Image description

গত মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে হওয়া পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশও যুক্ত হতে পারে, এমন জোরালো জল্পনা চলছে। তবে বাংলাদেশ বলছে, এখনো তাদের কোনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এমনটাই বলা হয়েছে জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলের এক প্রতিবেদনে।

আগস্টের শুরুতে কার্যকর হওয়া ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্টের’ লক্ষ্য হলো যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই চুক্তি ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এনেছে।

ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক নাভিন মুরশিদ ডয়েচে ভেলেকে বলেন, “এটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষার একটি সমঝোতা হলেও কৌশলগত দিক থেকে দেখলে, এর মূল উদ্দেশ্য আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নিজ নিজ স্বার্থ এগিয়ে নেওয়া।”

মক্কা চুক্তির পক্ষে বাংলাদেশ সরকার

তবে ডয়েচে ভেলে বলছে বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দিলে দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও রয়েছে।

পাকিস্তানের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বহু বাংলাদেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে সামরিক সহায়তা দিয়েছিল।

তবে ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া প্রাণঘাতী আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক ক্রমেই টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে। শেখ হাসিনাকে ভারত সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটানো শেখ হাসিনা ওই আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অনুপস্থিতিতে দণ্ডিত হয়েছেন। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার, মধ্য-ডানপন্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন, মক্কা চুক্তির পক্ষে।

গত সপ্তাহে সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, “আমরা এই চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে দেখি।”

বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দেবে কি না, এমনকি সদস্য হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে কি না, সেই প্রশ্ন এখনো ওঠেনি বলেও তিনি জানান। তার মতে, বিষয়টি নির্ভর করবে চুক্তির বর্তমান সদস্য দেশগুলোর আগ্রহের ওপর।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “তারা যদি বাংলাদেশকে এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে আমরা অবশ্যই বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করব।”

বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের এসব বক্তব্যের বিষয়ে ভারত বলেছে, এই চুক্তির সঙ্গে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত এবং তারা পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, “ভারতের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন সব ঘটনাপ্রবাহ আমরা পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছি এবং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিচ্ছি।

পরস্পরবিরোধী ভূরাজনৈতিক স্বার্থ

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাংলাদেশকে নিজেদের স্বার্থ খুব সতর্কভাবে বিবেচনা করতে হবে।

নাভিন মুরশিদ ডয়েচে ভেলেকে বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ায় সরাসরি প্রচলিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা সীমিত। তাই এ ধরনের চুক্তির মূল ভূমিকা শুধু সীমান্তযুদ্ধ পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।”

তিনি বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব মূলত দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের প্রভাবের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার মধ্যে।”

নাভিন মুরশিদ আরও বলেন, এই চুক্তিতে পাকিস্তান বাংলাদেশকে যুক্ত করার চেষ্টা করছে মূলত ‘ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক’ কারণে।

ভারতের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি করিডোর ও দেশটির পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে দেশটির মূল ভূখণ্ডের এই সরু স্থলপথটি বাংলাদেশের উত্তরের অংশ ঘেঁষে রয়েছে।

নাভিন মুরশিদ বলেন, “বাংলাদেশে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত প্রভাব বাড়লে নয়াদিল্লি এটিকে এমন একটি পরিবর্তন হিসেবে দেখতে পারে, যা আঞ্চলিক সম্পর্কের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।”

এমন পরিস্থিতিতে এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশ কী করবে এবং কী করবে না, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে বলেও তিনি জানান।

নাভিন মুরশিদ বলেন, “বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো সামরিক সংঘাত শুরু হলে তাতে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হবে, সে বিষয়ে একটি পরিষ্কার অবস্থান প্রয়োজন হবে। এমন সংঘাতে পাকিস্তানের পক্ষ নিলে ঢাকার ওপর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে, যা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের সীমার বাইরে চলে যেতে পারে।”

সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবির অবশ্য মনে করেন, বাংলাদেশের এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো কারণ নেই।

তিনি ডয়েচে ভেলেকে বলেন, “গত ৫০ থেকে ৫৫ বছরে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। আমার বিবেচনায়, আজও সেই অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।”

হুমায়ুন কবির আরও বলেন, “তারা একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলছে। কিন্তু যে অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এই ব্যবস্থা, সেটি পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে। আমরা সেই অঞ্চল বা ভৌগোলিক এলাকার অংশ নই। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাংশে অবস্থিত। তাই এ ধরনের সামরিক জোটে বাংলাদেশের অংশ নেওয়ার সরাসরি কোনো ভৌগোলিক যুক্তি নেই।”

চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের লাভ হবে কি?

এই প্রসঙ্গে নাভিন মুরশিদ জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশকে নিজেদের প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ও নিরাপত্তাব্যবস্থা টেকসইভাবে গড়ে তুলতে হবে।

তার মতে, কোনো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চুক্তির অংশ হলে ঢাকার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আধুনিকায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে এবং সামরিক প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারও সহজ হতে পারে।

নাভিন মুরশিদ বলেন, “চুক্তির মূল বক্তব্যে সরাসরি বাণিজ্য, শ্রমবাজার বা অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা বলা হয়নি। তবে নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়গুলো যুক্ত হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এই বিষয়টি ‘ইস্যু লিংকেজ’ নামে পরিচিত।”

তবে হুমায়ুন কবিরের আশঙ্কা, এই চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। তাই তিনি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

হুমায়ুন কবির বলেন, “জাতিসংঘের অধীনে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিই, যা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্নভাবে আমাদের অর্থনীতি বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে যুক্ত, এটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের কর্মীরাও রয়েছেন, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।”

তিনি আরও বলেন, “ এ বিষয়ে তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের জাতীয় স্বার্থের বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিতে হবে।”