Image description

সার সংকট সারা দেশে। নিয়োগ হচ্ছে নতুন ডিলার। এর সঙ্গে নতুন বিতরণ নীতিমালা। এ দুই নতুনে ভর করেছে ডিলারদের রাজনীতি আর ভীতি। এতে সারের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সরকার পর্যাপ্ত মজুদের কথা বললেও অনেক কৃষক নির্ধারিত দামে ডিলারের কাছে প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সৃষ্টি হচ্ছে সংকটের পরিস্থিতি, ঘটেছে লুটের ঘটনা।

সরকারি ডিলারের কাছে সার না থাকার কথা বলা হলেও পাশের খোলাবাজার বা খুচরা দোকানে বেশি দামে তা পাওয়া যাচ্ছে। মাগুরার বালিদিয়া ইউনিয়নের অনুমোদিত ডিলার মিলন ঘোষ ইউরিয়া সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার কথা জানালেও নন-ইউরিয়া— বিশেষ করে ডিএপি (ফসফেট) সারে সাময়িক টানাপড়েনের কথা স্বীকার করেছেন। তবে একই এলাকার এক সাব-ডিলারের দাবি, ২০০ বস্তা ডিএপি সারের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ মিলেছে ১৭ বস্তা এবং সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ১০ বস্তা। বরাদ্দ কম থাকার মধ্যেও সার রাতের আঁধারে কালোবাজারে চলে যাওয়ার অভিযোগ তার।

নেত্রকোনার বারহাট্টার কৃষক মোফাজ্জল হোসেন খোকন জানিয়েছেন, নির্ধারিত দামে ডিএপি সার না পেয়ে গোপালপুর বাজার থেকে প্রতি বস্তা টিএসপি (পটাশ) ১ হাজার ৫০০ এবং এমওপি (পটাশ) ১ হাজার টাকা দরে কিনতে হয়েছে। ওই সারের বস্তায় ‘খোলাবাজারে বিক্রির জন্য নয়’ লেখা ছিল। মেহেরপুরের ভাটপাড়া গ্রামের কৃষক মজনুর রহমানের অভিযোগ, ডিলারের কাছে সার না থাকলেও বাইরের দোকানে বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দিলে চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে। তবে মেহেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা জেলায় সারের কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছেন।

কৃষকের জন্য সংকটের বিষয়টি শুধু সার না পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্ধারিত মূল্যে সার না পেয়ে বেশি দামে কিনতে হলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে আমন মৌসুমে সারের প্রয়োজনীয়তা থাকায় সময়মতো সার না পাওয়া কৃষকের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে সরকারি গুদাম বা ডিলার পর্যায়ে মজুদ থাকার তথ্যের পাশাপাশি কৃষকের হাতে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও সরবরাহব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সূচক— এমনটাই বিশ্লেষণ কৃষি অর্থনীতিবিদদের।

সার বিতরণব্যবস্থায় এ অস্থিরতার পেছনে বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে নতুন ডিলার নিয়োগ নীতিমালা। ২০২৫ সালের সমন্বিত নীতিমালায় সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা রহিত করার সিদ্ধান্ত হয়। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে সার বিতরণে যুক্ত থাকা বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ীর ভূমিকা বদলে যায়। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে প্রায় ১০ হাজার ৮০০ ডিলারের পাশাপাশি প্রায় ৪৫ হাজার খুচরা বিক্রেতা ছিল। নতুন ব্যবস্থায় তারা আগের ভূমিকায় থাকতে পারছেন না।

গত ৯ আগস্ট সংশোধিত নীতিমালা বাস্তবায়নে অফিস আদেশ জারির পর এ পরিবর্তন আরও দৃশ্যমান হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় সার বিতরণের দায়িত্ব ও কাঠামো পুনর্বিন্যাসের ফলে অনেক এলাকায় পুরনো ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ডিলারশিপ থাকবে কি না, ভবিষ্যতে বরাদ্দ কীভাবে হবে এবং নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসার সুযোগ কতটা থাকবে— এসব প্রশ্নও মাঠপর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের বিতরণ কাঠামো বদলের এ সময়ে মাঠপর্যায়ে এক ধরনের অস্থায়ী শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এর সুযোগ নিয়ে পুরনো ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে— এমন অভিযোগ রয়েছে। আবার কোথাও বরাদ্দ ও সরবরাহের বাস্তব ঘাটতিও আছে। ফলে পুরো পরিস্থিতিকে শুধু কৃত্রিম সংকট কিংবা শুধু সরবরাহ ঘাটতি— একটিমাত্র কারণে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কোথায় কত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং তার কতটা কৃষকের কাছে বিক্রি হয়েছে, তা যাচাই করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি হিসাব অবশ্য জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের ঘাটতির চিত্র দেখাচ্ছে না। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আমন মৌসুমে চার ধরনের প্রধান সারের মোট চাহিদা প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টন। সারা বছরের মোট চাহিদা ৬৭ দশমিক ৭০ লাখ টন। মৌসুমের শুরুতে ইউরিয়ার প্রারম্ভিক মজুদ ছিল ৬ দশমিক ১৪২ লাখ টন, ডিএপি ৪ দশমিক ৫৮৮ লাখ, টিএসপি ৪ দশমিক ০৯৫ লাখ এবং এমওপি ২ দশমিক ৮৪৯ লাখ টন। চার ধরনের সারের সম্মিলিত প্রারম্ভিক মজুদ গত ১৯ আগস্ট ছিল ১৭ দশমিক ৬৭৪ লাখ টন।

