তেরো লাখ টাকা ঘুষ দিলেই জাতীয় জাদুঘরে চাকরির নিশ্চয়তা দেন তিনি। গত এপ্রিলে এ-সংক্রান্ত কল রেকর্ড ফাঁস হলে সমালোচনার মুখে বদলি করা হয় আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে। তবে অল্প সময়ের ব্যবধানে ফের জাতীয় জাদুঘরে ফিরেছেন মো. সুমন মিয়া।
জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন সহকারীর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন সুমন। কল রেকর্ড ফাঁসের ঘটনায় বদলি ছাড়াও বিভাগীয় তদন্তের মুখে পড়েন তিনি। সেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই জাতীয় জাদুঘরের রেজিস্ট্রেশন শাখায় সংযুক্ত করা হয় তাকে।
গত ১২ আগস্ট জাতীয় জাদুঘরের প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখা থেকে জারি করা এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
চলতি বছরের এপ্রিলে সুমন মিয়ার ঘুষ লেনদেনের ফোনালাপ ফাঁস হয়। এ সময় জাদুঘরের বিভিন্ন পদে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে নিয়োগ পাওয়া ৪৮ জনের নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।
এক চাকরিপ্রত্যাশীর সঙ্গে ফোনালাপে সুমন মিয়াকে বলতে শোনা যায়, ‘বাজারদর অনুযায়ী রেট হলো ১৩ (১৩ লাখ)।’ ঘুষের পরিমাণ কমানোর কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে সুমন নিজেকে কেবল টাকা যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন।
ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে চাকরি পাওয়ার শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে সুমন মিয়া বলেন, ‘টোটাল প্যাকেজ এক খরচেই। তোমার চিন্তা করার দরকার নাই। কী করা লাগবে, না লাগবে, তোমার জানার দরকার নাই এবং পরীক্ষায় পাস করারও কোনো প্রয়োজন নেই।’
বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার মুখে গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন’ দাবি করা হলেও একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। তখন অভিযুক্ত সুমন মিয়াকে বদলি করা হয় আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে।
তবে মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা দৃশ্যমান শাস্তি ছাড়াই সুমন মিয়াকে আবারও শাহবাগে অবস্থিত জাদুঘরে ফিরিয়ে আনা হলো।
বোনের নিয়োগে জালিয়াতি
বিতর্কিত ৪৮ নিয়োগের মধ্যে সুমনের নিজের বোন মোছা. তাসলিমা আক্তারও ছিলেন। তাকে ‘টেলিফোন অপারেটর’ পদে চাকরি দেওয়া হয়, যার অনলাইন আবেদনপত্রে সুমনের ইমেইল ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রক্সি পরীক্ষার মাধ্যমে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
সমালোচনা এড়াতে এবং ভাই-বোনের সম্পর্ক আড়াল করতে নিয়োগের পরপরই তাসলিমা আক্তারকে ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালায় বদলি করা হয়। যদিও সেখানে টেলিফোন অপারেটরের কোনো পদ ছিল না।
নারী কর্মীকে গর্ভাবস্থায় বদলি
চলতি বছরের এপ্রিলে ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনায় জুয়েল রানা নামের একজনের প্রতি ক্ষিপ্ত হন সুমন ও তার সহযোগীরা। তাকে চট্টগ্রামের জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে বদলি করা হয়। পাশাপাশি ক্ষোভ মেটাতে জুয়েল রানার স্ত্রী, আউটসোর্সিংয়ে নিরাপত্তা প্রহরী পদে কর্মরত সোনিয়া আক্তারকেও বদলি করে আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে পাঠানো হয়। এ সময় সোনিয়া আক্তার অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
সামগ্রিক বিষয়ে কথা বলতে সুমন মিয়াকে কয়েক দফায় ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
সুমনের ঘুষ দাবির অডিও ফাঁস হওয়ার পর সেটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। আহ্বায়ক করা হয় জাতীয় জাদুঘরের কিপার (পরিচালক) মো. মনিরুল ইসলামকে। যদিও অভিযোগ আছে, বিতর্কিত সেই প্রক্সি পরীক্ষার হল পরিদর্শক ছিলেন তিনি। এ ছাড়া কমিটির সদস্যসচিব ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা অফিসার মালেক মিলন এবং সদস্য ঊর্ধ্বতন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সমিরন রায়।
তদন্তে কী পাওয়া গেছে, জানতে চাইলে সমিরন রায় এ ব্যাপারে কমিটির আহ্বায়কের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। সদস্য সচিব মালেক মিলনও একই কথা বলেন। মো. মনিরুল ইসলামের কাছে প্রশ্ন করা হলে তিনিও অপারগতা প্রকাশ করেন এবং এ ব্যাপারে মহাপরিচালক ও সচিব কথা বলবেন বলে জানান।
অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ সম্পন্ন করা এবং সুমনকে জাতীয় জাদুঘরে ফেরানোর ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব ও সচিব মো. সাদেকুল ইসলামের নাম সামনে আসছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে সচিব মো. সাদেকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। তিনি তার অসুস্থতার কথা জানিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব বলেন, ‘অনেকেই তো অনেক কথা বলে। এগুলো সত্যি নয়। নিয়োগ, দুর্নীতি নিয়ে যেসব কথা মানুষ বলে, এগুলো সব মিথ্যা ও বানোয়াট।’
তদন্ত শেষের আগেই সুমনকে জাতীয় জাদুঘরে ফেরানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তদন্তে তার ব্যাপারে ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছি। তাই আনা হয়েছে। আরও তদন্ত চলছে।’