Image description

দুর্বৃত্তের হামলায় স্বামীকে হারিয়েছেন গত বছরের এপ্রিলে। নিরাপত্তার কথা ভেবে দুই মেয়েকে রেখেছেন এতিমখানায়। বাড়িতে ছিলেন শাশুড়ি ও ১‌৫ মাস বয়সী ছেলে। আসামিপক্ষের পাল্টা মামলায় ওই শিশুকে নিয়েই সাত দিন জেল খেটেছেন কক্সবাজারের মহেশখালীর ফাতেমা বেগম।

আজ সোমবার জামিনে বের হয়ে জানালেন, স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ায় হয়রানির শিকার তিনি। শিশুসন্তানসহ ফাতেমার গ্রেপ্তারে এলাকায় নতুন করে আলোচনা হচ্ছে গত বছরের ঘটনাটি। তার বিরুদ্ধে হওয়া পাল্টা মামলা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্নও।

ফাতেমার স্বামী মুহাম্মদ কাশেম ছিলেন ফিশিং ট্রলারের জেলে। ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল মহেশখালীর কুতুবজোমের কবির বাজারে হামলার শিকার হন তিনি। সেখান থেকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তাড়া করে বাড়ির সামনে গিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় তাকে।

পরের দিন কাশেমের মামা আবদুল গফুর, তার ছেলে শাহেদ ও  সাজ্জাদ এবং স্থানীয় মো. রাসেলসহ ১০ জনের নামে মহেশখালী থানায় মামলা করেন স্ত্রী ফাতেমা। গ্রেপ্তারও হন পাঁচজন। এজাহারের বলা হয়, টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড।

ফাতেমার আইনজীবী মো. আনছার জানালেন, এ ঘটনার প্রায় চার মাস পর ৩ আগস্ট আসামি রাসেলের মা নুর জাহান বেগম আদালতে একটি মামলার আবেদন করেন। মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া আবেদনে তিনি জানান, ২৪ মে সকালে কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা, তার মা ও স্বজনরা রাসেলের বাড়ি ভাঙচুর ও মালামাল লুট করেছেন।

 

 

 

আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে মহেশখালী থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত করে গত ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাহেরুল ইসলাম।

সেই মামলায় গেল ৩১ আগস্ট রাতে ফাতেমা, তার শাশুড়ি রাশেদা বেগম ও বেড়াতে আসা ননদ নাছিমা আকতারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন জামিন পান রাশেদা ও নাছিমা। তবে শিশুসন্তানসহ কারাগারে রয়ে যান ফাতেমা।

রাশেদার দাবি, গ্রেপ্তারের সময়ই তারা এ মামলার কথা জানতে পারেন। ‘আমার ছেলেকে হত্যা করে আমাদের বিরুদ্ধেই উল্টো মিথ্যা মামলা করেছে। আমরা জানতেই পারিনি যে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, পুলিশ তদন্ত করেছে, ওয়ারেন্ট হয়েছে। এখন আমাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’

ফাতেমার আইনজীবী আনছার বলেছেন, কাশেম হত্যাকাণ্ডের মামলা তুলে নিতে শুরু থেকেই ফাতেমাকে চাপ দিচ্ছিলেন আসামিরা। গত বছরের ৬ মে মহেশখালী থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন তিনি। 

অ্যাডভোকেট আনছারের দাবি, ওই বাড়ি ভাঙচুরের মামলায় শুধু সাক্ষীদের কথায় ফাতিমার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা।

 

 

 

মামলার তিন সাক্ষী অবশ্য সাক্ষ্য দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। সাক্ষী হিসেবে সই করা নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগম নামে তিনজনের দাবি, তাদের নাম কীভাবে এসেছে— তা জানেন না।

তাদের ভাষ্য, কাশেম হত্যার দিনই এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হলে রাসেলের বাড়িঘরে হামলা হয়। তবে তাতে কাশেমের পরিবারের কাউকে তারা দেখেননি। ঘটনার এক মাস পর ২৪ মে এলাকায় কোনো বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি। একই কথা জানালেন কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ কামাল।

তবে বাড়ি ভাঙচুরের মামলার বাদী নুর জাহান বেগম বা তার পরিবারের কাউকে বক্তব্যের জন্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোজাহেরুল দাবি করেছেন, সাক্ষীরা স্বেচ্ছায় বক্তব্য দিয়েছেন। এর ভিত্তিতেই অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন। 

ফাতেমা বেগম আজ জামিনে মুক্ত হয়ে বলেছেন, ‘আমিসহ আমার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ভাঙচুরের যে মামলা দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার স্বামীর হত্যাকারী রাসেলকে মামলা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে তারা এ মিথ্যা মামলা সাজিয়েছে। আমি এ মামলা প্রত্যাহার এবং আমার স্বামীর হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’