চোখে চশমা, কাঁধে ব্যাগ। গলায় ঝুলছে পরিচয়পত্র। কখনো ঢলে পড়ে যাচ্ছেন তো আবার দাঁড়িয়ে থাকছেন। চোখ বারবার বন্ধ হয়ে আসছে। হাতও কুঁকড়ে যাচ্ছে। পথচারীরা ডাক দিলে সাড়া দিয়েই, মুহূর্তে ফিরে যাচ্ছেন আগের অবস্থায়।
সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে রাজধানীর শাহবাগে এক যুবককে এমন ‘অস্বাভাবিক’ আচরণ করতে দেখা যায়। পরে স্ট্রিম রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপ করে। দীর্ঘদিন তিনি একটি রোগে ভুগছেন। শরীরে তীব্র ব্যথা হয়। এজন্য উচ্চক্ষমতার ব্যথানাশক সিন্থেটিক ওপিওয়েড (রাসায়নিক ওষুধ) নেন। যুবকের ভাষ্যে, ওষুধ গ্রহণের কারণে মাঝেমধ্যে তাঁর মধ্যে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।
তাঁর কাছ থেকে পাওয়া ব্যবস্থাপত্র সম্পর্কে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খেলে রোগমুক্তি মিলবে। তবে নির্ধারিত মাত্রার বেশি বা অবৈধ উপায়ে ওপিওয়েড নিলেই কেবল মানুষ এই ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ করবে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘প্রয়োজনে আমরা ব্যথার ওষুধ হিসেবে ওপিওয়েড দিয়ে থাকি। বেশি দেওয়া হয় অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে। এই ওষুধ গ্রহণে আমরা রোগীর ব্যথা কমার প্রমাণ পেয়েছি। তাঁর আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’
তিনি বলেন, প্রয়োজন ছাড়া কেউ ওপিওয়েড নিলে, তাঁর শারীরিক-মানসিকসহ শরীরে নানা অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়। অবৈধ উপায়ে ওপিওয়েড ব্যবহারকে বিশ্বে ‘ফেন্টানিল বা জম্বি ড্রাগ’ বলা হয়, যোগ করেন এই চিকিৎসক।
বাংলাদেশে ছড়াচ্ছে
জম্বি ড্রাগস বলে আলাদা কোনো মাদক নেই। এটি মূলত ওপিওয়েড এবং জাইলাজিন জাতীয় ওষুধের মিশ্রণ। যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ডিইএ) তথ্যে, ফেন্টানিল হেরোইনের চেয়ে ৫০ এবং মরফিনের তুলনায় ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী।
চিকিৎসকেরা বলছেন, সিন্থেটিক ওপিওয়েড অস্ত্রোপচারের তীব্র ব্যথা প্রশমন এবং জাইলাজিন ঘোড়া বা গরুর মতো বড় প্রাণীকে অচেতন কিংবা ব্যথা কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
তাঁরা আরও জানান, জম্বি ড্রাগ গ্রহণে চরম ঝিমুনি তৈরি হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কিংবা বসে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যবহারে মানুষের ত্বকে পচন ধরে। রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন কমিয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করে।
জম্বি ড্রাগসের ব্যবহার বাড়ছে বাংলাদেশে। ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে এই মাদক। সামাজিক মাধ্যমে আসা অন্তত ১০টি ঘটনা চিহ্নিত করে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সেগুলো জম্বি ড্রাগস গ্রহণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে নিশ্চিত হয়েছে স্ট্রিম। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, চরম ঝিমুনির কারণে নানা বয়সীরা সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের কেউ কেউ মাথা নিচের দিকে ঝুঁকে আছেন। শরীর থেকে পোশাক খুলে পড়ছে। কিন্তু সেদিকে তাঁর খেয়াল নেই।
ঢাকা, রাজশাহী, দিনাজপুরসহ দেশের আরও কিছু এলাকার ভিডিও হাতে এসেছে। তবে এসব ভিডিওর ব্যক্তিরা জম্বি ড্রাগসের কারণে এমন আচরণ করছেন কিনা, তা নিশ্চিত হতে পারেনি স্ট্রিম। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (আইএনসিবি) সতর্ক করেছে, বাংলাদেশে ফেন্টানিলের হুমকি দ্রুত বাড়ছে।
ফেন্টানিল ওষুধ হলেও, অপব্যবহারে এটি ভয়াবহ মাদকে রূপ নেয়। আইনে এটি গ্রহণ অপরাধ। আমাদের অনুমতি ছাড়া ওষুধ হিসেবেও কারও ব্যবহারের সুযোগ নেই। আমাদের লাইসেন্স ছাড়া কেউ ব্যবহার করলে, তাঁর বিরুদ্ধে আমরা মামলা করব।গোলাম আজম, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, ডিএনসি
