বাণিজ্যযুদ্ধ এবার পৌঁছে গেল বিদ্যুৎ সরবরাহের হুমকিতে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার পণ্যের উপর নতুন করে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে কানাডার সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ অন্টারিওর প্রধান ডগ ফোর্ড হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রয়োজনে আমেরিকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
ফোর্ডের এই মন্তব্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের সম্পর্কে। তার বক্তব্য, ওয়াশিংটন যদি কানাডার বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক চাপ বাড়াতে থাকে, তবে অটোয়া ও প্রদেশগুলি পাল্টা ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
ট্রাম্পের ৫০ শতাংশ শুল্ক, শুরু নতুন সংঘাত
ঘটনার সূত্রপাত যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি ঘিরে। ট্রাম্প কানাডার ইস্পাত, গাড়ি, ট্রাক ও যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তার অভিযোগ, কানাডা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে অন্যায্য সুবিধা নিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছে কানাডা। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জবাবে কানাডাও পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে কানাডা নতি স্বীকার করবে না।
কানাডা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের উপর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তা ’ডলার-ফর-ডলার’ ভিত্তিতে হতে পারে।
‘বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেব’, ফোর্ডের হুঁশিয়ারি
এই পরিস্থিতিতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন অন্টারিওর মুখ্যমন্ত্রী ডগ ফোর্ড। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কানাডার উপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখে, তবে অন্টারিও বিদ্যুৎ রফতানির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
ফোর্ড বলেন, “সব বিকল্পই টেবিলে রয়েছে।” তার ইঙ্গিত, বিদ্যুৎ ছাড়াও কানাডার গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ সরবরাহ নিয়েও পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, অন্টারিও যুক্তরাষ্ট্রের বহু বাড়ি ও ব্যবসায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। তাই প্রয়োজন হলে এই সরবরাহ বন্ধ করাও কানাডার হাতে একটি বিকল্প অস্ত্র হতে পারে।
বিদ্যুতের উপর কতটা নির্ভরশীল আমেরিকা?
কানাডা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী। বিশেষ করে অন্টারিও, কুইবেক ও অন্যান্য প্রদেশ থেকে নিউইয়র্ক, মিশিগান ও মিনেসোটার মতো সীমান্তবর্তী মার্কিন অঙ্গরাজ্যে বিদ্যুৎ যায়।
অন্টারিও থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ রফতানি শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্কের অংশ নয়, বরং দুই দেশের দীর্ঘদিনের আন্তঃনির্ভরতার প্রতীক। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হলে কানাডার অর্থনীতিতেও ক্ষতি হতে পারে।
ট্রাম্পের পাল্টা বার্তা
কানাডার হুমকির পর ট্রাম্পও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে “নিজেদের অবস্থান ঠিক করার” বার্তা দিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কানাডার পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে ভারসাম্য নেই। তাই নতুন শুল্ক প্রয়োজন।
কিন্তু কানাডার পাল্টা অভিযোগ, এই শুল্ক শুধু বাণিজ্য নয়, দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কেও চাপ তৈরি করছে।
‘অর্থনৈতিক যুদ্ধের’ আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বড় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আদান-প্রদান হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্পর্কের মধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
অন্টারিওর ফোর্ডের হুঁশিয়ারি তাই শুধু একটি প্রাদেশিক নেতার মন্তব্য নয়, বরং কানাডার রাজনৈতিক মহলে বাড়তে থাকা ক্ষোভের প্রতিফলন।
বাণিজ্য নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রশ্নে পৌঁছেছে। একদিকে ট্রাম্পের শুল্ক চাপ, অন্যদিকে কানাডার পাল্টা প্রতিরোধ, দুই প্রতিবেশী মিত্র দেশের সম্পর্ক এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে।