নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কংশনগর গ্রামের পাইকার বাড়িতে গিয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের দেখা মেলে। গণমাধ্যমকর্মীদের দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন ৬৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ উল্লাহ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বারবার বলতে থাকেন, ‘আমার বাবা আর নেই! বাবারে বাবা...।’
বাড়ির কিছুটা সামনে এগোতেই দেখা যায়, বড় বোন নাঈমার সঙ্গে মায়ের পাশে বসে আছে আড়াই বছরের ছোট্ট রাইসা। অবুঝ এই শিশুটি কোনোদিন বাবাকে দেখেনি, পায়নি বাবার স্নেহ-ভালোবাসা। হয়তো এখনো সে জানেই না, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।
পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও উন্নত জীবনের আশায় স্ত্রীকে গর্ভবতী রেখে সুদূর প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার কংশনগর গ্রামের মো. ইউসুফ রাজু। স্বপ্ন ছিল পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন, সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। তার মৃত্যুতে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
জরাজীর্ণ ঘরে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার লক্ষ্যে নিজের সব সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে, প্রায় ৪৩ লাখ টাকা খরচ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ঘাতকের বুলেটে মাত্র ৪২ বছর বয়সেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হলো তাকে। নিহত রাজুর বাবা-মা, স্ত্রী ও স্বজনদের দাবি— এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক এবং সরকারি উদ্যোগে মরদেহ যেন দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
রাজুর অকালমৃত্যুতে পুরো বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, স্বপ্নের দেশ আমেরিকায় গিয়েছিলেন ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে। কিন্তু এক নিমেষেই ঘাতকের গুলিতে সব শেষ হয়ে গেল। স্বজন ও এলাকাবাসী একযোগে দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের কাছে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
রাজুর ছোট ভাই আপন বলেন, ‘আমরা তিন ভাই। বড় ভাই ইতালিতে থাকেন, আর মেজো ভাই জমিজমা বিক্রি করে আমাদের স্বপ্নের কথা ভেবে আমেরিকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সবকিছু গুছিয়ে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তের গুলিতে উনার জীবন প্রদীপ নিভে গেল। আমার বাবা-মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন, তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে ভাইয়া আর দুনিয়াতে নেই।’
গত শনিবার রাতে নিউইয়র্ক শহরের ব্রুকলিনে কর্মস্থলে দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হন সোনাইমুড়ীর মো. ইউসুফ রাজু। এ ঘটনায় তার এক বাংলাদেশি সহকর্মীও আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ব্রুকলিনের ব্রাউনসভিল এলাকার ‘আমেরিকান বেস্ট উইংস অ্যান্ড পিজ্জা’ নামের একটি দোকানে এ ঘটনা ঘটে।
কংশনগর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ উল্লার তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে রাজু ছিলেন দ্বিতীয়। জীবনের স্বপ্ন পূরণে ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সে সময় তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন। ইচ্ছা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করে দেশে ফিরবেন এবং পরে স্ত্রী-সন্তানদেরও সাথে নিয়ে যাবেন। কিন্তু বন্দুকধারীর গুলিতে সেই স্বপ্নের করুণ সমাপ্তি ঘটল।
স্বজনদের ভাষ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার পর কাজ করার বৈধ কাগজপত্রও পেয়েছিলেন রাজু। তিনি ১২ বছর ও আড়াই বছর বয়সী দুই কন্যাসন্তানের বাবা। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর তার ছোট মেয়ে রাইসার জন্ম হয়, যাকে সরাসরি দেখার সুযোগ আর হলো না তার।