Image description

ছায়া মন্ত্রিসভা- কথাটি উচ্চারিত হচ্ছে সংসদ নির্বাচেনের পর থেকে। এটি বাংলাদেশে নতুন হলেও সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় পুরোনোই। ধারণাটি এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে। ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে সরকার চলে, এমন আরো দেশেও এটি চর্চিত।

গত ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর বিরোধী দলের আসনে বসা জাতীয় নাগিরক পার্টি থেকে প্রথম ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আওয়াজ তোলা হয়। এরপর প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতাও বলেন, তারা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবেন।

তখন ধারণা পাওয়া গিয়েছিল, বিরোধী দল দুটি মিলেই হয়ত ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করবে। কিন্তু এখন জামায়াতকে এককভাবেই এগোতে দেখা যাচ্ছে। দলটির আমির ও সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘তারা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করে ফেলেছেন, অচিরেই তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবেন।’

ছায়া মন্ত্রিসভা কী

ছায়া মন্ত্রিসভা বা ছায়া সরকার এসেছে ব্রিটিশ সংসদীয় রীতি থেকে। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে এর ব্যাখ্যা দেওয়া আছে এভাবে- শ্যাডো কেবিনেট বা ছায়া মন্ত্রিসভা হলো বিরোধীদলীয় নেতার মনোনীত একদল জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র, যারা সরকারের প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করবে। ছায়া মন্ত্রিসভার প্রতি সদস্য একটি নির্দিষ্ট নীতি নিয়ে কাজ করবেন। তিনি ওই বিষয়ে বিরোধী দলের নীতি তুলে ধরবেন, প্রশ্ন করবেন সরকারের নীতিকে। বিরোধী দল এর মধ্য দিয়ে একটি বিকল্প সরকার হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত রাখে।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা বলছিলেন, ‘পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা কোনো নতুন ধারণা নয়; শক্তিশালী নাগরিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে— এমন দেশগুলোয় এটি প্রতিষ্ঠিত চর্চা।’

কোন কোন দেশে আছে

সংসদীয় গণতন্ত্র আছে, এমন অনেক দেশেই আছে ছায়া মন্ত্রিসভা। যুক্তরাজ্য তা বেশ সক্রিয়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, জ্যামাইকা, মালয়েশিয়া, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোসহ আরও কয়েকটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশে বিভিন্ন মাত্রায় ছায়া মন্ত্রিসভার চর্চা রয়েছে।

কী কারণে গঠন

সংসদীয় গণতন্ত্রে ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ মূলত সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বিশ্লেষণ, গঠনমূলক সমালোচনা, সমাধান দেওয়া এবং সংসদে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিতে কাজ করে এই মন্ত্রিসভা।

অধ্যাপক আলী রেজার মতে, ছায়া মন্ত্রিসভা সরকারের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে এবং বিরোধী দলকে গঠনমূলক সমালোচনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেয়।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সরকার বাজেট বা বড় কোনো নীতি প্রস্তাব দিলে সংশ্লিষ্ট ছায়া মন্ত্রীরাও বিকল্প বাজেট বা নীতিপ্রস্তাব জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন। এতে তুলনামূলক আলোচনা তৈরি হবে এবং সরকারও প্রয়োজনীয় বিষয় গ্রহণের সুযোগ পায়।

জামায়াতের ছায়া সরকার কীভাবে কাজ করবে

ছায়া সরকারে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের বিপরীতে একজন করে ছায়া মন্ত্রী থাকেন। তারা মূলত বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা।

সরকারের প্রত্যেক মন্ত্রীর কাজের বিপরীতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একজন করে ছায়া মন্ত্রী নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নজরদারিতে রাখেন। সরকারি নীতি, বাজেট ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করে ভুলত্রুটি জনসমক্ষে তুলে ধরেন তারা। সংসদে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জও করেন।

সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের সুনির্দিষ্ট ও বিকল্প প্রস্তাব বা নীতিমালা উপস্থাপন করেন ছায়া মন্ত্রীরা। এসবের মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের এই নেতারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন। ভবিষ্যতে দল ক্ষমতায় গেলে দেশ পরিচালনায় কাজে আসে এই অভিজ্ঞতা।

শিশির মনির বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন এভাবে- ‘গঠনমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতি রয়েছে, এমন দেশগুলোয় বিরোধী দল সরকার গঠিত মন্ত্রিসভার পাশাপাশি একটি প্যারালাল বা ছায়া মন্ত্রিপরিষদ গঠন করে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, গঠনমূলক সমালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হয়।’

 

 

জামায়াত নেতারা বলছেন, এই ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের মূল লক্ষ্য তিনটি— সরকারের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা, সরকারের ভুল বা দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিকল্প পথ দেখানো এবং ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ নেতৃত্ব ও সম্ভাব্য মন্ত্রী তৈরি করা। অর্থাৎ শুধু বিরোধিতা নয়, সরকার পরিচালনার বিকল্প প্রস্তুতিও এই কাঠামোর অন্যতম উদ্দেশ্য।

জামায়াতের ছায়া মন্ত্রী হচ্ছেন কারা

জামায়াতের ছায়া মন্ত্রিসভার প্রধান দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। এতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান। তথ্য মন্ত্রণালয়ে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

এ ছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, ধর্ম মন্ত্রণালয়ে শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবী রয়েছেন।