‘আমার পোলাপান গিয়ে তোর ফ্যাক্টরির একজনকে থাপড়াইয়া আসছে। টাকা না পাইলে তোর পা লুলা করে দিবো। সারা জীবন হুইলচেয়ার ঠেলবি। তোর মালিকরে কবি (বলবি), ফাইভ স্টার গ্রুপের আশিক ভাইয়ের ছোট ভাই ফোন দিছিলো। একবারে দিবি ৫ লাখ, প্রতি মাসে দিবি ৫০ হাজার। বড় ভাইদের কাছে গেলে রেট বাড়বো আরও ১৫ লাখ। তখন দিবি ২০ লাখ। এখন বাংলাদেশে ৮টা বাজে। ২০ মিনিট সময় দিলাম। মালিকের সঙ্গে আলাপ করে জানাবি। না হলে তোগো ফ্যাক্টরি চালাইবো আমগো পোলাপান।’ রাজধানীর মিরপুরে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের কাছে এভাবেই বিদেশি নম্বর দিয়ে ফোন করেন একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। ঘটনাটি কদিন আগের।
কয়েক মাস আগের ঘটনা। পল্লবীর আলব্দির টেক এলাকায় এ কে বিল্ডার্স নামের আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিল। তিনি রয়েছেন ভারতে। চাঁদা না পেয়ে জামিলের লোকজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। হামলাকারীরা এ সময় চারটি গুলি করে। দুর্বৃত্তদের গুলিতে শরিফুল ইসলাম নামে প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তাও আহত হন।
মিরপুরের বাউনিয়া কালীবাড়ি এলাকায় মনোয়ারা হাউজিংয়ের একটি ভবনের পাইলিংয়ের কাজ চলছিল। গত ২৫ আগস্ট একদল সন্ত্রাসী সেখানে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। তারা বলে, শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর ভাইয়ের লোক কায়েস ভাই পাঠিয়েছে। পরে তারা একটি বিদেশি নম্বরে ফোনের অপর প্রান্তে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে বাড়ির মালিককে কথা বলিয়ে দেন। ভবনের কাজ এগিয়ে নিতে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ওই শীর্ষ সন্ত্রাসী। পরে টাকা দিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচান বাড়ির মালিক। মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানে আব্বাস নামে এক মোবাইল ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় ফোনে। কিন্তু চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানান ব্যবসায়ী। কিছু সময় পর দোকানে হামলা করে সন্ত্রাসীরা। এই চাঁদা দাবি করেছেন মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার বাদল। তিনি আছেন মালয়েশিয়ায়।
শুধু এই ঘটনাগুলোই নয়- বিদেশে বসেই দেশের চাঁদাবাজি কন্ট্রোল করছেন শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। তারা ফোন দিচ্ছেন টার্গেট মতো। আর তাদের সেকেন্ড ইন কমান্ডরা দলবল নিয়ে সেই চাঁদা তুলে আনছে। চাঁদা না দিলে হামলা চালাচ্ছেন তারা। এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। আর এই চাঁদার সিংহভাগ চলে যায় বিদেশে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে। চাঁদার টাকায় বিদেশে আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন অন্তত ডজন খানেক বাংলাদেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী।
হালে পরিস্থিতি এতই খারাপ দিকে গিয়েছে যে, ভবনের প্রতি ফ্লোরের জন্য আলাদা চাঁদা, ইট-বালু-রডের ব্যবসা করতে চাঁদা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে মাসিক চাঁদা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। কখনো কখনো চাঁদার রেট উঠছে কোটি টাকা। কেউ কেউ জীবনের পরোয়া না করে থানায় অভিযোগ দিলেও লাভ হচ্ছে না। কারণ চাঁদা আনতে যাওয়া লোক গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকছে অদৃশ্য রিমোট হাতে বিদেশে বসে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। অভিযোগ করলে বাড়ে জীবনের হুমকি ও চাঁদার রেট। অনেকেই ঝামেলা এড়াতে পুলিশের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে না। গোপনেই আপসরফা করে নিচ্ছে। এতে করে কোনো বিদেশি নম্বর থেকে ফোন আসলেই আঁতকে উঠছেন ব্যবসায়ীরা। ফোন রিসিভ না করলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হচ্ছে। চাঁদা না পাওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হচ্ছে ভবনের নির্মাণকাজ।
জানা গেছে, আন্ডারওয়ার্ল্ড ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কোথাও মিলেমিশে, কোথাও মুখোমুখি অবস্থানে থেকে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর পুলিশ নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়লে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা সুসংগঠিত হতে থাকে। রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, মতিঝিল, খিলগাঁও, হাজারীবাগ, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। মিরপুর এলাকায় শুরু হয় ফোর স্টার গ্রুপের রাজত্ব। শীর্ষ সন্ত্রাসী মফিজুর রহমান মামুন, ইব্রাহীম খলিল ওরফে কিলার ইব্রাহীম, শাহাদাত হোসেন এবং মোক্তার হোসেন আছেন এই ফোর স্টার গ্রুপের নেতৃত্বে। মামুনের দুই ভাই মশিউর রহমান মশু ও জামিলও সক্রিয় এই গ্রুপে। এই গ্রুপ ছাড়াও এক রাজনৈতিক নেতার ইন্ধনে মামুন গ্রুপের কিলার আশিক নতুন গ্রুপের ঘোষণা দিয়ে চাঁদাবাজিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
