মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ফের সিন্ডিকেটের অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। শনিবার (২২ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ অভিযোগ তুলেন।
পোস্টে হাসনাত আব্দুল্লাহ লেখেন, মালেশিয়ার সিন্ডিকেট কুশীলব আমিন নূরের সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গোপন বৈঠক। এই খবরটি বাংলাদেশি মিডিয়া ডিলিট করে দিলেও, ব্লুমবার্গ রেখে দিয়েছে। নিউজ লিঙ্ক কমেন্টে সংযুক্ত। সিন্ডিকেটের কারণে এখন শ্রমিক যেতে খরচ হতে পারে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সিন্ডিকেট নিয়ে কত কিছুই না হয়েছে! সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, সংবাদ হয়েছে, সভা হয়েছে, তদন্ত ও রিপোর্ট হয়েছে। অথচ শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, সেই একই সিন্ডিকেট এবারও রি-এন্ট্রি পেয়েছে।
পোস্টে তিনি লেখেন, আগে আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রীর মালিকানাধীন রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সরাসরি সিন্ডিকেটে ছিল। এবার হয়তো এমপি-মন্ত্রীর প্রতিষ্ঠান সরাসরি ঢোকানো হয়নি; কিন্তু তাদের ডামি বা প্রক্সি প্রতিষ্ঠান ঢোকানো হয়েছে— এমন অভিযোগ উঠছে। যেমন, যুবদলের এক সহ-সভাপতির স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান সুযোগ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের ‘আত্মীয়’ হিসেবে পরিচিত রায়হান কবিরের প্রতিষ্ঠানও তালিকায় এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল হাইয়ের স্ত্রীর নামে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানও সুযোগ পেয়েছে। অর্থাৎ, সরাসরি না হলেও পরিচিত রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সামনে রেখে একই স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা হচ্ছে কি না— সেই প্রশ্ন উঠছে।
এতে তিনি লেখেন, সিন্ডিকেটবিরোধী আন্দোলনকারী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ১৯ মে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে তাদের সংবাদ সম্মেলনে হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাসহ তিন আসামির সংশ্লিষ্ট এজেন্সিও এবার সুযোগ পেয়েছে। দেশে ২,১০০-এর বেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে। এই খাতের শীর্ষ ২০টি প্রতিষ্ঠান তো সবাই কমবেশি চেনে। অন্তত ৫০টি প্রতিষ্ঠিত ও সুনামধন্য এজেন্সির নামও সংশ্লিষ্টদের কাছে পরিচিত। কিন্তু এবার এমন অনেক অখ্যাত কিংবা বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যাদের নাম এই খাতের সাধারণ মানুষও তেমন চেনে না। তাহলে প্রশ্ন হলো— এরা কারা? কী যোগ্যতায় এরা নির্বাচিত হলো? নাকি এরা প্রক্সি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান নতুন, যারা অতীতে সিন্ডিকেটবিরোধী আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনাতেও তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছিল। ওই হামলার আসামি হিসেবে ছাত্রদলের কয়েকজন সাবেক নেতার নামও এসেছিল। এবার তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি এজেন্সিও কাজ পেয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। অথচ বিদ্যমান প্রোফাইল ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় মালয়েশিয়ার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে কাজ করার জন্য তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিচিত তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম ম্যানগ্রোভ, চাঁদপুর ও স্মার্ট।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের খবরও সামনে এসেছে, যা সরকারি সফরসূচির অংশ ছিল না বলে জানা গেছে। সেখানে তিনি আমিন নূরের সঙ্গে কথা বলেছেন বলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গে রিপোর্ট হয়েছে।
আমিন নূর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে শত শত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২১ সালের সিন্ডিকেট নিয়েও তার নাম ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। সে সময় কর্মীপ্রতি ব্যয় নির্ধারণ করা হলেও অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের কারণে কর্মীদের সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। আমিন নূর এবং তার বাংলাদেশি অংশীদার রুহুল আমিন স্বপনকে ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগও উঠেছিল।
এমন একজন ব্যক্তির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। শ্রমবাজারের স্বার্থে প্রয়োজন হলে যেকোনো ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেটি যদি সত্যিই রাষ্ট্রীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় হয়, তাহলে কেন তা নির্ধারিত ও আনুষ্ঠানিক সফরসূচির বাইরে হবে? কেন এমন একটি বৈঠকের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হবে? আমিন নূর মালয়েশিয়ায় দুইবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাধারণ সদস্যরা গত ১৯ আগস্ট আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, আগেরবার সিন্ডিকেটে অন্তর্ভুক্তির মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা থাকলেও এবার তা বেড়ে সাড়ে ১৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এর চাপ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ওপরই পড়বে। সিন্ডিকেটের কারণে একজন শ্রমিকের বিদেশ যেতে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এর অর্থ হলো— একদিকে শ্রমিক শোষণ, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব।
অতীতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে কেন্দ্র করে যেসব দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, সেসব ঘটনায় তৎকালীন মন্ত্রী-সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কেউ কেউ কারাগারেও গেছেন। ২০২১ সালের সিন্ডিকেট নিয়ে যে অভিযোগ ও বিচারিক প্রক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তার পরিণতি দেশ দেখেছে। তাহলে প্রশ্ন হলো— যে ধরনের সিন্ডিকেট কাঠামোর অপরাধে এক পক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা হলো, আজ আবার সেই একই কাঠামোকে নতুন মুখের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন?
আর যেসব এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকগুলোর পরিচিতি ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আগেরবার ২৫টি এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। কীভাবে এবং কোন মানদণ্ডে তাদের নির্বাচন করা হয়েছিল, তার কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা কখনো দেওয়া হয়নি। সেখান থেকেই ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালে এর পরিণতি আমরা দেখেছি। হাজার হাজার মানুষ বিমানবন্দরের সামনে কান্নাকাটি করেছে। টাকা দিয়েও অনেকে মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও প্রায় ১৭ হাজার কর্মী শেষ পর্যন্ত দেশ ছাড়তে পারেননি।
এসব কোনো গোপন ঘটনা নয়। হাজার হাজার নথি, সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং টেলিভিশন রিপোর্ট রয়েছে। তাহলে আবারও যখন ২৫টি এজেন্সির হাতে বাজার তুলে দেওয়া হচ্ছে, তখন মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে— আবার কি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে?
এই সিন্ডিকেট ব্যবস্থা ঠেকানোর দাবিই ছিল এত বড় যে অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত শ্রমবাজারই খুলতে পারেনি। কারণ, একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে পুরো বাজার তুলে দিয়ে শ্রমিকদের আবার জিম্মি করার ঝুঁকি রাষ্ট্র নিতে চায়নি। অথচ আজকের সরকার আবার সেই পুরোনো পথেই হাঁটছে।
এবারও ২৫টি এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে হয়তো তারা আগের চেয়ে কিছুটা কৌশলী হয়েছে। আওয়ামী লীগের সময় এমপি-মন্ত্রীরা সরাসরি নিজেদের প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেটে ঢুকিয়েছিলেন—এমন অভিযোগ এত বেশি ছিল যে তা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। এবার হয়তো সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সরাসরি নিজেদের প্রতিষ্ঠান সামনে না এনে ডান হাত-বাম হাত, আত্মীয়স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠজনদের লাইসেন্স ব্যবহার করা হচ্ছে— এমন প্রশ্ন উঠছে।
সবার প্রত্যাশা ছিল, বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে আর নতুন করে কোনো সিন্ডিকেট হবে না। প্রবাসে ভাগ্য অন্বেষণে যাওয়া নাগরিকদের আর কয়েকজনের ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে জিম্মি হতে হবে না। নতুন করে তাদের জবাই করা হবে না।
কিন্তু বিধিবাম! আমার সরকার শিরদাঁড়া সোজা করতে পারল না। আমার রাষ্ট্র তার নাগরিকদের এই দালালতন্ত্র, সিন্ডিকেট ও ভাগ-বাটোয়ারার রাজনীতি থেকে মুক্তি দিতে পারল না।
সময়ের আলো