ক্ষমতার অন্দরমহল যত ছোট হয়, সিদ্ধান্তের পথও তত সংকীর্ণ হয়ে আসে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে এখন ঠিক সেই আশঙ্কাই দেখছে ব্রিটেনের নিরাপত্তা মহল। অভিযোগ, ইউক্রেন যুদ্ধের চাপে ক্রেমলিনে পুতিনের পরামর্শদাতাদের বৃত্ত ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে এবং সেখানে জায়গা করে নিচ্ছেন আরও কট্টরপন্থী ব্যক্তিরা। ফলে রুশ প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত আরও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ব্রিটিশ কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য আই পেপার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ নিরাপত্তা সূত্রগুলো আশঙ্কা করছে, পুতিন এখন আগের তুলনায় অনেক সীমিত একটি গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করছেন। সেই ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মধ্যে থাকা কয়েকজনের অবস্থান আরও কঠোর হওয়ায় রাশিয়ার পররাষ্ট্র ও সামরিক সিদ্ধান্তে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে জার্মানির লিপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার চেষ্টা ঘিরে। জার্মান কর্তৃপক্ষ ওই ঘটনার জন্য সরাসরি রাশিয়াকে দায়ী করেছে। ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাশিয়ার তথাকথিত ‘গ্রে জোন’ বা সীমিত সংঘাতের কৌশলের নতুন ধাপ হতে পারে যেখানে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা না করেও প্রতিপক্ষের অবকাঠামো ও নিরাপত্তাকে চাপের মুখে ফেলা হয়।
নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেন যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় মস্কো এখন পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে। বিশেষ করে ব্রিটেন, যেটি ইউক্রেনের অন্যতম বড় সমর্থক, তাকে লক্ষ্য করে রাশিয়া নতুন ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
পুতিনের ঘনিষ্ঠ বলয়ে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এসভিআরের প্রধান সের্গেই নারিশকিন, নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক প্রধান নিকোলাই পাত্রুশেভ, প্রেসিডেন্ট প্রশাসনের উপপ্রধান সের্গেই কিরিয়েনকো, এফএসবির প্রধান আলেকজান্ডার বোর্টনিকভ এবং সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, এদের অনেকেই নিরাপত্তা ও সামরিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
রাশিয়া অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। মস্কোর দাবি, পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ তৈরির জন্য এমন অভিযোগ তুলছে। ক্রেমলিন বরাবরই বলে এসেছে, রাশিয়ার সামরিক পদক্ষেপগুলো দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেই নেওয়া হচ্ছে।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছে এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। একই সঙ্গে ন্যাটো সদস্য দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিও বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, যে কোনও ভুল হিসাব বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কারণ ইউক্রেনের যুদ্ধ এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাশিয়া ও পশ্চিমা জোটের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নিয়েছে।
পুতিনের সামনে এখন দুটি পথ: যুদ্ধের চাপ সামলে কূটনৈতিক সমাধানের দিকে যাওয়া, অথবা আরও কঠোর অবস্থান নেওয়া। কিন্তু ব্রিটিশ নিরাপত্তা মহলের আশঙ্কা, যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসর আরও সংকুচিত হয়, তবে বিশ্বকে নতুন কোনও অপ্রত্যাশিত সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে।