Image description

তীব্র গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে দেশের অধিকাংশ পোশাক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। কোথাও কারখানা চলছে অর্ধেক সক্ষমতায়, কোথাও দিনে কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকটে স্থানীয় বস্ত্রকলগুলোতেও উৎপাদন কমেছে। ফলে সময়মতো পোশাক তৈরি ও বিদেশি ক্রেতাদের হাতে পণ্য পৌঁছে দেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন চাপ।

অথচ এর মধ্যেই আগস্টে দেশের তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। শুধু পোশাক নয়, আগস্টে মোট পণ্য রফতানিও বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। তাহলে প্রশ্ন উঠছে—গ্যাসের অভাবে যখন উৎপাদন কমেছে, তখন রফতানি বাড়লো কীভাবে?

রফতানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে এবং রফতানি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আগস্টের এই প্রবৃদ্ধি মূলত আগের বছরের তুলনামূলক কম রফতানির ভিত্তি, আগের মাসের পাওয়া ক্রয়াদেশের পণ্য এখন রফতানি হওয়া এবং কিছু খাতে আগের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করার ফল। কিন্তু এর মধ্যে ভবিষ্যৎ রফতানির জন্য বেশ কিছু সতর্ক সংকেতও তৈরি হয়েছে।

আগস্টে রফতানি বেড়েছে, কিন্তু জুলাইয়ের চেয়ে কম

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে ৪৪২ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে। গত বছরের একই মাসে হয়েছিল ৩৯১ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ।

তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রফতানি হয়েছিল ৪৭২ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে রফতানি কমেছে ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ।

পোশাক খাতেও একই চিত্র। আগস্টে তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ৩৬০ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের। গত বছরের আগস্টের তুলনায় এটি ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। নিট পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক বেড়েছে ১২ দশমিক ৭০ শতাংশ। কিন্তু জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টের রফতানি কমেছে। ফলে শুধু বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার দেখলে পোশাকশিল্পের বর্তমান বাস্তবতা পুরোপুরি বোঝা যায় না।

তাহলে রফতানি বাড়লো কীভাবে?

এর প্রথম কারণ হলো গত বছরের কম ভিত্তি। গত বছরের আগস্টে দেশের পোশাক রফতানি তুলনামূলক কম ছিল। ফলে এবার সেই কম ভিত্তির ওপর হিসাব হওয়ায় প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখা যাচ্ছে।

দ্বিতীয় কারণ, রফতানি ও উৎপাদনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান। আজ যে গ্যাস সংকটের কারণে একটি কারখানার উৎপাদন কমছে, তার প্রভাব একই মাসের রফতানিতে সব সময় দেখা যায় না। কারণ কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস আগে পাওয়া ক্রয়াদেশের পণ্য আগস্টে তৈরি ও জাহাজীকরণ হয়ে থাকতে পারে।

অর্থাৎ আগস্টের রফতানি মূলত অতীতে পাওয়া ক্রয়াদেশের প্রতিফলন। কিন্তু এখন নতুন করে ক্রয়াদেশ কমে গেলে তার প্রভাব সেপ্টেম্বর, অক্টোবর বা পরবর্তী মাসগুলোর রফতানিতে দেখা দিতে পারে।

তৃতীয় কারণ, সব কারখানা একই মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিছু কারখানা মজুত কাঁচামাল, আগের উৎপাদন এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে রফতানি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান ক্রেতার সঙ্গে সময় সমন্বয় করে পণ্য সরবরাহ করেছে। ফলে উৎপাদনে সংকট তৈরি হলেও তার পুরো প্রভাব আগস্টের রফতানি পরিসংখ্যানে এখনও পড়েনি।

আসল চাপ তৈরি হচ্ছে নতুন ক্রয়াদেশে

রফতানি বাড়লেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্যোক্তাদের উদ্বেগের মূল কারণ নতুন ক্রয়াদেশ। বিজিএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে আগের মাসের তুলনায় ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন বা ইউডি ইস্যু প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। বিদেশি ক্রেতার ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির জন্য এই সনদ প্রয়োজন হয়। ফলে ইউডি কমে যাওয়াকে নতুন ক্রয়াদেশ কমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ আগস্টে রফতানি বাড়লেও আগামী কয়েক মাসের জন্য নতুন কাজের প্রবাহে ইতোমধ্যে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। এখানেই গ্যাস সংকটের বড় ঝুঁকি।

গ্যাস সংকটে কারখানা চলছে অর্ধেক সক্ষমতায়

গত ২১ জুলাই এলএনজি সরবরাহের একটি টার্মিনাল অগ্নিদুর্ঘটনায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শিল্পকারখানায় গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়। আগস্টজুড়েই গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, ঢাকা ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় প্রয়োজনীয় চাপের গ্যাস পাওয়া যায়নি। বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব এলাকার অন্তত এক হাজার পোশাক কারখানায় প্রায় বন্ধ থাকার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

বিশেষ করে নিট পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে। কারণ নিট পোশাকের কাপড়ের বড় অংশই দেশের স্থানীয় বস্ত্রকল থেকে আসে। গ্যাসের অভাবে স্পিনিং, বুনন, ডায়িং ও ফিনিশিং কারখানায় উৎপাদন কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে পোশাক কারখানায়। কোনও কোনও কারখানা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করলেও উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। আবার উৎপাদন কম হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

সময়মতো পণ্য দিতে না পারাই বড় ঝুঁকি

পোশাকশিল্পে ক্রেতার কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারখানা কম দামে ভালো মানের পোশাক তৈরি করলেও নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতা বিকল্প দেশে চলে যেতে পারেন।

নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানায় ফ্রান্সের এক ক্রেতার এক লাখ পিস ট্রাউজারের ক্রয়াদেশ চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। কিন্তু গ্যাস সংকটে উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি ক্রেতাকে জানায়, তারা ৫০ হাজারের বেশি পণ্য সরবরাহ করতে পারবে না। এ ধরনের ঘটনা একাধিক কারখানায় ঘটতে থাকলে এর প্রভাব শুধু বর্তমান রফতানিতে নয়, ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশেও পড়তে পারে। কারণ একটি ক্রয়াদেশ হারানোর অর্থ শুধু একটি চালান হারানো নয়—এর সঙ্গে পরবর্তী মৌসুমের কাজও ঝুঁকিতে পড়ে।

৩.৬ বিলিয়ন ডলার ভালো অর্জন, তবে আরও বাড়াতে হবে

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘জ্বালানি সংকটের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে আগস্টে প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি মোটেও খারাপ নয়। তবে শুধু আগের বছরের তুলনায় ১৩-১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে—এটা দেখেই সন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই।’’

তিনি বলেন, ‘‘গত বছরের একই সময়ে রফতানি তুলনামূলক কম ছিল। আবার চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পোশাক রফতানি প্রায় ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ছিল। ফলে আগস্টের প্রবৃদ্ধিকে বর্তমান শিল্প সক্ষমতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।’’

মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, প্রায় ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে প্রতি মাসে গড়ে ৩ দশমিক ৭ থেকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পোশাক রফতানি করতে হবে। সে কারণে বর্তমান রফতানি ধরে রাখার পাশাপাশি আরও প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘‘এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা। রফতানি শিল্পকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কখন কতটুকু গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব, কোথায় ঘাটতি হতে পারে—এসব বিষয়ে কারখানাগুলোকে আগাম তথ্য দিতে হবে। তাহলে উদ্যোক্তারা উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবেন।’’

তিন বছরে বন্ধ প্রায় ৪০০ কারখানা

গ্যাস সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্রয়াদেশের চাপ। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিজিএমইএ’র নেতারা জানান, গত তিন বছরে উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও অর্ডার সংকটের কারণে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সংগঠনটির হিসাবে, গত তিন বছরে পোশাক উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং মজুরি বৃদ্ধির কারণে এ ব্যয় বেড়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছিল। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও পোশাক রফতানি কমেছে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ। এদিকে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

রফতানি বাড়ার মধ্যেই সামনে বড় সতর্ক সংকেত

চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট দুই মাসে মোট পণ্য রফতানি হয়েছে ৯১৫ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে হয়েছিল ৮৬৮ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। দুই মাসে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে রফতানি এখনও বাড়ছে। কিন্তু নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, ইউডি কমে যাওয়া, উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে সামনে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। রফতানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে তাই অনেকটা ‘আজকের আয় ভালো, কিন্তু আগামী দিনের কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তা’ হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।

গ্যাসের সমাধান না হলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন

বিজিএমইএ নেতারা সংকট মোকাবিলায় দ্রুত দুটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, এলএনজি আমদানিতে শুল্ক-কর প্রত্যাহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ এবং সৌরবিদ্যুতের জন্য স্বল্প সুদের ঋণের সুপারিশ করেছেন। তাদের মতে, শুধু আজকের রফতানি আয় বাড়লেই হবে না; আগামী দিনের ক্রয়াদেশ ধরে রাখার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ রফতানি আয় বাড়ানোর মূল ভিত্তি হলো উৎপাদন। আর উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি।

তাই আগস্টের রফতানি প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হলো—গ্যাস সংকটের মধ্যেও রফতানি এখনও বাড়ছে, কারণ বর্তমান রফতানি মূলত আগের সময়ের পাওয়া ক্রয়াদেশ ও কম ভিত্তির প্রতিফলন। কিন্তু নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব আগামী মাসগুলোতে রফতানিতে দেখা দিতে পারে।

সুতরাং, এখন পোশাকশিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আগস্টে রফতানি কত শতাংশ বেড়েছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—গ্যাসের সংকটে আগামী মাসের ক্রয়াদেশ কতটা কমবে এবং কারখানাগুলো সেই ক্রয়াদেশ সময়মতো উৎপাদন ও সরবরাহ করতে পারবে কিনা।