Image description

দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে জাল সনদ ও সুপারিশপত্র ব্যবহার, প্যাটার্নবহির্ভূত নিয়োগ, মৃত শিক্ষকের ব্যাংক হিসাব ও এমপিও ইনডেক্স নম্বর ব্যবহার করে বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং মহাপরিচালকের প্রতিনিধির নামে জাল চিঠি ও স্বাক্ষর ব্যবহারের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিও ইনডেক্স কর্তন, বেতন-ভাতা স্থগিত এবং অবৈধভাবে উত্তোলন করা অর্থ ফেরতের নির্দেশ দিচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর।

সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, ফরিদপুরের ভাঙ্গার ইকরামউদ্দীন মডেল কামিল মাদ্রাসার ফাজিল ও কামিল স্তরে প্যাটার্নবহির্ভূতভাবে নিয়োগ পাওয়া ১৯ শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও ইনডেক্স কর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিধিবহির্ভূতভাবে উত্তোলন করা ১ কোটি ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই মাদ্রাসার ১৯ শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও বাতিল

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ইকরামউদ্দীন মডেল কামিল মাদ্রাসার ফাজিল ও কামিল স্তরে প্যাটার্নবহির্ভূতভাবে নিয়োগ পাওয়া ১৯ শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও ইনডেক্স কর্তন করেছে সরকার। একই সঙ্গে বিধিবহির্ভূতভাবে উত্তোলন করা ১ কোটি ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতরের ৩ আগস্টের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, ১৬ জুনের এমপিও পুনর্বিবেচনা কমিটির সিদ্ধান্তের পর ১৮ জুলাই অনুষ্ঠিত এমপিও বাছাই ও অনুমোদন কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

 

সংশ্লিষ্টদের এক মাসের মধ্যে অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে ট্রেজারি চালানের কপি অধিদফতরে দাখিল করতে বলা হয়েছে। ব্যর্থ হলে ১৯১৩ সালের পাবলিক ডিমান্ডস রিকভারি আইন বা পিডিআর আইনে মামলা করার কথা জানানো হয়েছে।

১৯ জনের মধ্যে ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক মো. ফারুক হোসেনের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪১ টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে। বাংলা বিষয়ের প্রভাষক মো. কুদরাত-ই রহমান ও ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ফজলুল ইসলামের কাছে ১৮ লাখ ১ হাজার ১৩২ টাকা করে এবং আরবি প্রভাষক মো. রাশেদুল ইসলামের কাছে ১০ লাখ ৬০ হাজার ৩৩২ টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে।

আরবি প্রভাষক মো. আল আমিন ও প্রভাষক (গ্রন্থাগারিক) মো. সরোয়ার হোসেনের কাছে ৭ লাখ ৫১ হাজার ২৪২ টাকা করে; প্রভাষক (ফকিহ) মো. আজিজুল হক, জাহিদ হোসেন ও প্রভাষক মো. মহিবুর রহমানের কাছে ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৩৭০ টাকা করে এবং সহকারী মৌলভী মো. নুরনবীর কাছে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৭০২ টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে।

অন্যদের মধ্যে সহকারী গ্রন্থাগারিক মহিউদ্দিনের কাছে ৪ লাখ ৭৭ হাজার ৩৯৫ টাকা, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর কাজী আল মাসুদের কাছে ৪ লাখ ৮১ হাজার ৯৮৩ টাকা, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. মাসুম বিল্লাহ ও হাবীব গাজীর কাছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার ১৭৫ টাকা করে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. নাজমুল ইসলামের কাছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৪০৭ টাকা, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. সাইফুল ইসলামের কাছে ৩ লাখ ২৮ হাজার ২১৫ টাকা, ল্যাব সহকারী মো. রেজাউল মিয়া ও সাম্মি আক্তারের কাছে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৯১১ টাকা করে এবং জুনিয়র শিক্ষক নাজরিনের কাছে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫৩ টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে।

জাল সনদে এমপিও, ৯ শিক্ষকের ইনডেক্স কর্তন

জাল ও ভুয়া শিক্ষক নিবন্ধন সনদ এবং সুপারিশপত্র ব্যবহার করে এমপিওভুক্ত হওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসার ৯ শিক্ষকের ইনডেক্স কর্তন করা হয়েছে।

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) যাচাইয়ে তাদের সনদ ও সুপারিশপত্র জাল ও ভুয়া প্রমাণিত হয়। ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৬’ অনুযায়ী তাদের মে ২০২৬ মাসের এমপিওশিট থেকে ইনডেক্স কর্তন করা হয়েছে।

তালিকায় রয়েছেন সিরাজগঞ্জের গোলকপুর সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসার মো. নুরুজ্জামান, রংপুরের তারাগঞ্জ ওয়াক্ফ এস্টেট কামিল মাদ্রাসার মো. মাহবুব রশিদ, পিরোজপুরের বাটাজোড় আলিম মাদ্রাসার মো. আব্দুর রহমান, কুড়িগ্রামের নেওয়াশী ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার মো. মাসুম বিল্লাহ ও মো. হারুনুর রশিদ।

এ ছাড়া বাগেরহাটের মল্লিকেরবেড় ফাজিল মাদ্রাসার করিমা খাতুন, সাতক্ষীরার পাতাখালি ফাজিল মাদ্রাসার বিশ্বজিৎ সমদ্দার, কুমিল্লার পাঁচুখুরী আহমদিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শহীদুল হক এবং গাজীপুরের বেলাশী মদিনাতুল উলুম বালিকা আলিম মাদ্রাসার মো. রোকনুজ্জামানের ইনডেক্স কর্তন করা হয়েছে।

