমার ঝুঁকিই বহুগুণ বেশি দেখা যায়। 

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আওতাধীন ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরের যেকোনও গরম পানীয়কে মানবদেহের জন্য সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিল। সাধারণত পশ্চিমা দেশগুলোতে চা-কফি পানের আদর্শ তাপমাত্রা থাকে ৬০ ডিগ্রির কাছাকাছি। তবে বাংলাদেশিদের অতি গরম চা পানের অভ্যাস এই স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রাকে প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ঝুঁকি এড়াতে অভ্যাস বদল

খাদ্যনালির এই প্রাণঘাতী রোগ এড়াতে চা পানের অভ্যাস পুরোপুরি ত্যাগ করার প্রয়োজন নেই বলে আশ্বস্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। 

ক্যানসার রিসার্চ ইউকের স্বাস্থ্য তথ্য বিভাগের প্রধান ফিওনা ওজগুন জানান, চা তৈরির পর কাপে ঢেলে মাত্র চার থেকে পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করলেই বিকিরণ প্রক্রিয়ায় তরলের তাপমাত্রা নিরাপদ স্তরে নেমে আসে। এছাড়া চায়ে সামান্য ঠান্ডা দুধ বা ঠান্ডা পানি মেশালেও তাপমাত্রা তাৎক্ষণিকভাবে সহনীয় মাত্রায় পৌঁছায়। 

যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে নয় হাজার মানুষ খাদ্যনালির ক্যানসারে আক্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ধূমপান বর্জন ও মদ্যপান থেকে দুরে থাকাই এই ক্যানসার প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় উপায়। তবে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয়দের জন্য তাদের দৈনন্দিন চা পানের ধরনে সামান্য পরিবর্তন এনে ফুটন্ত গরমের বদলে কিছুটা জুড়িয়ে পান করাই হতে পারে খাদ্যনালির ক্যানসার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও সহজ উপায়।