Image description

চলমান জ্বালানি সংকটে আবার আলোচনায় কয়লা উত্তোলন। সরকার দিনাজপুরের ফুলবাড়ী খনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের চিন্তাভাবনা করছে। এজন্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে স্থানীয়দের পুনর্বাসন ও পরিবেশগত প্রভাব পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তুললে পরিবেশ বিপর্যয়, কৃষিজমি ধ্বংসের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদের আশঙ্কায় বিষয়টিতে উদ্বেগ জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে সরকারের প্রতি নিরপেক্ষ সমীক্ষা করার তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ম. তামিম স্ট্রিমকে বলেন, আগে যে প্রতিষ্ঠান কয়লা উত্তোলনের প্রস্তাব দিয়েছিল, তারাই সমীক্ষা চালিয়েছিল। এমন হলে হবে না। সমীক্ষা হতে হবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ ও মানুষের অপূরণীয় ক্ষতি হয়– এমন কোনো প্রকল্পে সরকারের যাওয়া ঠিক হবে না। ফুলবাড়ীতে উচ্চঝুঁকি থাকলে এই কয়লার কথা সরকারের ভুলে যাওয়া উচিত। তবে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রেখে উত্তোলন সম্ভব হলে, ভেবে দেখা যেতে পারে।

 

গত এপ্রিলে প্রকাশিত ‘হাইড্রোকার্বন ইউনিটের গ্যাস অ্যান্ড কোল রিজার্ভ অ্যান্ড প্রডাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফুলবাড়ী কয়লাখনিতে প্রায় ৫৭.২ কোটি টন কয়লা মজুত রয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুতের পরিমাণ ২৮.৮ কোটি টন। এই খনিতে কয়লার স্তর মাটির ১৫০ থেকে ২৭০ মিটার গভীরে, যা উত্তোলন অপেক্ষাকৃত সহজ।

 

গত ২ সেপ্টেম্বর সংসদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফুলবাড়ী কয়লা খনি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওপেন পিটে (উন্মুক্ত পদ্ধতি) স্বাভাবিকভাবে সেখানে কিছু বসতবাড়ি, কৃষিজমি আছে...। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সবার আগে মানুষকে স্থানান্তরের বিষয় দেখা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর আগে গত ১৬ আগস্ট অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন আমরা কয়লার উত্তোলনের দিকে যাচ্ছি। ফুলবাড়ী ও অন্যান্য স্থানে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনে এগোতে হচ্ছে। কারণ, আমাদের সামনে অন্য বিকল্প নেই।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীন হাইড্রোকার্বন ইউনিটের তথ্যে, দেশের পাঁচটি প্রধান কয়লা অববাহিকায় মজুত ৩২৪ কোটি টন। এর মধ্যে একক ক্ষেত্র হিসেবে ফুলবাড়ী হলো সবচেয়ে সমৃদ্ধ কয়লা অববাহিকা।

গত এপ্রিলে প্রকাশিত ‘হাইড্রোকার্বন ইউনিটের গ্যাস অ্যান্ড কোল রিজার্ভ অ্যান্ড প্রডাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ফুলবাড়ী কয়লাখনিতে প্রায় ৫৭.২ কোটি টন কয়লা মজুত রয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুতের পরিমাণ ২৮.৮ কোটি টন। এই খনিতে কয়লার স্তর মাটির ১৫০ থেকে ২৭০ মিটার গভীরে, যা উত্তোলন অপেক্ষাকৃত সহজ।

 

দেশের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে প্রায় ২ কোটি টন কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। ছয়টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কয়লা আমদানির ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১৯ কোটি ১১ লাখ ডলার।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশের একমাত্র সচল কয়লা খনি বড়পুকুরিয়া। এর প্রধান স্তরটির কেন্দ্রীয় অংশের উত্তোলনযোগ্য ৯৬ শতাংশের বেশি কয়লা এরই মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে ৬ লাখ ২৮ হাজার টন কয়লা অবশিষ্ট রয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে প্রায় ২ কোটি টন কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। ছয়টি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কয়লা আমদানির ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১৯ কোটি ১১ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট। গ্যাস সংকটের কারণে অর্ধেকও উৎপাদন হচ্ছে না। জাতীয় গ্রিডে লোডশেডিং কমাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে দেশে স্থাপিত বড় সাতটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ৭ হাজার ৩১২ মেগাওয়াট, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ২৮ ভাগ।

বিএনপি সরকার ২০০৬ সালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কয়লা উত্তোলন না করার চুক্তি করেছিল। এখন তারাই তোলার কথা বলে দায়িত্বহীনতা ও বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করছে।আনু মুহাম্মদ, অর্থনীতিবিদ

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফুলবাড়ী খনি থেকে বছরে ১ কোটি ৫০ লাখ টন কয়লা উত্তোলন করা গেলে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আমদানি করা কয়লার সিংহভাগ মেটানো সম্ভব হবে।

ফুলবাড়ী প্রকল্পের বিষয়ে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মুখপাত্র যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী স্ট্রিমকে বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কাজ শুরু হয়নি। তবে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেহেতু জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় হাতে কোনো বিকল্প নেই। তাই এটি যাচাই-বাছাই এবং বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব স্ট্রিমকে বলেন, ফুলবাড়ী প্রকল্পের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি করা আছে। কয়লা উত্তোলনের সব প্রস্তুতিই রয়েছে বলা যায়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে কাজ শুরু করতে পারব।

তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর আগে জমি অধিগ্রহণ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষতিপূরণের একটি বড় হিসাব করতে হবে। কারণ, বিগত বছরে খনি এলাকায় বসতি ও ঘরবাড়ির সংখ্যা অনেক বেড়েছে।

দিনাজপুরের কয়লাসম্পদ অনুসন্ধানে ১৯৯৪ সালের আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার বিএইচপির সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ। ফুলবাড়ীতে সমৃদ্ধ কয়লা খনির অস্তিত্ব পেলে ১৯৯৭ সালে এশিয়া এনার্জির কাছে লাইসেন্স হস্তান্তর করে বিএইচপি।

ফুলবাড়ী প্রকল্পের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি করা আছে। কয়লা উত্তোলনের সব প্রস্তুতিই রয়েছে বলা যায়। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে কাজ শুরু করতে পারব।প্রকৌশলী মো. শোয়েব, পেট্রোবাংলার পরিচালক

২০০৪ সালে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের চেষ্টা করে এশিয়া এনার্জি। এর বিরোধিতা করে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি আন্দোলনে নামে। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ী খনি এলাকায় ডাকা সমাবেশে তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদস্যরা গুলি চালালে তিনজন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়। একপর্যায়ে কয়লা উত্তোলন থেকে সরে আসে সরকার।

গত ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ী দিবস উপলক্ষে শহরের নিমতলা এলাকায় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সমাবেশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদারের আহ্বান জানান অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ফুলবাড়ী কয়লা খনি কোনো টেকসই প্রকল্প নয়। এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে উর্বর কৃষিজমি ধ্বংস ও ভূগর্ভস্থ পানির মজুত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরকারের কয়লা নীতির সমালোচনা করে আনু মুহাম্মদ বলেন, বিএনপি সরকার ২০০৬ সালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কয়লা উত্তোলন না করার চুক্তি করেছিল। এখন তারাই তোলার কথা বলে দায়িত্বহীনতা ও বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করছে। এর মাধ্যমে এশিয়া এনার্জির ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষা হবে।