Image description

আদালতকক্ষ মানেই শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার জায়গা। সেখানে বিচারপতিদের এজলাস ছেড়ে যাওয়া সাধারণ ঘটনা নয়।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যখন প্রধান বিচারপতিসহ বেঞ্চের সব বিচারপতি বিচারকাজ থামিয়ে এজলাস ছেড়েছেন।

এজলাসে উত্তেজনা, হট্টগোল কিংবা আদালত কক্ষের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি—বিভিন্ন কারণে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকাজ সাময়িকভাবে থেমে গেছে। এসব ঘটনায় প্রধান বিচারপতিসহ পুরো বেঞ্চ এজলাস ছেড়ে খাস কামরায় চলে গেছেন।

কখনো কারণ ছিল রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর মামলা ঘিরে আইনজীবীদের বিক্ষোভ, কখনো আদালতের অবকাঠামোগত সমস্যা, আবার কখনো বেঞ্চের কোনো একজন বিচারপতির অসুস্থতা। এমন অন্তত চারটি ঘটনা খুঁজে পাওয়া যায়।

 

খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে হট্টগোল, এজলাস ছাড়েন ছয় বিচারপতি

২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে আপিল বিভাগে উত্তেজনা তৈরি হয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ছয় বিচারপতির বেঞ্চে ওই মামলার শুনানি চলছিল।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আদালত পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করলে তাঁর পক্ষে দাঁড়ানো আইনজীবীরা ক্ষুব্ধ হন। তাঁরা দ্রুত জামিন শুনানির দাবি জানান। এক পর্যায়ে আদালত কক্ষে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতি এজলাস ছেড়ে যান। এর পরও দীর্ঘ সময় আইনজীবীদের একাংশ আদালত কক্ষে জামিন শুনানির দাবি জানাতে থাকেন।

 

ছাদ থেকে পানি, ২০২৪ সালে এজলাস ছাড়েন পাঁচ বিচারপতি

২০২৪ সালের ২১ মার্চ অন্য একটি কারণে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা এজলাস ছাড়েন।

তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি বিচারকাজ পরিচালনা করছিলেন। হঠাৎ এজলাসের ছাদ থেকে পানি পড়তে শুরু করে। পানি বিচারপতিদের বসার জায়গার কাছাকাছি পড়ায় আদালত কক্ষে অস্বস্তিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচ বিচারপতি এজলাস ছেড়ে যান। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবকাঠামো পরিস্থিতি পরীক্ষা করেন এবং বিচারপতিদের আসন সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় ১৮ মিনিট পর বিচারকাজ শুরু হয়।

এ ক্ষেত্রে এজলাস ত্যাগের পেছনে কোনো রাজনৈতিক বিষয় কিংবা আইনজীবীদের সঙ্গে মতপার্থক্য ছিল না। আদালত কক্ষের অবকাঠামোগত সমস্যাই ছিল বিচারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধের কারণ।

 

এজলাসে বিচারপতি অসুস্থ, থেমে যায় বিচারকাজ

একই বছরের ৩ জুলাই ঘটে আরেক ঘটনা। এবার কারণ বেঞ্চের একজন বিচারপতির অসুস্থ হয়ে পড়া।

তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে বিচারকাজ চলছিল। সকাল পৌনে ১০টার দিকে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম এজলাসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতে প্রধান বিচারপতিসহ পুরো বেঞ্চ বিচারকাজ মুলতবি করেন। অসুস্থ বিচারপতিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

এখানেও বিচারপতিদের এজলাস ত্যাগ ছিল পরিস্থিতিনির্ভর।

 

বার সভাপতির সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, এজলাস ছাড়লো পুরো বেঞ্চ

২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। আপিল বিভাগে একটি মামলার শুনানি ঘিরে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর সঙ্গে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।

একজন নারী আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার ঘটনায় বার সভাপতি সেটি মওকুফের অনুরোধ করেন। আলোচনার এক পর্যায়ে আপিল বিভাগে মামলা কমে যাওয়ায় আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন বার সভাপতি। বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনজীবীদের আয় কমে গেছে—এমন মন্তব্যও করেন তিনি।

এ নিয়ে প্রধান বিচারপতি ও বার সভাপতির মধ্যে বাদানুবাদ হয়। এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি ওই মন্তব্যকে আদালত অবমাননার শামিল বলে উল্লেখ করেন। এর পর প্রধান বিচারপতিসহ পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এজলাস ছেড়ে যায়। ওই দিন আর আদালত বসেনি।

 

একই দৃশ্য, বিভিন্ন কারণ

চারটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—প্রধান বিচারপতিসহ পুরো বেঞ্চের এজলাস ত্যাগ কম হলেও এর কারণ অভিন্ন নয়। ২০১৯ সালে ছিল রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মামলা ঘিরে উত্তেজনা; ২০২৪ সালের মার্চে ছিল আদালত কক্ষের অবকাঠামোগত সমস্যা; জুলাইয়ে ছিল একজন বিচারপতির অসুস্থতা; ২০২৬ সালে ছিল বিচারপতি ও বার সভাপতির মধ্যে বাকবিতণ্ডা।