ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবার নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে কাজে লাগাতে চায় ব্রিটেন। কিয়েভের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে ইউক্রেনের বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার পেয়েছে লন্ডন। এই তথ্য ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ড্রোন প্রযুক্তি এবং সামরিক নজরদারি ব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনা করছে ব্রিটেন।
তবে একই সময়ে ইউক্রেনকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও সামরিক তথ্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে রাশিয়ার সঙ্গে ব্রিটেনের উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ক্রেমলিনের এক উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনের জন্য ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করা ব্রিটিশ কারখানাগুলি “অজানা উৎসের” হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
২৪ আগস্ট কিয়েভে চুক্তি
ঘটনার সূত্রপাত ২৪ আগস্ট, ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম কিয়েভ সফরে গিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে একটি এআই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটিই ছিল বার্নহ্যামের প্রথম সরকারি বিদেশ সফর।
এই চুক্তির ফলে ব্রিটেন ইউক্রেনের অ্যাভেঞ্জারস এআই ল্যাবস-এর তৈরি যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার পাবে। এই প্ল্যাটফর্মে ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইন থেকে সংগ্রহ করা ড্রোন ফুটেজ, ক্যামেরা, সেন্সর ও অন্যান্য নজরদারি তথ্য রয়েছে।
ইউক্রেনের এই তথ্যভাণ্ডারে প্রায় ৫০ লাখের বেশি যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি ও তথ্য রয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলো এআই ব্যবস্থাকে শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করা, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে প্রশিক্ষণ দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কেন এই তথ্য এত গুরুত্বপূর্ণ?
আধুনিক যুদ্ধে তথ্যই এখন অন্যতম বড় অস্ত্র। ইউক্রেন গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে ড্রোন, সেন্সর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
ব্রিটেন বিশেষ করে ইউক্রেনের অ্যাকোস্টিক সেন্সর তথ্য নিয়ে আগ্রহী। এই প্রযুক্তি শব্দ বিশ্লেষণ করে ড্রোন বা সামরিক গতিবিধি শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা গবেষকেরা মনে করছেন, ইউক্রেনের বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতের এআই-নির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
এই সহযোগিতার অংশ হিসেবে ব্রিটেন ও ইউক্রেন ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থা, কম শক্তি খরচের এআই চিপ এবং সামরিক স্থাপনা রক্ষায় নতুন প্রযুক্তি তৈরির পরিকল্পনাও করছে।
রাশিয়ার নতুন হুঁশিয়ারি
অন্যদিকে, ইউক্রেনকে সামরিক প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মস্কো।
ক্রেমলিনের প্রাক্তন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপদেষ্টা আন্দ্রেই ফেদোরভ সতর্ক করেছেন, ইউক্রেনের জন্য ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তি উৎপাদনকারী ব্রিটিশ কারখানাগুলো ’অজানা উৎসের’ হামলার ঝুঁকিতে থাকতে পারে। তিনি বলেন, ব্রিটেনের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের ’আধা-সামরিক’ পদক্ষেপের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এর আগে রাশিয়া ব্রিটেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল, ইউক্রেনকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি দিয়ে লন্ডন সংঘাতে আরও গভীর ভাবে জড়িয়ে পড়ছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছিলেন, এই ধরনের পদক্ষেপ যুদ্ধের “আগুনে ঘি ঢালছে”।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ও যুদ্ধ-ডেটা: একসঙ্গে নতুন অধ্যায়
বার্নহ্যামের কিয়েভ সফরে শুধু এআই সহযোগিতাই নয়, ইউক্রেনের নিজস্ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও ব্রিটেন সহায়তার ঘোষণা দেয়।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা সংস্থা এমবিডিএ-র মাধ্যমে ব্রিটিশ প্রযুক্তি ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইউক্রেনের সঙ্গে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের পথ তৈরি হতে পারে।
রাশিয়া বলছে, এতে সংঘাত আরও বাড়বে। অন্য দিকে ব্রিটেনের দাবি, ইউক্রেনকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।
যুদ্ধের নতুন ময়দান: তথ্য ও প্রযুক্তি
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন শুধু কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও সেনার লড়াই নয়। এটি তথ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার লড়াইও।
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এখন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে একটি মূল্যবান গবেষণার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ব্রিটেন সেই অভিজ্ঞতাকে নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কাজে লাগাতে চাইছে। কিন্তু এর ফলে রাশিয়া ও ব্রিটেনের উত্তেজনাও নতুন মাত্রা পাচ্ছে।
এক দিকে ইউক্রেনের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা থেকে প্রযুক্তিগত সুবিধা নিতে চাইছে ব্রিটেন, অন্য দিকে মস্কো দিচ্ছে পাল্টা হুঁশিয়ারি। ক্ষেপণাস্ত্র থেকে এআই, ইউক্রেন যুদ্ধ এখন পরিণত হয়েছে ভবিষ্যতের সামরিক প্রযুক্তির পরীক্ষাগারেও।