Image description

সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর— টানা তিন মাস রাজপথে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। লংমার্চ, রেলযাত্রা, সমাবেশের পর নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশ— ধাপে ধাপে আন্দোলনের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে জোটটির। তবে নভেম্বরেই শেষ হচ্ছে না কর্মসূচি। ১১ দলের নেতারা বলছেন, মহাসমাবেশ থেকে সরকারের প্রতি চূড়ান্ত বার্তা দেওয়া হবে। এরপরও দাবি আদায় না হলে ডিসেম্বর থেকে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাবে তারা।

আর এই ডিসেম্বরেই সামনে আসছে রাজনীতির আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু— ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যার বিচার এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা। ফলে সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া ১১ দলের আন্দোলন নভেম্বর পেরিয়ে ডিসেম্বরের রাজনীতিতে গিয়ে নতুন মাত্রা পেতে পারে। একদিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের চাপ, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মাঠে ফেরার সম্ভাব্য তৎপরতা এবং ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে নতুন কর্মসূচি— সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাস রাজপথ ঘিরে সৃষ্টি হচ্ছে নানা সমীকরণ।

১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা জানিয়েছেন, ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর এবং ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে যশোর ও কুষ্টিয়া পর্যন্ত লংমার্চ হবে। এরপর ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত হবে রেলযাত্রা। সবশেষে ১৪ নভেম্বর রাজধানীতে আয়োজন করা হবে বড় মহাসমাবেশ। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও চলবে ধারাবাহিক কর্মসূচি।

জোটের লক্ষ্য, শুধু রাজধানীতে কর্মসূচি সীমাবদ্ধ না রেখে ধীরে ধীরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া। নভেম্বরের মহাসমাবেশে সর্বোচ্চ জনসম্পৃক্ততা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ওই সমাবেশে অন্তত ১০ লাখ মানুষের জমায়েতের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গ্রাম-গঞ্জ থেকে নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষকে ঢাকায় আনার প্রস্তুতিও চলছে।

লংমার্চ ও রেলযাত্রাকে দলীয় কর্মসূচির গণ্ডিতে না রেখে জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিতে চায় ১১ দল। তাদের ছয় দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও জনস্বার্থের বিষয়।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এর মধ্যে বলেছেন, গণরায়ের বাস্তবায়নে সরকার কোনো বাধা দিলে কিংবা দাবি মানা না হলে রাজপথেই এর চূড়ান্ত মীমাংসা হবে।
১১ দলের মুখপাত্র হামিদুর রহমান আযাদও বলেছেন, গণভোটে দেওয়া রায় সরকার বাস্তবায়ন করেনি।

গণরায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও পূরণ করা হয়নি। এ কারণে ধাপে ধাপে যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হচ্ছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তা চলবে।

তার ভাষ্য, সরকার গণভোটের রায় মেনে না নিলে আরও কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবে ১১ দল। ঢাকার মহাসমাবেশ থেকেই দেওয়া হবে চূড়ান্ত বার্তা।

হাদি হত্যার বিচার দাবিতে সমাবেশ

১১ দলের ধারাবাহিক আন্দোলনের মধ্যেই ডিসেম্বরে রাজপথে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি ইস্যু— ওসমান হাদি হত্যার বিচার। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও আহ্বায়ক ছিলেন ওসমান হাদি। তার হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ার গতি নিয়ে অসন্তুষ্ট সংগঠনটির নেতারা।

ইনকিলাব মঞ্চের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল জাবের জানিয়েছেন, আগামী ১৮ ডিসেম্বর ওসমান হাদির শাহাদাতবার্ষিকীতে রাজধানীর শাহবাগে লাখো মানুষের সমাবেশ করা হবে। ওই সমাবেশ থেকেই হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালো করা হবে।

আব্দুল্লাহ আল জাবেরের অভিযোগ, দীর্ঘসূত্রতা ও নানা টালবাহানায় ওসমান হাদি হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী চার মাসের মধ্যে হত্যাকারীদের ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের বলে দাবি করেছেন তিনি।

তিনি বলেছেন, ‘আমরা আর কর্মসূচি দেব না। আগামী ১৮ ডিসেম্বর ওসমান হাদির শাহাদাতবার্ষিকীতে শাহবাগে লাখো মানুষের সমাবেশ করে তার হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে।’

ফলে নভেম্বরের মহাসমাবেশের পর ডিসেম্বরের রাজপথও ফাঁকা থাকছে না। ১১ দলের আন্দোলনের সম্ভাব্য কঠোর কর্মসূচির পাশাপাশি ১৮ ডিসেম্বর ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে বড় জমায়েতের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চ।

আওয়ামী লীগের ফেরার ঘোষণায় বাড়ছে উত্তাপ

এর মধ্যেই ডিসেম্বরের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, দলের পলাতক নেতাকর্মীদের নিয়ে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তার। দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের কথাও ভাবছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

২০২৫ সালের মে মাস থেকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় অন্তর্বর্তী সরকার এ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পরে নির্বাচন কমিশনও দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে। সম্ভাব্য নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নজরদারি বাড়িয়েছে বলে জানা গেছে।

১১ দলের আন্দোলন নিয়ে বিএনপির অভিযোগ

এদিকে জামায়াতসহ ১১ দলের কর্মসূচিকে ঘিরে বিএনপির পক্ষ থেকেও রাজনৈতিক অভিযোগ উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান অভিযোগ করেছেন, জামায়াত ও এনসিপি মিলে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু করেছে।

গত মঙ্গলবার ঝিনাইদহে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত র‍্যালি শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, আগামী ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার রাজনীতিতে ফেরার ঘোষণা এবং জামায়াত-এনসিপির লংমার্চের ঘোষণা একই ষড়যন্ত্রের অংশ।

রাশেদ খানের অভিযোগ, ১৯৯৬ সালের মতো আবারও আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে মাঠে নামার ষড়যন্ত্র করছে জামায়াত। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করতেই এ অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি আরও বলেছেন, ‘সেপ্টেম্বর-নভেম্বর লংমার্চের মাধ্যমে দেশকে অশান্ত করে, ডিসেম্বর থেকে আওয়ামী লীগসহ নামবে জামায়াত।’

তবে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের এই অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে নারাজ ১১ দলের নেতারা। তাদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য নয়—গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতেই তাদের আন্দোলন। সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করায় তারা রাজপথে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর থেকে যে আন্দোলনের সূচনা হচ্ছে, তার গন্তব্য শুধু নভেম্বরের মহাসমাবেশে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং ১১ দলের কর্মসূচি, ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ১৮ ডিসেম্বরের সমাবেশ এবং আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক তৎপরতা— তিনটি আলাদা ইস্যু ডিসেম্বরের রাজপথে এসে একে অপরের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

ফলে আগামী কয়েক মাসে দেশের রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে রাজপথ। সেপ্টেম্বরের লংমার্চ থেকে শুরু হওয়া উত্তাপ নভেম্বরের মহাসমাবেশ পেরিয়ে ডিসেম্বরের দিকে যত এগোবে, রাজনৈতিক সমীকরণও ততই কঠিন ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।