ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনেও সরকারি দলের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে না বিরোধী দল গতিমুখ বদলাতে পারবে, সেটা আগে থেকে বলা কঠিন। সংসদীয় কমিটি গঠন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যকার বিরোধ কীভাবে ও কতদিনে মীমাংসা হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটায় এই অধিবেশন বসার কথা। তার আগে কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে অধিবেশনের সময়সীমা ঠিক করা হবে। প্রথা অনুযায়ী সরকারি ও বিরোধী দল অধিবেশনের আগেই তাদের কৌশল ও রণনীতি ঠিক করে থাকে।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনটি কেটেছে মূলত র ভাষণের ওপর আলোচনায়। দ্বিতীয় অধিবেশনে বাজেট পাস হয়েছে। ফলে অন্য বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। বিরোধী দলও জোরালোভাবে কোনো প্রস্তাব আনেনি। তাদের অধিকাংশ সদস্য সরকারি দলের ছোড়া তূণ ঠেকাতেই ব্যস্ত ছিলেন। তদুপরি বিরোধী দলে চৌকশ ও অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যের সংখ্যা একেবারে কম।
তৃতীয় অধিবেশনটি এমন সময়ে বসছে, যখন গ্যাস–বিদ্যুতের সংকটে অর্থনীতি ও জনজীবন বিপর্যন্ত, অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক অবস্থার দিকে যাচ্ছে। ফলে সংসদে বিরোধী দলের উত্তাপ ছড়ানোর বহু বিষয় আছে।
কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, সংসদের প্রথম তিন অধিবেশনের মধ্যে ৫০টি সংসদীয় কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দুই অধিবেশন শেষে মাত্র ১৫টি কমিটি গঠন হয়েছে। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়বিষয়ক ৯টি এবং বিষয়ভিত্তিক কমিটি ছয়টি। বাকি ৩৫টি কমিটি এ অধিবেশনেই গঠন করতে হবে।
৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি আছে ৩৯টি। বিষয়ভিত্তিক কমিটি রয়েছে ১১টি। সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি নেওয়া হয়েছে বিরোধী দল থেকে। বাকি কমিটির প্রধান হয়েছে বিএনপি ও তাদের মিত্র দল থেকে। আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে সেখানেও নতুন একজন সভাপতি আসবেন।
জুলাই সনদ অনুযায়ী, ১৪টি স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে বিরোধী দলীয় সদস্যদের দায়িত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু প্রক্রিয়া কী হবে।
নির্বাচনের পর থেকেই গণভোটের রায় নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাব করলেও তারা গ্রহণ করেনি। সরকারি দলের অবস্থান হলো বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটিতে তাদের জন্য খালি রাখা ৫ জনের নাম দিলে বাকি কমিটিগুলো গঠন করা কঠিন হবে না। কিন্তু বিরোধী দল মনে করে, এর মাধ্যমে তাদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে, যাতে সরকারি দলের প্রস্তাবে তারা সায় দেন। এখন পর্যন্ত তাদের অবস্থান হলো, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ছাড়া বিশেষ কমিটিতে নাম দেওয়া হবে না। সেক্ষেত্রে সরকারি দল পুরোনো নিয়মে সংসদীয় কমিটিগুলো গঠন করতে পারে। অথবা কমিটি গঠনের কাজ ঝুলিয়ে রাখতে পারে। পুরোনো পদ্ধতিতে সভাপতি পদে বিরোধী দল থেকে নেওয়া বাধ্যবাধকতা নেই। অতীতের কয়েকটি সংসদে সরকারি দলের মর্জি অনুযায়ী তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধী দল থেকে।
২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের ২৪ নম্বর সুপারিশে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদের বিষয়ে বলা আছে, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদের আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হবে। অর্থাৎ, বিষয়ভিত্তিক চার কমিটি ছাড়াও সংখ্যানুপাতে বিরোধীদের ৯০ সদস্যের বিপরীতে আরও ১০টি সভাপতির পদ বিরোধী দল পাওয়ার কথা। গত দুই অধিবেশনে গঠিত ১৫ স্থায়ী কমিটির মধ্যে সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির একটি পদ দেওয়া হয়েছে বিরোধী দলকে।
সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, তৃতীয় অধিবেশনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের পাশাপাশি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হবে। বিরোধী দল কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উত্থাপন করলে তা নিয়েও আলোচনা হবে।
এদিকে চলমান বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ে বিরোধী সংসদে ও সংসদের বাইরে সরব থাকার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। কার্যপ্রণালি বিধি মেনে নানা ইস্যুতে সংসদে তারা নোটিশ দেবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিল এই অধিবেশনে উঠবে। বিলগুলোর বিষয়ে বিরোধী দল ইতিমধ্যেই তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও মনে করেন, সরকার যেভাবে বিলগুলো মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দিয়েছে, তাতে ভুক্তভোগীরা সুরক্ষা পাবেন না।
গুম প্রতিরোধ আইনের বিষয়ে তাদের আপত্তি হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেটা যদি তাদেরই ফের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে ভুক্তভোগীরা কখনো ন্যায়বিচার পাবেন না। র্যাব বিলুপ্ত আইনকেও তারা মনে করেন, নতুন নামে পুরোনো কাঠামোই রেখে দেওয়া হয়েছে। জনপরিসরেও এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা–সমালোচনা হচ্ছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদে উত্থাপনের জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন ইতিমধ্যে সংসদ সচিবালয়ে জমা হয়েছে।
সংসদীয় পদ্ধতিতে সংসদীয় কমিটিগুলো সংসদের প্রাণ। অধিবেশন কক্ষে সবকিছু নিয়ে চুলচেরা আলোচনা করা যায় না। বিশেষ করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী–আমলাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সংসদীয় কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। এ কারণেই যুক্তরাজ্য ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি নেওয়া হয় বিরোধী দল থেকে। ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হলেও বিরোধী দল থেকে সভাপতি নেওয়া হয়েছে কদাচিৎ। সেক্ষেত্রে ত্রয়োদশ সংসদের জন্য এটি বড় পরীক্ষাও।
বিরোধী দল ইতিমধ্যে জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়নের দাবিতে লং মার্চের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তাহলে কি তারা এই দাবি পূরণে সংসদের চেয়ে রাজপথকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে? বিরোধী দল যেই কর্মসূচি নিক না কেন, সরকারি দলের উচিত হবে সাংবিধানিক বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে একটি মীমাংসায় আসা। সবকিছু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর করলে তার ফল যে ভালো হয় না, তার ভুরি ভুরি প্রমাণ নিকট ইতিহাসে আছে।
লেখক: সম্পাদক, চরচা