বিএনপি সরকারে নীতিনির্ধারণী পদে যোগ দেওয়ার পর থেকেই হুমায়ুন কবির তার আচরণ ও বক্তব্যের জন্য বারবার সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছেন, যা কাজের পরিবেশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই, সংবাদ সম্মেলনে নিজের নাগরিকত্ব নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি (কবির) আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখান। এটি তার দূরদর্শিতা ও গণমাধ্যমের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
হুমায়ুন কবির সরকারের একজন সদস্য এবং তার হাতে একটি সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে, তাই তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত যৌক্তিক। মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের যোগ্যতা, আনুগত্য ও দায়িত্ববোধ যা প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।
সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি উত্তর না দিয়ে, তিনি উল্টো সাংবাদিকদের প্রতি এক ধরনের আক্রমণাত্মক মনোভাব প্রদর্শন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ক্যামেরার সামনে তিনি বলেন, ‘কোন পত্রিকা আমাকে নিয়ে লিখেছে? কার এত জ্বালা যে (আমাকে) কাজ করতে দেবে না? এত জ্বালা কেন তাদের? ২০০৮ সালের বিষয় নিয়ে আবার কার এত জ্বালা শুরু হলো? মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন আমলের জ্বালা কি আবার শুরু হলো? নাকি অন্য কিছু?’
একজন মন্ত্রিসভার সদস্যের কাছ থেকে এমন উত্তর সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত বলে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হয়েছে। এটি নাগরিকত্বের মূল প্রশ্নের কোনো জবাব হতে পারে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মুখোমুখি হওয়ার মনোভাব এমন এক পরিবেশ তৈরি করতে পারে যেখানে সাংবাদিকরা ক্ষমতাবানদের যৌক্তিক প্রশ্ন করতেও কুণ্ঠা বোধ করতে পারেন।
একটি স্বাধীন গণমাধ্যম গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য অপরিহার্য। সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষ করে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়, যে তারা পেশাদারত্বের সঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেবেন, এমনকি প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর বা সমালোচনামূলক হলেও।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ ও সাংবাদিকদের ওপর রাজনৈতিক চাপের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা বিবেচনায় নিলে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যটি আরও বেশি উদ্বেগজনক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাংবাদিকরা সংবেদনশীল প্রশ্ন তুললেই তাদের প্রায়ই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযুক্ত করা হতো। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি এমন এক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল যেখানে ‘সেল্প-সেন্সরশিপ’ একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অথচ এই বিষয়টি খুব সহজেই একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যার মাধ্যমে সমাধান করা যেত।
মঙ্গলবার অন্য এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, হুমায়ুন কবিরের কোনো দ্বৈত নাগরিকত্ব নেই। তিনি বলেন, ‘এটিকে “ডিমিং ক্লজ” বলা হয়। তিনি যখন শপথ নিয়েছিলেন, তখন আমরা সংবিধান অনুযায়ী তা করেছিলাম।’
আইনমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যায় সেই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়, যা হুমায়ুন কবির নিজে সোমবার দিতে পারেননি।
আচরণ নিয়ে বারবার উদ্বেগ
হুমায়ুন কবিরের আচরণ বা বক্তব্য সমালোচিত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। যখন বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে এবং দেশটি প্রধান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইছে, তখন তার আচরণ ও ব্যবহৃত ভাষা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ কর্ম পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
হুমায়ুন কবির বিভিন্ন সময়ে কর্মকর্তাদের সম্পর্কে আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করেছেন, যার মধ্যে কয়েকজনকে ‘একেবারে অযোগ্য’ হিসেবে ব্যাখ্যা করাও অন্তর্ভুক্ত। এই ধরনের মন্তব্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে এবং একটি সংস্থায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
গত মার্চে, হুমায়ুন কবির–তখন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন—যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত তৎকালীন বাংলাদেশের হাইকমিশনারের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, হাইকমিশনার বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং যুক্তরাজ্যে একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষে বিভক্তিমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছেন। এমনকি তার বদলিকে তিনি ‘ভালো খবর’ হিসেবেও বর্ণনা করেছিলেন।
একজন ঊর্ধ্বতন নীতিনির্ধারকের কাছ থেকে দায়িত্বে থাকা একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের এমন প্রকাশ্য সমালোচনা অস্বাভাবিক ও এটি উক্ত কর্মকর্তার মর্যাদা ও বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি উভয়েই ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
পররাষ্ট্র বিষয়ক দায়িত্বে থাকা একজন প্রতিমন্ত্রীর ওপর জনসমক্ষে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পেশাদারত্বের মান বজায় রাখার অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকে। কূটনৈতিক কাজ কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনার ওপর নির্ভর করে না; বরং এতে বিশ্বাসযোগ্যতা, সংযম ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলারও বড় ভূমিকা রয়েছে।
হুমায়ুন কবিরের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেবল একজন রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের মধ্যকার বাগবিতণ্ডা হিসেবে না দেখে, একটি সর্বজনীন আচরণের বিষয় হিসেবে খতিয়ে দেখা উচিত।
নাগরিকত্ব নিয়ে একটি সোজা প্রশ্নের উত্তর সোজাসুজিই দেওয়া উচিত ছিল। তা না করে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য ও রাজনৈতিক কটাক্ষের আশ্রয় নেওয়া সহনশীলতাহীন সংস্কৃতিকেই টিকিয়ে রাখার ঝুঁকি তৈরি করে, যা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়া যেকোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কাম্য।