মৃত শিক্ষকের ব্যাংক হিসাব ও ইনডেক্সে বেতন উত্তোলন

ভোলার তজুমদ্দিনের মো. ভেলা ওমরিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মো. মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে মৃত এক শিক্ষকের ব্যাংক হিসাব ও এমপিও ইনডেক্স নম্বর ব্যবহার করে দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর গত ২ আগস্ট তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। তার ইনডেক্স নম্বর বি-৬০২৭৮২। নোটিশে নিয়োগ-সংক্রান্ত সব মূল কাগজপত্র ও প্রমাণাদিসহ তিন কর্মদিবসের মধ্যে স্বশরীরে হাজির হয়ে লিখিত ও মৌখিক ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। ব্যাখ্যা না দিলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

মহাপরিচালকের প্রতিনিধির নামে জাল চিঠি

ভোলার চরফ্যাশনের ঢালচর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসায় মহাপরিচালকের প্রতিনিধির নামে জাল চিঠি তৈরি, ভুয়া নিয়োগ বোর্ড গঠন এবং প্রতিনিধির স্বাক্ষর জাল করে একজনকে নতুন এমপিওভুক্তির আবেদন পাঠানোর ঘটনা শনাক্ত করেছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর।

এ ঘটনায় মাদ্রাসাটির সুপার মো. আমির হোসেনের বেতন-ভাতা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কেন তার এমপিও স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

অধিদফতরের নোটিশ অনুযায়ী, ল্যাব সহকারী পদে মো. আব্দুর রাজ্জাকের এমপিও আবেদনের সঙ্গে মহাপরিচালকের প্রতিনিধির নামে জাল চিঠি, জাল ফলাফল বিবরণী ও জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়। যাচাই-বাছাই কমিটি এসব শনাক্ত করে আবেদনটি বাতিলের সুপারিশ করে।

সুপার মো. আমির হোসেনকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে বা নির্ধারিত সময়ে জবাব না দিলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে অধিদফতর।

গাইবান্ধায় জাল চিঠি-স্বাক্ষরে এমপিও আবেদন, সুপারকে শোকজ

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গা সরকারপাড়া আল-হিকমাহ মসজিদ একাডেমি দাখিল মাদ্রাসায় মহাপরিচালকের প্রতিনিধির নামে জাল চিঠি ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে একজনকে এমপিওভুক্তির আবেদন পাঠানোর ঘটনা শনাক্ত করেছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর।

এ ঘটনায় মাদ্রাসার সুপার আবুশাহাদাত মো. জাহাঙ্গীর আলমের এমপিও সাময়িক স্থগিতসহ কেন স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

অধিদফতরের নোটিশে বলা হয়, ল্যাব সহকারী পদে মো. সুমন মিয়ার নতুন এমপিও আবেদনে জাল চিঠি, ভুয়া নিয়োগ বোর্ড ও জাল স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়। যাচাই-বাছাই কমিটি এসব শনাক্ত করে সুমনের আবেদন বাতিলের সুপারিশ করে। সুপারকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।

জাল এনটিআরসিএ সনদ, কিশোরগঞ্জের শিক্ষকের ইনডেক্স বাতিল

কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার মিরদী ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক (আরবি) আমিরুন্নেসার এনটিআরসিএ সনদ জাল ও ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় তার এমপিও ইনডেক্স কর্তন করেছে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর।

অধিদফতরের নথি অনুযায়ী, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত ও এনটিআরসিএর প্রতিবেদন পর্যালোচনায় তার পঞ্চম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা-২০০৯-এর প্রত্যয়নপত্রটি সঠিক নয় বলে প্রমাণিত হয়। এ কারণে তার ইনডেক্স কর্তন করা হয়েছে।

একই সঙ্গে এমপিওভুক্ত হওয়ার পর থেকে উত্তোলন করা বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

থামছে না কেন

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, মাদ্রাসায় এমপিও ব্যবস্থাপনায় এখনও দুর্বলতা রয়েছে। নিয়োগের সময় যাচাই-বাছাইয়ের ঘাটতি, জাল কাগজপত্র শনাক্তে ব্যর্থতা এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অনিয়মের সুযোগ থাকায় সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এমপিও বাতিল ও অর্থ ফেরতের নির্দেশের পাশাপাশি যেসব ক্ষেত্রে জালিয়াতি বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হচ্ছে, সেসব ঘটনায় কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির পুরো প্রক্রিয়ায় কঠোর যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একই সঙ্গে মাদ্রাসার পাশাপাশি দেশের সব বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা না করে নিয়োগ হয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়। এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা হয় না। যারা সুবিধাভোগী, তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের পর যেনতেনভাবে যাচাই-বাছাই ছাড়াই এমপিওভুক্ত করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, পাঠদান অনুমোদন এবং এমপিওভুক্তিতে কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করা উচিত। জনগণের ট্যাক্সের টাকা এভাবে নষ্ট করার অধিকার কারও নেই। সবচেয়ে দুঃখ লাগে, ধর্মীয় ছাতার নিচের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এসব কর্মকাণ্ড হয়।”

‘অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে’

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতরের উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. শামিউল ইসলাম প্রামাণিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। লোকবল কম থাকায় দেশের সব মাদ্রাসা রাতারাতি যাচাই-বাছাই করা সম্ভব নয়। তবে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই বা সংশয় থাকলে তা যাচাই-বাছাই করে সরকারি বিধিবিধান অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেক শিক্ষকের কাছ থেকে টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে।

আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের যা এখতিয়ার, সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”