আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ভোটার ছিলেন কুমিল্লার মুরাদনগরে। সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি ঢাকার ধানমণ্ডির ভোটার তালিকায় নাম তোলেন। ঢাকা-১০ আসনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার।
কিন্তু গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে তার অংশ নেওয়া হয়নি। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আগামী নির্বাচনে তাকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঠিক করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
সেই নির্বাচনের তোড়জোড় যখন শুরু হলো, তখন হঠাৎ করেই ধানমণ্ডির ভোটার তালিকা থেকে নিজের নাম কাটিয়ে আফতাবনগরে নিয়ে গেলেন তিনি। এই এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত।
আজ রবিবার এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ যখন এই তথ্য প্রকাশ করলেন, সেদিনই দলটির আরেক নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা উত্তর থেকে সরে তার নাম তুলেছেন ঢাকা দক্ষিণের ভোটার তালিকায়।
ভোটার তালিকায় এনসিপির শীর্ষপর্যায়ের এই দুই নেতার এলাকা পরিবর্তন রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি করেছে কৌতূহল।
দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, সামনের সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে কৌশল বদল হচ্ছে। তাতে বদলাবে আগের তালিকা। সেইসঙ্গে জোট বাদ দিয়ে একক নির্বাচনের পথে এগোচ্ছেন তারা।
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া দল এনসিপিতে আসিফ মাহমুদ রয়েছেন মুখপাত্রের দায়িত্বে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সামলাচ্ছেন মুখ্য সমন্বয়কের পদ।
গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে আসিফ অংশ না নিলেও পাটওয়ারী প্রার্থী হয়েছিলেন ঢাকা-৮ আসনে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের কাছে ৫ হাজার ভোটে হেরে যান তিনি।
এরপর স্থানীয় নির্বাচনের আলোচনা উঠলে গত মার্চ মাসে ঢাকার দুটিসহ পাঁচ সিটি করপোরেশনে নিজেদের মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তখন জানানো হয়েছিল, ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে লড়বেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। আর ঢাকা উত্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন যখন বিধিমালা জারিসহ নানা প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের দুই নেতার পদক্ষেপে ভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কারণ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ অবারিত হলেও স্থানীয় নির্বাচনে কোনো এলাকায় প্রার্থী হতে হলে সেই এলাকার ভোটার হতে হয়।
দক্ষিণে পাটওয়ারী, উত্তরে আসিফ
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উত্তরা এলাকার ভোটার ছিলেন। সম্প্রতি তিনি ইসির মাধ্যমে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন করেন।
প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে তার আবেদন অনুমোদন হয়েছে। ফলে তিনি এখন ঢাকা দক্ষিণের আওতাধীন ঢাকা-৮ সংসদীয় আসনে ভোটার। এই আসন থেকেই তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, আসিফ মাহমুদও সম্প্রতি ইসির মাধ্যমে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের আবেদন করেন। ঢাকা দক্ষিণের ধানমন্ডি থেকে তিনি নিজের ভোটার এলাকা নিয়ে আসেন উত্তরের আফতাবনগরে।
এনসিপির একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ঢাকা দক্ষিণে পাটওয়ারী এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদকে মেয়র প্রার্থী করার বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এনসিপির শীর্ষপর্যায়ের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আগামীর সময়কে বলেন, ‘সম্প্রতি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা অনানুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদকে মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। সে অনুযায়ী তারা ভোটার এলাকা পরিবর্তন করেছেন। সবকিছু অনুকূলে থাকলে পরবর্তী সময়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।’
এনসিপি নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মাঠের বাস্তবতা এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গেই দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তনের বিষয়টি যুক্ত।
এক্ষেত্রে সম্ভাব্য নির্বাচনী কৌশলও কাজ করছে বলে এনসিপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। তারা মনে করছেন, আসিফ মাহমুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তরুণ ও জেন-জি ভোটারদের সম্পৃক্ততা তুলনামূলক বেশি। দলের অভ্যন্তরীণ জরিপেও ঢাকা মহানগর উত্তর এলাকায় তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ভালো বলে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ ঢাকা-৮ সংসদীয় আসনকেন্দ্রিক। সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হলেও ঢাকা দক্ষিণে তার সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন এনসিপির নেতারা।
দলটির একটি অংশ মনে করছে, দক্ষিণ সিটিতে পাটওয়ারী এবং উত্তর সিটিতে আসিফ মাহমুদকে প্রার্থী করলে দুই নেতার নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচিতি, ভোটার গ্রহণযোগ্যতা ও মাঠের সাংগঠনিক অবস্থানকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে এনসিপির সম্ভাব্য নতুন কৌশলটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জামায়াতের প্রার্থীর কারণে। দক্ষিণে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি মো. আবু সাদিককে (সাদিক কায়েম) প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। ফলে এনসিপি শেষ পর্যন্ত দক্ষিণে পাটওয়ারীকে এবং জামায়াত সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করলে একই রাজনৈতিক বলয়ের দুই দলের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হতে পারে।
এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি
সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপি। শুধু সিটি করপোরেশন নয়, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও আলাদা প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে দলটি।
এনসিপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে প্রায় ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। আরও ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।
একই সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়েও প্রস্তুতি চলছে। দেশে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে এনসিপি-সমর্থিত প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে দলটি। নভেম্বরের মধ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রার্থীদের নাম ঘোষণার লক্ষ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এনসিপির নেতাদের ভাষ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে তারা শুধু নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখছে না; বরং সারাদেশে দলটির সাংগঠনিক বিস্তার, জনপ্রিয়তা এবং মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবেও দেখছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার আগামীর সময়কে বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, ‘আমরা এককভাবে নির্বাচন করব। সেটিকে সামনে রেখে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে এনসিপি মাঠপর্যায়ে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে।’
তিনি জানান, এরই মধ্যে ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। একই সময়ে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের প্রার্থীও ঘোষণা করা হয়েছে।
সারজিস আলম বলেন, বাকি সিটি করপোরেশনগুলোর প্রার্থীদের নামও চলতি মাসের মধ্যে প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত এনসিপি-সমর্থিত প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে দলটি।