Image description

সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের প্রকাশ্য বিভাজন এবার সংঘাতে রূপ নিয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা নিয়োগকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিরোধ চলছিল। এর জেরে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে দিনভর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে তাদের দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় হাতাহাতি-মারামারি হয়েছে।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার পর সমিতির শহীদ সফিউর রহমান মিলনায়তনের সামনে থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত সমিতি ভবনের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক দফা হাতাহাতি-ধাক্কাধাক্কির পর কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। রাত সাড়ে ৮টায় এই খবর লেখা পর্যন্ত শাহবাগ থানা পুলিশের একটি দল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে অবস্থান করছিল। তবে এ ঘটনায় কোনও মামলা হয়েছে কিনা, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।

সংঘর্ষে তিন আইনজীবী আহত হয়েছেন। তারা হলেন, ইব্রাহিম খলিল, জাফর আহমেদ ও আনিসুজ্জামান রায়হান। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ ঘিরেই বিভাজনের শুরু?

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সুপ্রিম কোর্টে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের এই বিভাজনের কেন্দ্রে রয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) নিয়োগ। গত ৩০ জুলাই আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর উইং আগের সব ডিএজি ও এএজির নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে ৮৬ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও ১৭৯ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়। মোট ২৬৫ জনকে রাষ্ট্রের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

 

নতুন নিয়োগের পর আগের দায়িত্বে থাকা অনেক আইন কর্মকর্তা বাদ পড়েন। পাশাপাশি নিয়োগপ্রত্যাশী বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের একটি অংশও কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন। এরপর থেকেই নিয়োগবঞ্চিত দাবি করা আইনজীবীরা অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সামনে নিয়মিত বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন।

নিয়োগবঞ্চিতদের দাবি, তারা দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। দলীয় দুঃসময়ে যারা মাঠে ছিলেন, তাদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত অপরিচিত বা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আইন কর্মকর্তা করা হয়েছে। তাদের ভাষায়, এটি ত্যাগী আইনজীবীদের মূল্যায়ন না করার উদাহরণ।

অপরদিকে নিয়োগ পাওয়া আইন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলা হচ্ছে, পদ না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই একটি পক্ষ অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়কে বিতর্কিত ও অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে চাপের মুখে ফেলা কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যারা দায়িত্ব পেয়েছেন, তারা এখন রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি পেশাগত যোগ্যতা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেই দফায় দফায় মারামারি

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবীরা জানান, মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কর্মরত ডিএজি ও এএজিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যরা একটি শোভাযাত্রা বের করেন। শোভাযাত্রাটি অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের দিকে যাওয়ার সময় সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া নিয়োগবঞ্চিত দাবি করা বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের একটি অংশের মুখোমুখি হয়।

দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানের পক্ষে স্লোগান দিতে থাকে। একপর্যায়ে বাকবিতণ্ডা থেকে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। কিছু সময় পর পরিস্থিতি শান্ত হলেও বিরোধ থামেনি। এরই ধারাবাহিকতায় সন্ধ্যার পর তা ফের সংঘাতে রূপ নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ সফিউর রহমান মিলনায়তনের সামনে একজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও নিয়োগবঞ্চিত দাবি করা আইনজীবী জাফর আহমেদের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তা হাতাহাতিতে গড়ায়। পরে দুই পক্ষের আরও কয়েকজন আইনজীবী এতে জড়িয়ে পড়েন।

সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটের দিকে সমিতির চত্বরের পাশের প্রবেশপথের কাছে আইনজীবী এবিএম ইব্রাহিম খলিলকে কয়েকজন আইনজীবী মারধর করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এর কিছুক্ষণ পর একই গেটের পাশে ব্যাডমিন্টন কোর্টের সামনেও দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে মারামারি হয়।

এভাবে দফায় দফায় সংঘাত চলার পর কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশও ঘটনাস্থলে অবস্থান নেয়।

সাধারণ আইনজীবীদের মধ্যে অস্বস্তি

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ আইনজীবীদের একটি অংশ এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কোনও রাজনৈতিক দলের অনুসারী আইনজীবীরা নিজেদের মধ্যে এভাবে প্রকাশ্যে সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তা শুধু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করে না, পুরো আইনজীবী সমাজ এবং বিচারাঙ্গন সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা দেয়।

বিশেষ করে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে এবং দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনেই বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে এমন সংঘাত রাজনৈতিকভাবেও বিব্রতকর বলে মনে করছেন তারা।

একটি সূত্র জানায়, পরস্পর হাতাহাতির ঘটনায় আহতদের হাসপাতালে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে মামলা দায়েরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ফোরামের জ্যেষ্ঠ নেতারা বিষয়টি সুরাহার চেষ্টা করছেন। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে পারে বলেও শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে জানতে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি।