Image description
বেশি দামে পুরোনো সিগারেট বিক্রি

প্রতি বছর বাজেটের পর দেশে ব্যবসা করা কোম্পানিগুলো নতুন প্যাকেট তৈরিতে এক ধরনের শুভংকরের ফাঁকি দেয়। জাতীয় বাজেটে নির্ধারিত সিগারেটের নতুন মূল্যস্তর অনুযায়ী প্যাকেট তৈরিতে সময়ক্ষেপণ করে। এই সময় বাজারে পুরোনো সিগারেট বাড়তি দামে বিক্রি হয়। এতে সরকার বিশাল অঙ্কের রাজস্ব হারায়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন মূল্যস্তর নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও দেশের দুই বৃহৎ সিগারেট কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেড ও জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনালের সিগারেট বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামে।

দেশের আইন অনুযায়ী, সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে দেওয়া সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নেই। কিন্তু কোম্পানি দুটির সিগারেটের ক্ষেত্রে বাজারে তা পরিপালন হচ্ছে না। যার প্রমাণ পেয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, সিগারেটের ক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন মূল্যস্তর নির্ধারণ করেছে এনবিআর। আর সিগারেট বিক্রির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের বেশি দামে বিক্রি করা যাবে না বলেও আইন পাস হয়েছে। কিন্তু বাজেটের দুই মাস পরও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর সিগারেট বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। সরেজমিন যার প্রমাণ পেয়েছেন ভ্যাট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সাধারণত সিগারেট বিপণনের সময় সর্বশেষ খুচরা মূল্যের ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। সংসদে পাস হওয়া আইন অনুযায়ী, খুচরা মূল্যের অধিক দামে কোনো পর্যায়েই সিগারেট বিক্রি করা যাবে না বলেও ভ্যাট গোয়েন্দার চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ বিগত অর্থবছরের মুদ্রিত প্যাকেট ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো নতুন মূল্যস্তরের দামে বিক্রি করছে। যা আইনের পরিপন্থি বলেও জানিয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

সংস্থাটির মহাপরিচালক বাড়তি দামে বিক্রির কারণে সরকারের ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি হচ্ছে জানিয়ে বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নিতে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট, এলটিইউকে (ভ্যাট) চিঠি দিয়েছেন। কারণ এলটিইউ ভ্যাটের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ পিএলসি এবং জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, ভ্যাট বাস্তবায়ন ও ভ্যাট পলিসির সদস্যকে অনুলিপি দিয়েছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভ্যাট পলিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য মো. আজিজুর রহমান কালবেলাকে বলেন, সিগারেট কোম্পানির রাজস্ব সংক্রান্ত একটি চিঠি ভ্যাট গোয়েন্দা থেকে এলটিইউ ভ্যাটকে দেওয়া হয়েছে। এই চিঠির অনুলিপি ভ্যাট পলিসিকেও দেওয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। আগামী সপ্তাহে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান এনবিআরের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

সূত্র আরও জানায়, চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্তরে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে এনবিআর। বাজেটের দুই মাস পরও বাড়তি দামে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো এবং জেটিআইর বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেট বাজারে বিক্রি হওয়ায় সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। এ ছাড়া এনবিআরের আদেশ অনুযায়ী, পূর্বের সর্বোচ্চ মূল্যে মুদ্রিত সিগারেটের প্যাকেটে সিল দ্বারা নতুন সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য মুদ্রণ করার বিধান রয়েছে। এই সিলও ব্যবহার করছে না ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো। আগের বছরে মুদ্রিত প্যাকেট নতুন বছরে তার চেয়ে বেশি দামে বাজারজাত করছে কোম্পানিটি। বাড়তি দামে সিগারেট বাজারজাতে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে বলেও ভ্যাট গোয়েন্দার চিঠিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের মনোনীত পিআর প্রতিষ্ঠান অ্যাবস্ট্রাক্ট স্ট্র্যাটেজির তারিন ফাহিমা কালবেলার এই প্রতিবেদকের কাছে বিষয়টি জানতে চান। পরে আইন অমান্য করে সিগারেট বাজারজাতের বিষয়টি উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠানো হলে তিনি বিষয়টি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর এই সংক্রান্ত বক্তব্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেবেন বলেও জানান। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বাজারে শুধু ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে না। একইভাবে বাজারে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনালের উৎপাদিত সিগারেটও। তবে প্রতিষ্ঠানটি নতুন অর্থবছরে নতুন মূল্যস্তর অনুযায়ী প্যাকেট মুদ্রণ করলেও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। এতে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন ভ্যাট গোয়েন্দার কর্মকর্তারা। বাড়তি দামে জেটিআইর সিগারেট বিক্রির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মোর্শেদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে বিষয়টি উল্লেখ করে তার মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার কালবেলাকে বলেন, নতুন আইন অনুযায়ী পুরোনো মুদ্রিত সিগারেট বাজারজাত করলেও সিলের মাধ্যমে নতুন মূল্য থাকতে হবে। কিন্তু ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো এই আইন পরিপালন করছে না। গত অর্থবছরের মুদ্রিত প্যাকেট নতুন অর্থবছরে বাড়তি মূল্যে বাজারজাত করছে। পুরোনো প্যাকেট নতুন দামে বিক্রি হওয়ায় সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। তাই প্রতিষ্ঠানটি থেকে ভ্যাট আদায় করতে এলটিইউ ভ্যাটকে অনুরোধ করা হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

সার্বিক বিষয়ে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, সিগারেটের প্যাকেটে সরকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) উল্লেখ থাকার পরও এর চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি করা শুধু ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণাই নয়, এটি সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ—দুই ক্ষেত্রেই গুরুতর সমস্যা তৈরি করছে। ২০২৩ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রজ্ঞাপন জারি করে এমআরপির বেশি দামে সিগারেট বিক্রি না করার নির্দেশনা দিলেও বাজারে এর কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক ব্যুরোর গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু গত অর্থবছরেই এমআরপির বেশি দামে সিগারেট বিক্রির কারণে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে। এর অর্থ হলো, বিদ্যমান আইন ও রাজস্ব নীতিমালা যথাযথভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় সরকার একদিকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে তামাক কোম্পানিগুলো বাজারে নিজেদের মতো করে মূল্য নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিগারেটের দাম কার্যকরভাবে বাড়ানো এবং সরকারের নির্ধারিত মূল্য কাঠামো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা তামাক ব্যবহার কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়। কারণ, তামাক ব্যবহার হৃদরোগ, ক্যানসার, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে সিগারেটের সহজলভ্যতা ও ক্রয়ক্ষমতা তামাক ব্যবহারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। অথচ বাজারে যদি কোম্পানিগুলো বা তাদের বিক্রয় নেটওয়ার্ক ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করে এবং একই সঙ্গে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে তামাক নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যও বাধাগ্রস্ত হয়। তাই রাজস্ব সুরক্ষা এবং তামাকের ক্ষতিকর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর স্বার্থে এমআরপি বাস্তবায়নে অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।