Image description
 
সাম্প্রতিক আলোচনায় একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, “হেবা নিয়ে নতুন আইন হয়েছে।” বিষয়টি একটু গভীরে গিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এখানে আসলে দুটি পৃথক আইনি স্তর রয়েছে—একটি মুসলিম পারিবারিক আইনের (Muslim Family Law) অধীন হেবা (Hiba), আর অন্যটি সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে (Transfer of Property Law) যুক্ত হওয়া একটি নতুন দেওয়ানি ব্যবস্থা (Civil Law Mechanism)।
 
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এর (Transfer of Property (Amendment) Bill, 2026) মাধ্যমে সম্পত্তি দানের পরও দাতার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির ভোগ ও উপভোগের অধিকার (Usufruct Right) সংরক্ষণের একটি নতুন আইনি কাঠামো যুক্ত করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, পিতা-মাতা বা অন্যান্য যোগ্য দাতা সন্তান বা নিকটাত্মীয়ের নামে সম্পত্তি হস্তান্তর করার পরও যেন জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত না হন। সরকারের বক্তব্যও মূলত পিতা-মাতাকে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর সম্ভাব্য অবহেলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
 
এখানে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এই আইন মুসলিম পারিবারিক আইনের হেবা বাতিল বা সংশোধন করেছে, এমন কথা বলা ঠিক হবে না। নতুন বিধানটিকে আইন নিজেই হেবা (Hiba) বা প্রচলিত অন্যান্য হস্তান্তর-পদ্ধতি থেকে একটি স্বতন্ত্র হস্তান্তর ব্যবস্থা (Distinct Mode of Transfer) হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং প্রচলিত হেবা বা অন্যান্য বৈধ হস্তান্তর-পদ্ধতির বৈধতাকেও অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
 
তাই বলা যায়, একটি হচ্ছে হেবার আইন (Law of Hiba), আরেকটি হচ্ছে সম্পত্তি হস্তান্তরের আইন (Transfer of Property Law); নতুন আইনে হেবার মূল বিধান পরিবর্তন না করে হস্তান্তর আইনে একটি নতুন ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।
তবে এখানেই মূল প্রশ্নটা দাঁড়ায়। একজন মুসলিম পিতা-মাতা যদি এই নতুন আইনি ব্যবস্থার অধীনে সন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তর করেন এবং নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির ভোগস্বত্ব (Usufruct Right) সংরক্ষণ করেন, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে সেই লেনদেনের প্রকৃতি কী হবে?
 
এটিকে সরাসরি “হেবা” (Hiba) বলা যাবে কি না, নাকি এটি হেবা থেকে স্বতন্ত্র কোনো দেওয়ানি হস্তান্তর (Civil Transfer), এটি ফিকহি পর্যালোচনার বিষয়।
 
বিশেষ করে হানাফি ফিকহের (Hanafi Fiqh) ক্ষেত্রে কবজা বা দখল হস্তান্তর (Qabd/Possession), মালিকানা (Ownership) এবং ভোগস্বত্ব (Usufruct), এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ হেবায় দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে মালিকানা ও দখলের সম্পর্ক কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটি ফিকহের নির্ধারিত নিয়মে বিচার করতে হয়। অন্যদিকে নতুন ব্যবস্থায় মালিকানা হস্তান্তরের পরও দাতা নিজের জন্য আজীবন ভোগের অধিকার (Lifetime Usufruct Right) সংরক্ষণ করছেন। ফলে এই কাঠামো হানাফি ফিকহের কোন শ্রেণিতে পড়ে এবং এর শরয়ি প্রভাব কী, তা যোগ্য আলেমদের বিশদভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।
 
কেউ কেউ এটিকে সরাসরি ওসিয়তের (Wasiyyah/Will) সঙ্গে তুলনা করছেন। কিন্তু বর্তমান আইনি কাঠামো থেকে এতটা সরাসরি সিদ্ধান্তে যাওয়াও ঠিক হবে না। নতুন বিধানে দানের মাধ্যমে হস্তান্তর বৈধ করার কথা বলা হয়েছে; দাতার জন্য কেবল জীবদ্দশার ভোগাধিকার সংরক্ষিত থাকছে। তাই এটিকে সরাসরি ওসিয়ত না বলে, মালিকানা হস্তান্তর (Transfer of Ownership) ও আজীবন ভোগস্বত্বের (Lifetime Usufruct) এই সমন্বিত কাঠামোর শরয়ি প্রকৃতি কী, সেটাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত।
এখানে আবার ইসলামী ফিকহের উমরা (العُمرى / ‘Umra)-র কথাও তুলনামূলকভাবে আলোচনায় আসতে পারে। তবে নতুন আইনের কাঠামো উমরার সরাসরি অনুরূপ নয়। উমরায় অন্যকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভোগ বা মালিকানার অধিকার দেওয়ার প্রশ্ন আসে; এখানে দাতা নিজেই নিজের জীবদ্দশার ভোগস্বত্ব সংরক্ষণ করছেন এবং অন্যের কাছে মালিকানা হস্তান্তর করছেন। তবু উমরার আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি প্রশ্ন সামনে আনে—মালিকানা (Ownership) ও ভোগাধিকারের (Usufruct) মধ্যে কি এভাবে পৃথকীকরণ করা সম্ভব এবং কোনো শর্ত (Condition/Stipulation) মূল হস্তান্তরের শরয়ি অবস্থাকে কীভাবে প্রভাবিত করে?
 
রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ভূমিকার (Regulatory Role of the State) ক্ষেত্রেও ইসলামী ইতিহাসে কিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে। হযরত উমর (রা.)-এর সাওয়াদ ভূমি ব্যবস্থাপনা জনস্বার্থে সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদাহরণ। তবে সেটি ছিল বিজিত ভূমি, কর ও সামষ্টিক জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ব্যবস্থা; ব্যক্তিগত পারিবারিক সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান নয়। তাই এটিকে বর্তমান আইনের সরাসরি শরয়ি নজির না বলে জনস্বার্থে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ভূমিকার একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যেতে পারে। কেননা পরবর্তী ফকিহরা এ ধরনের বিষয়কে সিয়াসাহ শরইয়্যাহ (Siyasah Shar‘iyyah/Governance in accordance with Shariah) ও জনকল্যাণের (Maslahah/Public Interest) আলোচনায় বিবেচনা করেছেন।
 
সরকারের উদ্দেশ্য যদি পিতা-মাতার অধিকার সংরক্ষণ হয়, সেটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও মানবিক উদ্দেশ্য। কিন্তু উদ্দেশ্য ভালো হলেই কোনো আইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শরিয়তসম্মত হয়ে যায় না; আবার নতুন কোনো দেওয়ানি ব্যবস্থা (Civil Legal Mechanism) তৈরি হলেই সেটিকে শরিয়তবিরোধী বলাও যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, ব্যবস্থাটি বাস্তবে কী ধরনের লেনদেন সৃষ্টি করছে এবং একজন মুসলিম তা গ্রহণ করলে শরয়ি হুকুম কী দাঁড়ায়।
 
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কনসার্ন রয়েছে—শুধু শরিয়তের প্রশ্ন নয়, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামোর (Existing Legal Framework of Bangladesh) সঙ্গেও এই নতুন ব্যবস্থার কোথাও সাংঘর্ষিকতা (Legal Inconsistency/Conflict) তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। বিশেষ করে “জীবনস্বত্ব” বা আজীবন ভোগের অধিকার (Lifetime Usufruct Right) বাস্তবে কীভাবে নির্ধারিত ও প্রয়োগ হবে, মালিকানা ও দখলের বিরোধ (Ownership and Possession Dispute) দেখা দিলে কোন আইনি বিধান প্রাধান্য পাবে, উত্তরাধিকার (Inheritance), নামজারি (Mutation), বিক্রয় (Sale) বা পরবর্তী হস্তান্তরের (Subsequent Transfer) ক্ষেত্রে কী ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে, এসব বিষয়ে যদি স্পষ্টতা না থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে আইনের ফাঁকফোকর (Legal Loopholes) ব্যবহার করে অপব্যবহারের (Misuse) সুযোগ তৈরি হতে পারে।
 
অর্থাৎ, এখানে আমাদের দুটি বিষয়েই সতর্ক থাকতে হবে। একদিকে শরিয়তের মৌলিক বিধান যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়, অন্যদিকে পিতা-মাতার অধিকার রক্ষার নামে এমন কোনো আইনি অস্পষ্টতা (Legal Ambiguity) যেন তৈরি না হয়, যা পরবর্তীতে নতুন বিরোধ ও জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
 
সবমিলিয়ে, বিষয়টিকে আবেগ বা রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে নয়, তিনটি পৃথক স্তরে দেখা উচিত:
 
প্রথমত, বাংলাদেশের হস্তান্তর আইন (Transfer of Property Law) কী করতে চাইছে।
দ্বিতীয়ত, নতুন ব্যবস্থাটি দেওয়ানি আইনের (Civil Law) দৃষ্টিতে কী ধরনের হস্তান্তর তৈরি করছে।
তৃতীয়ত, একজন মুসলিম এই ব্যবস্থা গ্রহণ করলে হানাফি ফিকহে তার প্রকৃত শরঈ অবস্থান কী হবে।
 
এর পাশাপাশি চতুর্থ একটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ যে, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামোর সঙ্গে (Existing Legal Framework) নতুন বিধানটির কোথাও সাংঘর্ষিকতা (Conflict), অস্পষ্টতা (Ambiguity) বা ফাঁকফোকর (Loopholes) তৈরি হচ্ছে কি না।
তাই এই মুহূর্তে দরকার আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি ছড়ানো নয়; দরকার সচেতনতা, আইনগত পর্যালোচনা (Legal Review) এবং যোগ্য আলেমদের ফিকহি পর্যালোচনা (Fiqh Review)।
 
সরকার পিতা-মাতার অধিকার সংরক্ষণ করতে চেয়েছে, এটি ইতিবাচক উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতিটি মুসলিম পারিবারিক আইন (Muslim Family Law), হানাফি ফিকহ (Hanafi Fiqh) এবং বাংলাদেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোর (Existing Legal Framework) সঙ্গে কোথায় সামঞ্জস্যপূর্ণ, কোথায় প্রশ্ন তৈরি করে এবং কোথায় সংশোধনের প্রয়োজন আছে, তা এখনই গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।
বিভ্রান্তি নয়, সচেতনতা জরুরি।