Image description

জিন্না তালুকদারের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি; ছয় মাস ধরে ভুগছেন খাদ্যনালীর ক্যান্সারে।

এর আগে দুবার কেমোথেরাপি নিয়েছেন; তৃতীয় কেমোথেরাপি নিতে শনিবার আসেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে।

কিন্তু হাসপাতালে জায়গা হয়নি তাঁর। ফলে শনিবার রাতে শুয়ে ছিলেন হাসপাতালের পাশের একটি মাঠে।

শুধু জিন্না তালুকদার নন, হাসপাতালের ‘বি’ ও ‘সি’ ব্লকের মাঝের জায়গায় এবং বক্ষব্যাধি হাসপাতালের মাঠজুড়ে শতাধিক রোগী-স্বজনকে রাতযাপন করতে দেখা গেছে।

ফরিদপুর থেকে আসা জিন্না বলেন, ‘‘আমার তৃতীয় কেমোথেরাপি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিতে নিতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, তাই আর বাড়ির দিকে যাওয়ার চিন্তা করিনি। রাতে শহরে নেমে গ্রামে যাওয়ার গাড়ি পাই না। কাল সকাল হলে বাড়ির বাসে উঠব।”

শনিবার রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় ছোট ছোট বিছানা পেতে শুয়ে-বসে আছেন রোগী ও স্বজনরা।

তারা বলেছেন, জেলা সদর হাসপাতালে ক্যান্সারের ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে ঢাকায় আসতে হয়। কিন্তু এই হাসপাতাল এবং আশপাশে কারও জন্য সেভাবে বসার জায়গাও নেই।

তাদের মতে, হাসপাতালের পাশে অল্প টাকায় থাকার ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো।

জিন্না তালুকদারের স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, ‘‘আমরা শুক্রবার বিকালে এসেছি। তারপর থেকে বসেই আছি। এখানে সারাদিন এবং রাতে বসে থাকা যায় না; ভয় লাগে, কখন জানি বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়।

“খুব সকালে উঠে টিকেট কেটে কেমোথেরাপির টাকা জমা দিতে হয়। সেটার রশিদ নিয়ে কেমোথেরাপি নিতে হয়। এখানে থেরাপির খরচ অনেক কম। তাই বাধ্য হয়ে মাঠেই অপেক্ষা করি। আমাদের সামর্থ্য নেই যে বাইরে বা অন্য কোনো হাসপাতাল থেকে এই থেরাপি নেব।”

 

রাত কাটে নানা ভয়ে

মহাখালীতে অবস্থিত ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালটি ৫০০ শয্যার। এখানে প্রতিদিন ২ হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন বলে হাসপাতালের পরিচালকের ভাষ্য।

চিকিৎসা নিতে আসা এসব রোগী-স্বজনদের অনেককেই একটা লম্বা সময় কাটাতে হয় আশপাশে শুয়ে-বসে।

বিশেষায়িত হাসপাতাল হওয়ায় দেশের সব প্রান্ত থেকেই সেবা নিতে আসেন রোগীরা। বাড়ি থেকে দূরত্ব এবং সেবা পেতে কখনো কখনো একাধিক রাত বাইরে কাটাতে হয় তাঁদের।

খুলনার কয়রা থেকে আসা মাইন উদ্দিন বলেন, ‘‘আমার স্ত্রীর ফুসফুসে ক্যান্সার। গত এক বছর ধরে চিকিৎসা চালানোর পর আমাদের আর তেমন টাকা-পয়সা নেই।

“বিভিন্ন জায়গায় দৌড়াদৌড়ির পর জুলাই মাস থেকে এখানে কেমোথেরাপি নিচ্ছি। খুব সকালে লাইন ধরে টিকেট কেটে থেরাপি নিতে হয়। কিন্তু এর চেয়ে বেশি কষ্ট হলো, এখানে রাতে থাকার বিষয়। বাইরে থেকে আসি, চিকিৎসা খরচসহ কিছু টাকা থাকে। ব্যাগ পাশে নিয়ে রাতে ঘুম আসে না। মনে হয়, টাকা হারিয়ে গেলে চিকিৎসা নেব কীভাবে?”

ক্যান্সার আক্রান্ত লিটন নড়াইল জেলা থেকে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি আগে চার্জার গাড়ি চালাতাম। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর সেটি বিক্রি করে প্রথম চিকিৎসা নেওয়া শুরু করি। এখানে অল্প টাকা নিয়ে আসি। কিন্তু সেটা রেখে যে ঘুমাব, সেটা আর হয় না। তাই সঙ্গে থাকা স্ত্রী কিছুক্ষণ ঘুমায়, তখন আমি জেগে থাকি। আবার আমি ঘুমালে স্ত্রী জেগে থাকে।”

তিনি বলেন, ‘‘দুজন ভাগাভাগি করে কোনো রকম রাত কাটাই। কিন্তু বেশি ভয় লাগে বৃষ্টির জন্য। বৃষ্টি শুরু হলে মাঠের সবাই সিঁড়ির নিচে চলে আসে। তখন আর শুয়ে থাকার মতো জায়গা থাকে না। কারণ অনেক মানুষ এসে পড়ে।”

২ মাসও চলে যায় রেডিওথেরাপির অপেক্ষায়

রেডিওথেরাপির জন্য জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা হাসপাতালে ছয়টি মেশিন ছিল। বর্তমানে দুটি সচল রয়েছে। এ কারণে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

আজিজুল হক নামে একজন বলেন, ‘‘আমার বড় ভাইয়ের ক্যান্সার হয়েছে। ডাক্তাররা রেডিওথেরাপির পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু মে মাস থেকে ঘুরে ঘুরে সিরিয়াল পেয়েছি।”

তিনি বলেন, “সিরিয়াল যেন আগে নিতে পারি, সেজন্য শনিবার বিকালেই চলে আসছি ভাইকে নিয়ে। রাতে কষ্ট করে বাইরে বসে সময় কাটাচ্ছি। সকাল হলে টিকেট কেটে থেরাপি নেওয়া হবে।”

রোগী-স্বজনদের এমন ভোগান্তির বিষয়ে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক মোস্তফা আজিজ সুমন বলেন, “সত্যি বলতে কী, বর্তমানে মেশিন সংকট থাকার ফলে আমরা রোগীদের চাহিদামতো সেবা দিতে পারছি না।

“বর্তমানে আমাদের দুটো সচল মেশিন দিয়ে জরুরি রোগীদের সেবা দিচ্ছি। এই মুহূর্তে অপেক্ষমাণ ৭ হাজারের বেশি রোগী রয়েছে। তাদের জন্য সিরিয়াল দেওয়া খুবই কঠিন হচ্ছে। যার ফলে স্বাভাবিকভাবেই রোগীরা অন্তত ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর সিরিয়াল পাচ্ছেন।’’

রোগী ও স্বজনদের খোলা মাঠে রাত কাটানোর বিষয়ে তিনি বলেন, “আসলে আমাদের দেশের যে ব্যবস্থা, তাতে রোগীর স্বজনদের থাকার ব্যবস্থা নেই। আর এখানে একজন রোগীর সঙ্গে কয়েকজন করে আসেন; তাঁদের থাকার ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব নয়।’’

তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, ‘‘আমরা সকালের টিকেট কাউন্টারগুলো মূল সড়কের পাশে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছি। সেখানে নতুন শেড করে টিকেট কাউন্টার চালু করা হবে। তখন সেখানে হয়তো কিছু রোগী ও স্বজন রাতে থাকতে পারবেন।”