Image description

২০২৪ সালে পূর্ব ইউক্রেনে রুশ সেনারা যখন ট্রেঞ্চ লাইনে হামলা চালাচ্ছিল, তখন ইউক্রেনের আর্টিলারি দলগুলো পাল্টা গুলি চালায়। কিন্তু গোলাগুলো এগিয়ে আসা রুশ সেনাদের কাছে বিস্ফোরিত হওয়ার বদলে কখনো নল থেকে বের হয়েই পড়ছিল, আবার কখনো নীরবে মাটিতে আছড়ে পড়ে ধুলোর ছোট ছোট মেঘ তৈরি করছিল।

পরে জানা যায়, ইউক্রেনের একটি অস্ত্র কারখানা সামরিক বাহিনীকে হাজার হাজার ত্রুটিপূর্ণ মর্টার গোলা সরবরাহ করেছে। কারখানার প্রধান লিওনিদ শিমানকে পরে গ্রেপ্তার করে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়। তবে অস্ত্র ত্রুটিপূর্ণ আসছে—এমন সতর্কবার্তা কর্মকর্তারা পাওয়ার পরও ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ক্রয় সংস্থা শিমানের কারখানাকে নতুন চুক্তি দিয়ে যেতে থাকে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের পাওয়া সরকারি অডিট অনুযায়ী, ইউক্রেনের শীর্ষ ১০ সামরিক ঠিকাদারের সাতটি প্রতারণার তদন্ত, আগের চুক্তি পূরণে ব্যর্থতা কিংবা প্রধান নির্বাহীর দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তারের পরও নতুন অর্ডার পেয়েছে। ২০২৪ সালে প্রতারণা, অপচয় ও অব্যবস্থাপনার কারণে ইউক্রেন প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে।

‘সেনাবাহিনী যা প্রয়োজন তা পাচ্ছে না এবং সরবরাহ না হওয়া ও অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের কারণে বাজেট কমে যাচ্ছে। ফলে আরও অস্ত্র কেনার মতো অর্থ আমাদের থাকছে না। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিমাণ গোলাবারুদও পাচ্ছি না। এটি বারবার ঘটছে,’ বললেন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ক্রয় সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা তামেরলান ভাহাবভ।

 

অডিটে দেখা যায়, ১২৬ মিলিয়ন ডলার হারানো হয়েছে কম দরদাতাকে পাশ কাটিয়ে অস্ত্র কেনা ও অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের কারণে। ১৮টি প্রতিষ্ঠান আগের চুক্তিতে ব্যর্থ হওয়ার পরও নতুন চুক্তি পেয়েছে; এর মধ্যে ছয়টি একটি চুক্তিও পূরণ করেনি।

শিমানের প্রতিষ্ঠান পাভলোহরাদ কেমিক্যাল প্ল্যান্ট প্রথমে জানিয়েছিল, তারা চুক্তি পূরণের সক্ষমতা রাখে না। পরে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই উৎপাদন সক্ষমতা বদলে দেখানো হয় এবং সরকার ২৮০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি দেয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি সেনাবাহিনীকে ২ লাখ ৩৩ হাজার ব্যবহার অনুপযোগী মর্টার গোলা সরবরাহ করেছিল।

‘ইউক্রেনে যেটি আটকানো নেই, সেটিই চুরি হয়ে যাবে,’ বলছিলেন মার্কিন দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞ জেমস ওয়াসারস্ট্রম। তার ভাষায়, এটি দীর্ঘদিনের একটি প্রথা।

অন্য এক ঘটনায়, একই রকেটের জন্য তিন প্রতিষ্ঠান ৪ হাজার ২০০, ৪ হাজার ৬০০ ও ৫ হাজার ১০০ ডলার করে দাম প্রস্তাব করলেও সরকার সর্বোচ্চ দরদাতা চেকোস্লোভাক গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে চুক্তি দেয়। অডিটররা সিদ্ধান্তটির কোনো যৌক্তিকতা পাননি। এতে ইউক্রেনের ব্যয় প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যায়।

আরেকটি ঘটনায়, রাশিয়াপন্থী সার্বিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে রকেট কেনার জন্য ইউক্রেন মধ্যস্থতাকারী ব্যবহার করে। চুক্তি পাওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান স্পেটসটেকনোএক্সপোর্টের আগের চুক্তি পূরণ না করার ইতিহাস এবং দুর্নীতির তদন্ত ছিল। প্রতিষ্ঠানটির সার্বিয়ান রপ্তানি লাইসেন্সও ছিল না। পরে চুক্তিটি ভেঙে পড়ে এবং ২০২৫ সালের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি ক্রয় সংস্থার সবচেয়ে বড় দেনাদারে পরিণত হয়।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভও ক্রয়ব্যবস্থায় দুর্নীতির কথা বলেছিলেন। তার বরখাস্তের পর তিনি বলেছেন, ‘অনেক দুর্নীতি রয়েছে।’ তার অপসারণ যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বড় রাজপথের বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়।

 

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস