এলএনজি সরবরাহে টান, কয়লার সংকট আর একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটি— তিন দিকের চাপে আবারও নাজুক হয়ে পড়েছে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি। চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ ঘাটতি থাকায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে কয়লার সংকটে রামপাল ও পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যান্ত্রিক ত্রুটিতে পায়রা ও বড়পুকুরিয়া কেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহে। বাসাবাড়ি থেকে শিল্পকারখানা— সবখানেই বাড়ছে ভোগান্তি।
তবে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশা করছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। তাদের প্রত্যাশা, আগামী সপ্তাহের শুরু থেকেই এলএনজি সরবরাহ বাড়বে। পাশাপাশি কয়লা সরবরাহ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট কিছুটা কমে আসতে পারে।
কমেছে এলএনজি সরবরাহ: বাংলাদেশ তেল গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্রে জানা গেছে, দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সরবরাহ নেমে আসে ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে। পরে টার্মিনালটি মেরামত করে চালু করা হলে গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। গত মাসের শেষ দিকে এলএনজি সরবরাহ ৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি হয়েছিল। কিন্তু কয়েকটি কার্গো নির্ধারিত সময়ে না আসায় আবারও সরবরাহ কমতে শুরু করে। চলতি মাসের শুরু থেকে তা কমে ৭১ থেকে ৭২ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। কয়েক দিন ৭১ কোটি ঘনফুটের আশপাশে থাকার পর গতকাল সরবরাহ আরও কমে দাঁড়ায় প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুটে।
দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে বর্তমানে কমবেশি ১৬২ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এর সঙ্গে এলএনজি যোগ করে মোট সরবরাহ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৩২ কোটি ঘনফুট। অথচ সরকারি হিসাবে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। খাতসংশ্লিষ্টদের হিসাবে প্রকৃত চাহিদা আরও অনেক বেশি— প্রায় ৫৫০ কোটি ঘনফুট।
বর্তমানের তুলনায় প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট বেশি গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। চলতি মাসে সাতটি এলএনজি কার্গো সরবরাহের নিশ্চয়তাও পাওয়া গেছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক প্রকৌশলী মো. শোয়েব গতকাল আগামীর সময়কে বলেছেন, কয়েকটি কার্গো সময়মতো না আসায় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তবে আগামী সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ধাক্কা : গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে এখন বড় ভরসা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট। পরিকল্পনা ছিল এসব কেন্দ্র থেকে অন্তত ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের। কিন্তু কয়লা সংকট ও বিভিন্ন কেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটির কারণে সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
কয়লার সংকটের কারণে ১ হাজার ২৩৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৪৫৫ মেগাওয়াট। একই কারণে ১ হাজার ১৭০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পটুয়াখালী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রেও প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট কম উৎপাদন হচ্ছে।
পটুয়াখালী কেন্দ্রের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কয়লা আমদানিতে আপাতত কোনো বড় সংকট নেই। তবে পর্যাপ্ত কয়লা মজুদ করার আগেই বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে কেন্দ্রটি চালু করা হয়েছে। ফলে কোনো কারণে কয়লা দেশে পৌঁছাতে সামান্য দেরি হলেই কেন্দ্রটিতে সংকট তৈরি হয়।
তিনি বলেছেন, বিদেশ থেকে কয়লা বড় জাহাজে করে আনার পর ছোট জাহাজে বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিতে হয়। সমুদ্র উত্তাল থাকলে সেই পরিবহনেও দেরি হয়। এ কারণে এক থেকে দেড় লাখ টন কয়লা মজুদ করার পরিকল্পনা নিয়ে একটি কমিটি কাজ করছে। এই মজুদ তৈরি করা গেলে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ১ হাজার ১৬৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রেও উৎপাদন কমে প্রায় ৫৭০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
কেন্দ্রটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে দুটি ইউনিটই চালু রয়েছে। কিন্তু কয়লার গুণগত মানের সমস্যা এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
এখন একটি ইউনিট বন্ধ রেখে অন্য ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। পরে একইভাবে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ করা হবে। দুই ইউনিটের রক্ষণাবেক্ষণ শেষ করতে প্রায় ২০ দিন সময় লাগতে পারে। এদিকে দীর্ঘদিন ধরেই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।
কমেছে আদানির বিদ্যুৎও: দেশের নিজস্ব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি ভারতের আদানি পাওয়ার থেকে কমবেশি ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি থেকে দৈনিক গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
আদানি পাওয়ার জানিয়েছে, ভারতে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে কয়লা পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। এজন্য আবহাওয়ার উন্নতি প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।
গ্যাসের অভাবে কমেছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ: গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। দেশে এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। পূর্ণ সক্ষমতায় এসব কেন্দ্র চালাতে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে কখনোই সে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।
গ্রীষ্মে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। এতে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয়। বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ কমে প্রায় ৮৫ কোটি ঘনফুটে নেমে আসায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমেছে।
চাহিদা কমায় কিছুটা কমেছে লোডশেডিং: উৎপাদন কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে গরম কিছুটা কমে আসায় বিদ্যুতের চাহিদা কমেছে। ফলে লোডশেডিংও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। গত মাসে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় গড় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। বিপরীতে গড়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে।
গত ১০ আগস্ট লোডশেডিং একপর্যায়ে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা ছিল স্মরণকালের সর্বোচ্চগুলোর একটি। চলতি মাসে বিদ্যুতের চাহিদা কমে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে থাকায় লোডশেডিং কিছুটা কমেছে। তবে সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
গতকাল বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭৯০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৬৬৮ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে ঘাটতি দাঁড়ায় ২ হাজার ১২২ মেগাওয়াট। তবে দিনের বেলায় লোডশেডিং তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এর আগের দিন শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৮০৬ মেগাওয়াট। ওই সময় লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ২০২ মেগাওয়াট।
অন্যদিকে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কোনো লোডশেডিং ছিল না। ওই সময়ে বিদ্যুতের গড় চাহিদা ছিল ১২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। তবে এর আগে ও পরে আবারও লোডশেডিং হয়েছে। ওইদিন রাত ১টার দিকে লোডশেডিং ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।
সব মিলিয়ে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া, কয়লা পরিবহনে বাধা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কারিগরি ত্রুটি— এই তিন কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তার চাপ পড়ছে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্পকারখানার ওপর। তবে এলএনজি কার্গো সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং কয়লা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সমস্যা কাটিয়ে ওঠা গেলে আগামী সপ্তাহ থেকেই পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।