ফলে প্রারম্ভিক মজুদের পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদন ও নিয়মিত আমদানির চালান সচল থাকলে জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের সারের ঘাটতি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এ হিসাবের সঙ্গে মাঠের বাস্তবতার পার্থক্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। এর মূল কারণ হচ্ছে, দেশের সার কারখানাগুলোর উৎপাদন কমে গেছে। দেশের ছয়টি সার কারখানায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৩ কোটি ঘনফুট। সেখানে এখন গড়ে ১৫-১৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ঘাটতির কারণে তিনটি কারখানা বন্ধ রয়েছে। বাকি তিনটি কারখানায় চাহিদামতো গ্যাস সরবরাহ না করায় কমেছে সার উৎপাদন।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন দেশে সামগ্রিকভাবে সারের ঘাটতি নেই বলে জানিয়েছেন। তবে কৃষকদের বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিলারদের সাময়িক বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার আশঙ্কা, কোনো চক্র ব্যক্তিস্বার্থে বা সরকারকে প্রশাসনিকভাবে বেকায়দায় ফেলতে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে। তিনি প্রতিটি ইউনিয়নে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের সরাসরি নজরদারি এবং জেলা প্রশাসনের কঠোর মনিটরিংয়ের পরামর্শ দিয়েছেন। সারের কৃত্রিম সংকট রুখতে নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করার জন্য জেলা কমিটিগুলোকে কঠোর নির্দেশ দেওয়ার কথাও আগামীর সময়কে জানিয়েছেন তিনি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কৃষি মন্ত্রণালয়ও তদারকি বাড়িয়েছে। কৃষি সচিব সেলিম খান আগামীর সময়কে বলেছেন, দেশে বাস্তব সংকট না থাকলেও কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুই যুগ্ম সচিব ও তিন উপসচিবের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। তারা দৈনিক ভিত্তিতে সার সরবরাহ ও বিক্রয় কেন্দ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজও করা হয়েছে।

আঞ্চলিক সংকট এড়াতে ২৫ আগস্ট থেকেই ডিলারদের সেপ্টেম্বরের বরাদ্দের সার আগাম উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিগুলোকে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে গঠিত এসব কমিটিকে ডিলারদের সরবরাহ, বিক্রয় ও মজুদ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। টাকা জমা দেওয়ার পরও যারা সময়মতো সার উত্তোলন করছেন না, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

বাজারে না পাওয়ার আশঙ্কায় কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে এক ডিলারের গুদাম ঘরের দরজা ভেঙে ২২৫ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে গেছেন কৃষকরা। এদিকে বগুড়ায় সার নিয়ে চলছে তেলেসমাতি। মেহেরপুরের গাংনীতে ডিলারদের কারসাজি, কালোবাজারি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কৃত্রিম সার সংকট দেখা দিয়েছে। যশোরের চৌগাছায় সার নিয়ে বেপরোয়া কারসাজিতে মেতেছেন অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলারদের সিন্ডিকেট। এমন উদাহরণ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

কৃষি সচিবের দাবি, ডিলারের গুদাম থেকে কৃষকদের সার নিয়ে যাওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাতেও গুদামে সার ছিল; ঘাটতি ছিল না। তার মতে, সেখানে কৃত্রিমভাবে সমস্যা তৈরি করা হয়েছিল। সরকারি পদক্ষেপের ফলে এক সপ্তাহের মধ্যেই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন তিনি।

তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, জাতীয় পর্যায়ে মজুদ থাকলেই কৃষকের জন্য সংকটমুক্ত বাজার নিশ্চিত হচ্ছে না। নতুন নীতিমালায় পুরনো বিতরণ কাঠামো বদলে যাওয়ার পর কোথাও বরাদ্দ কম, কোথাও সরবরাহে ঘাটতি, আবার কোথাও সরকারি দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিলেই সার পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— ডিলারশিপ হারানোর ভয়, পুরনো বিতরণ কাঠামো ভেঙে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার টানাপড়েনই কি সৃষ্টি করছে এ সংকট?

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকলে কৃষক কেন বিক্ষোভ করছেন? ডিলারের গুদাম থেকে লুট করছেন? এখানে বড় সমস্যা ব্যবস্থাপনায়। কৃষি মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের যৌথ ব্যবস্থাপনায় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সরবরাহ থাকলে সমস্যা হয় না। ডিলার চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। সংকটের কারণেই লুট হচ্ছে, দামও বেড়ে যাচ্ছে। এসব কারণে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আউশ ধান মার খেয়েছে। এর আগে বোরো ধান নষ্ট হয়েছে। আবার আমন যদি উৎপাদন কম হয়, খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে। শীতকালীন সবজির উৎপাদন ব্যাহত হবে। সার সরবরাহ স্বাভাবিক না করা গেলে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন বিঘ্নিত হবে।’