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের জানা মতে, বাংলাদেশে এখনো ফেন্টানিল বা জম্বি ড্রাগ প্রবেশ করেনি। তবে দেশে বৈধভাবে ফেন্টানিল ব্যবহার হয়।
ডিএনসি প্রবেশ করেনি বললেও, ২০২২ সালের ১ আগস্ট রাজধানীর গুলশানে র্যাবের অভিযানে আটক ওনাইসী সাঈদ ওরফে রেয়ার সাঈদের কাছ থেকে কুশ, হেম্প, মলি, কোকেন, এক্সটাসি, এডারল ট্যাবলেটের পাশাপাশি ১ গ্রাম ফেন্টানিল জব্দ করা হয়।
ডিএনসির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) গোলাম আজম স্ট্রিমকে বলেন, ‘ফেন্টানিল ওষুধ হলেও, অপব্যবহারে এটি ভয়াবহ মাদকে রূপ নেয়। আইনে এটি গ্রহণ অপরাধ। আমাদের অনুমতি ছাড়া ওষুধ হিসেবেও কারও ব্যবহারের সুযোগ নেই। বিক্রি করতে হলেও লাইসেন্স নিতে হবে। আমাদের লাইসেন্স ছাড়া কেউ ব্যবহার করলে, তাঁর বিরুদ্ধে আমরা মামলা করব।’
বাংলাদেশে মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান ফেন্টানিল তৈরি করে বলে জানিয়েছেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আকতার হোসেন। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, আমাদের এখানে তিনটি প্রতিষ্ঠান ফেন্টানিল তৈরি করলেও, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হয়। প্রেসক্রিপশন ছাড়া এটি বিক্রি নিষিদ্ধ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শেখ জহির রায়হান স্ট্রিমকে বলেন, ‘প্রেসক্রিপশন ছাড়া ফেন্টানিল কোনোভাবেই বিক্রি করা যাবে না। দুঃখজনক হলো, এখানে ফার্মেসিতে যেকোনো ওষুধ কিনতে পাওয়া যায়। প্যাথিডিনের কাছাকাছি ফেন্টানিল। ফলে প্যাথিডিনের মতো ফেন্টানিলের অপব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। এটি সত্যিই হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ৭০ হাজার মৃত্যু
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্যে, ফেন্টানিলের ওভারডোজের কারণে ২০২৪ সালে দেশটিতে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। মার্কিন সরকারের প্রধান স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অফ হেলথের (এনআইএইচ) তথ্যে, ২০২৩ সালে এটি ছিল ৭৪ হাজার ৭০২ জন, যার মধ্যে নারী ১৯ হাজার ৪২০ এবং পুরুষ ৫৩ হাজার ৩৫৬ জন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফেন্টানিলের ওভারডোজে ১৯৯৯ সালে মাত্র ৭৩০ জন মারা যান। দুই দশকে এটি মহামারির আকায় নেয়। ২০২০ সালে ৫৬ হাজার ৫১৬, ২০২১ সালে ৭০ হাজার ৬০১ ও ২০২২ সালে মারা যান ৭৩ হাজার ৮৩৮ জন।
কাঁচামাল রপ্তানিতে চীন-ভারত
ভারতের নারকোটিকস কন্ট্রোল ব্যুরো (এনসিবি) ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মুম্বাই থেকে ১০০ কেজি ফেন্টানিল জব্দ করে।
এনসিবির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় অবৈধ সিন্থেটিক মাদকের বাজার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় মাদক পাচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন এলাকা দক্ষিণ এশিয়া। বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার নদীপথ মাদক পাচারের রুট হিসেবে সংবেদনশীল।
যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ) জানিয়েছে, ফেন্টানিলের কাঁচামাল রপ্তানি করছে চীন। তারা ফেন্টানিল তৈরির উপাদান মেক্সিকো ও কানাডায় পাঠাচ্ছে। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঢুকছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা পরিচালক দপ্তর (ওডিএনআই) বলেছে, ভারত ও চীন অপরাধী চক্রগুলোর কাছে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ফেন্টানিল তৈরির রাসায়নিক কাঁচামাল সরবরাহ করছে।
ডিইএ জানায়, গত পাঁচ বছরে তারা আটটি ভিন্ন শ্রেণির তিন শতাধিক নতুন সিন্থেটিক ড্রাগ শনাক্ত করেছে, যার অধিকাংশ চীনে উৎপাদিত।