হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী-চক্র। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পরপরই যাত্রীদের গতিবিধি অনুসরণ করে টার্গেট করছে চক্রের সদস্যরা। টার্গেট যাত্রীকে ঘেরাও করে ভয়ভীতি দেখিয়ে কিংবা মারধর করে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে সঙ্গে থাকা টাকা, স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান সামগ্রী। সর্বশেষ ঘটনা শুক্রবার রাতের। মালয়েশিয়া প্রবাসী কাউসার বোনের বিয়ে উপলক্ষ্যে বাংলাদেশে ২০০ গ্রাম স্বর্ণালংকার পাঠান।
নরসিংদীর রায়পুরা থানার অলিপুরা গ্রামের মো. সুমন ও তার বন্ধু রোহান চৌধুরী বিমানবন্দর থেকে ওই স্বর্ণ গ্রহণ করেন। পরে দুজন ১০০ গ্রাম করে স্বর্ণ ভাগ করে একটি গাড়িতে ওঠেন। রাত আনুমানিক ৮টা ১০ মিনিটে বিমানবন্দর থানাধীন ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের স্কাইলাক ভবনের বিপরীত পাশে গাড়ি থেকে নামার পরপরই তিন ছিনতাইকারী তাদের ঘিরে ফেলে।
এ সময় তাদের কাছে বোমা রয়েছে বলে ভয় দেখানো হয়। পরে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুসি দিয়ে সুমনের কাছ থেকে ১০০ গ্রাম এবং রোহানের কাছে থাকা বাকি স্বর্ণ ছিনিয়ে নেয়। ছিনিয়ে নেওয়া স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ৪০ লাখ টাকা। এ ঘটনায় শনিবার বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন প্রবাসী কাউসারের ভাই সুমন। পরে অভিযান চালিয়ে চক্রটির তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার তিনজনের নাম শান্ত, রিপন ও রউপ মিয়া। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানায় পুলিশ।
বিমানবন্দর এলাকা থেকে ২০০ গ্রাম স্বর্ণ ছিনতাইয়ের এ ঘটনা সামনে আসার পর যুগান্তরের তরফ থেকে খোঁজখবর নিয়ে এ বিষয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। বিমানবন্দরে যাত্রী নামার পরপরই তাদের কারও কারও তথ্য আগেভাগে বাইরে অপেক্ষমাণ ছিনতাইকারী-চক্রের কাছে পৌঁছে যায়। বিশেষ করে স্বর্ণ বা বিপুল অর্থ বহনকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের গতিপথ অনুসরণ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। তদন্তে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি, পরিবহণকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী বা অন্য কারও মাধ্যমে যাত্রীদের তথ্য পাচার হচ্ছে কি না-এখন সেটিরও তদন্ত দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিমানবন্দরে যাত্রীদের টার্গেট করার ক্ষেত্রে চক্রটি আগে থেকেই ওত পেতে থাকে। বিশেষ করে যেসব যাত্রীর কাছে স্বর্ণ, বৈদেশিক মুদ্রা বা বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা থাকার সম্ভাবনা থাকে, তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখে। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর অনুসরণ করে নির্জন বা তুলনামূলক কম নজরদারির জায়গায় গিয়ে যাত্রীকে ঘিরে ফেলে। এক পর্যায়ে যাত্রীর কাছে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয় চক্রটি। গত শুক্রবারের ঘটনায়ও একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে বলে মামলার এজাহার সূত্র এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী কাউসারের ছোট ভাই সুমন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার বড় ভাই মালয়েশিয়ায় থাকেন। বোনের বিয়ে ও পরিবারের ব্যবহারের জন্য তিনি ২০০ গ্রাম স্বর্ণ পাঠিয়েছিলেন। বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণ নিয়ে ভাড়া করা হায়েস গাড়িতে করে বের হওয়ার পর বলাকা ভবনের বিপরীত পাশে রাস্তায় পৌঁছা মাত্র ছিনতাইকারীরা আমাদের ঘিরে ধরে। পরে সবকিছু নিয়ে যায়।’
ঘটনার পরপরই চক্রটির সন্ধানে অভিযান শুরু করে বিমানবন্দর থানা পুলিশ। একপর্যায়ে শনিবার শান্ত, রিপন ও রউপ মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মির্জা তারেক আহমেদ বেগ যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা বেশ কয়েকদিন ধরেই এ চক্রটিকে ধরার চেষ্টা করছি। সর্বশেষ শুক্রবারের ঘটনাটি সামনে এলে তৎপরতা বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে শনিবার চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। অপরাধে আরও কারা জড়িত, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে।’
কুপিয়ে ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ছিনতাই : শুধু স্বর্ণ ছিনতাই নয়, এর আগেও বিমানবন্দর সড়কে বিপুল পরিমাণ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ৯ আগস্ট উত্তরায় অবস্থিত ডিএল পেট্রোল পাম্পের এক কর্মচারী ১ কোটি ২১ লাখ ২৫ হাজার টাকা নিয়ে ব্যাংকে যাওয়ার পথে বিমানবন্দর সড়কের ক্রাউন প্লাজার সামনে সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। জনবহুল এলাকায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে ওই কর্মচারীকে কুপিয়ে আহত করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় ৬-৭ জনের একটি দল। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার আব্দুল করিম। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিপুল পরিমাণ টাকা বহনের তথ্য কীভাবে ছিনতাইকারীদের কাছে পৌঁছাল, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর গতিবিধি ও অর্থ বহনের তথ্য আগে থেকেই জেনে টার্গেট করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিদেশগামী যাত্রীও রেহাই পাচ্ছেন না : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন দেশি-বিদেশি অসংখ্য যাত্রী এই বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। বিমানবন্দর ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার নজরদারি রয়েছে। এরপরও বিমানবন্দর পৌঁছার কিছু সময় আগে যাত্রীর কাছ থেকে অর্থ ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সৌদি প্রবাসী যাত্রী আরিফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘গত মাসে আমার ফ্লাইট ছিল দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে। বিমানবন্দরে ঢোকার পথে আমার গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। আমি দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কয়েকজন লোক এসে আমাকে আটকায়। পরে তারা আমার পকেটে থাকা ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যায়।’