Image description

দেশের সর্বোচ্চ সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা বিসিএসে প্রতিবার কয়েক লাখ প্রার্থী আবেদন করেন। সাধারণ (জেনারেল) ক্যাডারে একেকটি পদের বিপরীতে প্রতিযোগিতা করেন কয়েকশ প্রার্থী। তবু যোগ্য প্রার্থী না পেয়ে বিপুলসংখ্যক পদ খালি থাকছে। টেকনিক্যাল বা পেশাগত ক্যাডারে এ সংকট আরও প্রকট। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, বন, পরিসংখ্যান, তথ্য, কারিগরি শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ক্যাডারে প্রতি বছর শত শত পদ শূন্য রেখে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত যোগ্যতা, সাক্ষাৎকার এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষাসহ সব ধাপ পেরিয়ে উপযুক্ত প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলেও এই সংকট স্পষ্ট হয়েছে। এই বিসিএসে অংশ নিতে আবেদন করেছিলেন পৌনে চার লাখ চাকরিপ্রার্থী। কিন্তু বিভিন্ন ক্যাডারে চাহিদার তুলনায় সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কম। ফলে অনেক পদ শূন্য রাখতে হয়েছে। 

পিএসসি-সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি বিসিএস পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করতে অন্তত ৮০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা ব্যয় হয় রাষ্ট্রের। অথচ যোগ্য প্রার্থী খুঁজে না পাওয়ায় সরকারি ক্যাডার পদ শূন্য থেকে যাচ্ছে। এতে একদিকে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের ওপর চাপ আরও বাড়ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রকে যোগ্য প্রার্থী খুঁজতে অধিক সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। 

৪৭তম বিসিএসে নজিরবিহীন ঘটনা
বিসিএসের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলে। গত ২৮ জুন এই ফল প্রকাশ করা হয়। এতে তিন হাজার ৪৮৭টি ক্যাডার পদের বিপরীতে পিএসসি সুপারিশ করেছে এক হাজার ৩২০ জনকে। দুই হাজার ১৬৭টি ক্যাডার পদ, অর্থাৎ প্রায় ৬২ দশমিক ১ শতাংশ পদ শূন্য থেকে গেছে।

 

প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ক্যাডারের পাশাপাশি আরও ২০১ জনকে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। অর্থাৎ, প্রথম দফায় ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে সুপারিশ করা হয়েছে এক হাজার ৫২১ জনকে। অবশ্য সংশোধিত ফলে প্রাণিসম্পদ (লাইভস্টক) ক্যাডারে নতুন করে আরও ১৪ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আগের বিসিএসগুলোর তুলনায় বড় ব্যবধান গত কয়েকটি বিসিএসের চূড়ান্ত ফলের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ৪৭তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত ক্যাডার কর্মকর্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর আগে ৪৬তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন এক হাজার ৪৫৭ জন, ৪৫তমে এক হাজার ৮০৭ জন, ৪৪তমে এক হাজার ৬৮১ জন এবং ৪৩তমে দুই হাজার ৬৪ জন।

সংকটের করুণ চিত্র
পিএসসির তথ্য অনুযায়ী, সরকারি কলেজগুলোর জন্য বাংলা (শিক্ষা ক্যাডার) বিষয়ের প্রভাষক পদের ফল বর্তমান সংকটের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। এ বিষয়ে অনুমোদিত পদ ছিল ১৩২টি। আবেদনকারী ছিলেন ১৫ হাজার ১৬৮ জন। প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন ১৭৬ জন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মাত্র ১৯ জন। তাদের মধ্যে চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ১০ জন। অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক আবেদনকারী থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ পদ পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

টেকনিক্যাল ক্যাডারে সবচেয়ে বেশি সংকট
পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দিয়েছে টেকনিক্যাল ও পেশাগত ক্যাডারে। তাঁর মতে, চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিক্ষা, প্রাণিসম্পদসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ক্যাডারে পর্যাপ্ত যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে প্রিলিমিনারি, লিখিত অথবা মৌখিক পরীক্ষায় নির্ধারিত ন্যূনতম নম্বর অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ফলে কমিশনের পক্ষে মানদণ্ড শিথিল করে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই।

প্রিলিমিনারিতে বাদ বিপুল প্রার্থী
বিসিএস পরীক্ষার্থীদের মতে, এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় খুব সীমিত সংখ্যক প্রার্থীকে উত্তীর্ণ করা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও চারবারের বিসিএস পরীক্ষার্থী শাহেদুল আকবর রণ বলেন, আগের বিসিএসগুলোতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ হাজার পরীক্ষার্থী প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতেন। কিন্তু ৪৭তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষার জন্য উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ১০ হাজার ৬৪৪ জন। পরবর্তী সময় লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিন হাজার ৬৩১ জন। সেখান থেকে মৌখিক পরীক্ষা শেষে ক্যাডারে সুপারিশ পান মাত্র এক হাজার ৩২০ জন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম ধাপেই প্রার্থীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়ায় পরবর্তী ধাপে প্রতিযোগিতার পরিসরও সংকুচিত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্যাডার পদ পূরণে।

যোগ্যতায় ঘাটতি 
পিএসসির একাধিক কর্মকর্তা জানান, টেকনিক্যাল ক্যাডারে শুধু লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই হয় না। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন, প্রয়োজনীয় একাডেমিক ফল এবং অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হয়। ফলে অনেক আবেদনকারী শেষ পর্যন্ত সুপারিশের যোগ্য হন না।

এ ছাড়া কিছু বিষয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেই প্রতিবছর সীমিত সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হন। তাদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষা, গবেষণা কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেছে নেন।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব একেএম আব্দুল আউয়াল মজুমদারের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও চিকিৎসার মতো খাতে সরকারি ও বেসরকারি চাকরির মধ্যে বেতন ও সুযোগ-সুবিধার বড় ব্যবধান না থাকায় অনেক মেধাবী সরকারি চাকরিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এই ব্যবধান কমানো না গেলে ভবিষ্যতেও টেকনিক্যাল ক্যাডারে শূন্য পদ পূরণে পিএসসিকে একই ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হবে।

জনপ্রশাসন বিশ্লেষক মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করতে হলে শুধু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। নিয়োগ পরীক্ষার কাঠামো, টেকনিক্যাল ক্যাডারের জন্য পৃথক মূল্যায়নব্যবস্থা, প্রিলিমিনারিতে প্রার্থী নির্বাচনের নীতি এবং সামগ্রিক বাছাই প্রক্রিয়াকে সময়োপযোগী করে পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিবছরই হাজার হাজার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ শূন্য থেকে যাওয়ার ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে।