Image description

দেশে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনে দরপত্র ছাড়াই চীনা কোম্পানি সিএনইইর প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। তবে টার্মিনালটির দৈনিক তিন লাখ ৪২ হাজার ডলার ভাড়া নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান দুই এফএসআরইউর তুলনায় এটা ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি।

 

গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি জিটুজি (সরকার থেকে সরকার) ব্যবস্থায় সিএনইইর প্রস্তাবটি প্রক্রিয়াকরণের অনুমোদন দেয়। একই প্রকল্পে এর আগে এনএস এনার্জি নেভিগেশন যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তার সঙ্গে সিএনইইর (চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড) প্রস্তাবের তথ্য, ভাষা ও উপস্থাপনায় অস্বাভাবিক মিল পাওয়া গেছে। এমনকি সিএনইইর নথিতে থাকা একটি মানচিত্রে এনএস এনার্জি নেভিগেশনের নামও রয়ে গেছে।

 

জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, এনএস এনার্জি নেভিগেশনের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন সংসদ সদস্যের এক আত্মীয় জড়িত। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি।

 

দুই কোম্পানির প্রস্তাব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এনএস এনার্জি নেভিগেশন গত ১২ মে তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। এর প্রায় এক মাস পর ১৯ জুন একই প্রকল্পে সিএনইই প্রস্তাব জমা দেয়। দুই প্রস্তাবেই কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় টার্মিনাল স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

 

শুধু প্রকল্পের স্থান নয়, দুই প্রস্তাবের কারিগরি কাঠামোতেও মিল আছে। উভয় নথিতে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার ঘনমিটার সংরক্ষণ ক্ষমতার এফএসআরইউ, বেস হিসেবে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সর্বোচ্চ ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুনঃগ্যাসীকরণের সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। মহেশখালী আরএলএনজি টাই-ইন পয়েন্ট থেকে চার থেকে ছয় কিলোমিটার অফশোরে টার্মিনাল স্থাপন, ১৮ থেকে ২০ মিটার পানির গভীরতা এবং চার থেকে ছয় কিলোমিটার সাবসি পাইপলাইনের কথাও দুই নথিতে রয়েছে।

 

জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সংযোগের পরিকল্পনাও একই। দুই প্রস্তাবেই বিদ্যমান মহেশখালী-আনোয়ারা ৪২ ইঞ্চি পাইপলাইনের সঙ্গে সংযোগের কথা বলা হয়েছে। টার্মিনালের সুবিধা হিসেবে দ্রুত বাস্তবায়ন, কম মূলধন ব্যয়, পরীক্ষিত এফএসআরইউ প্রযুক্তি, কম ভূমি অধিগ্রহণ ও পরিবেশগত প্রভাব এবং জ্বালানি সরবরাহের উৎস বহুমুখীকরণের বিষয়গুলোও প্রায় একই ভাষা ও কাঠামোয় উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

বাণিজ্যিক কাঠামোতেও মিল রয়েছে। উভয় কোম্পানি ২০ বছর মেয়াদি বিল্ড-ওন-অপারেট (বিওও) পদ্ধতিকে অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হিসেবে দেখিয়েছে। বিকল্প হিসেবে বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফার (বিওওটি) মডেলের কথা বলা হলেও এফএসআরইউ হস্তান্তরের খরচের কারণে সেটিকে বেশি ব্যয়বহুল বলা হয়েছে। টার্মিনাল ইউজ অ্যাগ্রিমেন্ট (টিইউএ) ও ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (আইএ) করার কাঠামোও একই রকমের।

 

বাস্তবায়ন সময়সূচির ক্ষেত্রেও একই তথ্য রয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে চুক্তি হলে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য দুই প্রস্তাবেই রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালের শীতকালকে কাজে লাগিয়ে অফশোর ও সাবসি কাজ শুরুর যুক্তিও একইভাবে দেওয়া হয়েছে।

 

দায়িত্ব বণ্টনেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য মিল। কোম্পানির দায়িত্ব হিসেবে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, ভূভৌত ও ভূপ্রকৌশল জরিপ, মুরিং বিশ্লেষণ, প্রকল্পের অর্থায়ন এবং টার্মিনাল নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। সরকারের দায়িত্ব হিসেবে অনুমোদন ও লাইসেন্স, এফএসআরইউ নোঙরের জন্য প্রয়োজনীয় পানির গভীরতা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য দেওয়ার বিষয় রাখা হয়েছে।

 

কোম্পানির নাম, তারিখ, স্বাক্ষরকারী, প্রচ্ছদ এবং নিজস্ব কোম্পানি পরিচিতির পরিশিষ্ট বাদ দিলে মূল প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশে একই ভাষা, তথ্য ও কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে কারিগরি স্পেসিফিকেশন, প্রকল্পের সুবিধা, বাণিজ্যিক কাঠামো, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও দায়িত্ব বণ্টনের মতো অংশে এই মিল দেখা গেছে। 

 

চীনা কোম্পানির ভাড়া বেশি

এদিকে ভাড়ার হিসাবেও বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। ১৫ বছরের জন্য প্রতিদিন তিন লাখ ৪২ হাজার ডলার চেয়েছে সিএনইই। ২০২৫ সালে সরকারের করা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে এ ধরনের টার্মিনালের দৈনিক ভাড়ার বেঞ্চমার্ক ধরা হয়েছিল দুই লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলার। অর্থাৎ, সিএনইইর প্রস্তাবিত ভাড়া ওই বেঞ্চমার্কের চেয়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ বেশি।

 

বাংলাদেশে বর্তমানে দুটি এফএসআরইউ চালু রয়েছে। একটি সামিট গ্রুপের এবং অন্যটি এক্সিলারেট এনার্জির। এক্সিলারেটের টার্মিনালের দৈনিক ভাড়া প্রায় দুই লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিটের দুই লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার। ফলে সিএনইইর প্রস্তাবিত ভাড়া এসব টার্মিনালের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি।

 

এর আগে তৃতীয় এফএসআরইউ স্থাপনে সামিট গ্রুপের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়েছিল। ২০২৪ সালের মার্চে করা ওই চুক্তিতে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতার টার্মিনালের জন্য সামিট প্রতিদিন তিন লাখ ডলার ভাড়া চেয়েছিল। পরে চুক্তিটি বাতিল করে সরকার। বিষয়টি নিয়ে সামিট আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে।

 

সিএনইইর প্রস্তাবিত ভাড়া সামিটের ওই প্রস্তাবের চেয়েও প্রতিদিন ৪২ হাজার ডলার বেশি। ১৫ বছরে এই অতিরিক্ত ভাড়ার পরিমাণ প্রায় ২৩ কোটি ডলার। এক ডলার ১২২ টাকা হিসাবে তা প্রায় দুই হাজার ৮০৬ কোটি টাকা।

 

উচ্চ ভাড়ার কারণ হিসেবে সিএনইই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, এফএসআরইউ নির্মাণের উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে এ ধরনের টার্মিনালের চাহিদা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছে।

 

এ বিষয়ে জানতে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের মোবাইলে ফোন দিলে তিনি ধরেননি। জ্বালানি সচিব জিয়াউল হক এবং পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের মোবাইলে ফোন দিলেও তারা ধরেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম সমকালকে বলেন, আগের টার্মিনালগুলোর তুলনায় নতুন এফএসআরইউর ভাড়া এত বেশি হওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া এ ধরনের বড় চুক্তির আগে দর ও ব্যয়ের কাঠামো আরও ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে ভাড়া নিয়ে পুনরায় আলোচনা করা প্রয়োজন।