সূত্র জানিয়েছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন বর্তমানে মালয়েশিয়াতে পলাতক রয়েছেন। তিনি +৩৫১৯৬৬৯৩১২৩১ নম্বর দিয়ে ফোন করে চাঁদা দাবি করেন। তবে কোনো ভবন মালিক বা ব্যবসায়ীকে সরাসরি কল করেন না। তার ভাই মশিও রয়েছেন মালয়েশিয়ায়। গত বছরের নভেম্বরে পল্লবীর একটি দোকানে ঢুকে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপরই ফের সামনে আসে মামুনের নাম। তদন্তে বেরিয়ে আসে তার নির্দেশেই খুন হন কিবরিয়া। শীর্ষ সন্ত্রাসী মোক্তার হোসেন পলাতক ভারতে। শাহাদাৎ হোসেন ও কিলার ইব্রাহিম রয়েছেন দুবাই। এ ছাড়াও একসময়ের ফাইভ স্টার গ্রুপের সক্রিয় সদস্য আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস এখনো সক্রিয় রয়েছেন। আর নব্য উত্থান ঘটা কিলার আশিক +৯৬৬৫৪৪৭৫৬৪৫২ ও +৬০১১৭২২৭২৬৯৩ নম্বর থেকে ফোন করে চাঁদা দাবি করে আসছেন। কৌশল হিসেবে তারা কখনো সরাসরি টার্গেট ব্যক্তিকে ফোন করেন না। শীর্ষ সন্ত্রাসী হাবিবুর রহমান তাজও তৎপর রয়েছেন কাফরুল এলাকার চাঁদাবাজিতে।
এ ছাড়াও মোহাম্মদপুরে চাঁদাবজিতে মালয়েশিয়াতে থাকা কিলার বাদল ও দেশেই ঘাপটি মেরে থাকা অপর এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম আসছে। যাত্রাবাড়ী এলাকার শুটার লিটন বর্তমানে কারাগারে থাকলেও তার স্ত্রীর দিকনির্দেশনায় মাদক কারবার ও চাঁদাবাজি করছে অস্ত্রধারী সহযোগীরা। বাড্ডার দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী দুবাইয়ে পলাতক মাহবুব ও আমেরিকায় পলাতক মেহেদী এবং দুবাইয়ে পলাতক মতিঝিল খিলগাঁওয়ের জিসান আহমেদের গ্রুপের রাজত্ব চলছে। ডিবি সূত্র বলছে, এসব সন্ত্রাসী গ্রুপের সবাই সেকেন্ড ইন কমান্ডের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী গ্রুপ গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে- কিলার আব্বাসের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে তৎপর রয়েছে ভাগ্নে সোহেল। মামুন গ্রুপের চাঁদার নেতৃত্ব দিচ্ছে কায়েস। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়- মামুন গ্রুপের আলোচিত সন্ত্রাসী ল্যাংড়া রুবেল, শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের শুটার কাইল্লা শামীম ও মুক্তারের শুটার জাকির।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, অস্ত্রের মজুত বাড়াতে মনোযোগ দিয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত। ইতোমধ্যে তার গ্রুপে টিপু সুমন, প্রচার সাইফুল ও শামীমসহ আরও কয়েক সন্ত্রাসী সক্রিয় রয়েছে। আর কিলার আশিকের উত্থান ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ফোর স্টার গ্রুপের সদস্যরা। এতে মিরপুর এলাকায় দ্রুতই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০০১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ সন্ত্রাসীদের মধ্যে অনেকে মারা গেছেন, ৪ জন কারাগারে রয়েছেন। তবে তাদের অনেকেই বিদেশে বসে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বড় অংশ এখনো নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন। আধিপত্যের লড়াইয়ে সম্প্রতি সময়ে টার্গেট কিলিংয়ে মারা গেছেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের আলোচিত তিন সন্ত্রাসী। তারা হলেন- খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন, তারিক সাইফ মামুন ও কাইল্লা পলাশ।
পুলিশ যা বলছে : পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, পলাতক সন্ত্রাসীদের দেশে ফেরাতে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টা আছে। বিদেশ থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী পরিচয়ে কিছু ফোনকলের কথা মাঝেমধ্যে শোনা যায়। কিন্তু অধিকাংশ সময় দেখা যায়, পলাতক সন্ত্রাসীদের পরিচয়ে বিদেশি নম্বর দিয়ে অন্য কেউ ফোন করে হুমকি দিচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, অনেকেই শীর্ষ সন্ত্রাসী পরিচয়ে বিদেশি নাম্বার দিয়ে ফোন করে চাঁদা দাবি করে। এতে আতঙ্কিত না হয়ে থানায় অভিযোগ করলে পুলিশ সহজেই ব্যবস্থা নিতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘যারা বিদেশে বসে অপরাধমূলক কর্মকান্ড করছে, তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলে আবেদন করাসহ অন্য সব চেষ্টাই আমাদের অব্যাহত আছে।’
গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পেলে দেশের অভ্যন্তরে যারা আছে তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। যারা বিদেশে আছে, তাদের সংশ্লিষ্টতা পেলে চার্জশিটে নাম দেওয়া হচ্ছে। এতে করে সংশ্লিষ্ট ঘটনার বিচারকাজ শেষ হলে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফেরত আনার সম্ভাবনা তৈরি হবে।