Image description

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই রাওয়ালপিন্ডিতে তিন কোম্পানি সেনা মোতায়েন করেছে দেশটির সরকার। নতুন প্রতিরক্ষা আইন পাসের মাত্র দুদিনের মধ্যেই রাওয়ালপিন্ডিতে এই সেনা মোতায়েন ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন জল্পনা। একদিকে নতুন আইনে চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের হাতে দেওয়া হয়েছে সেনাবাহিনী ও সামগ্রিক সামরিক কাঠামোর ওপর ব্যাপক ক্ষমতা। অন্যদিকে, সেই আইন জাতীয় পরিষদে পাস হওয়ার পরপরই রাওয়ালপিন্ডিতে ছয় মাসের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তিনটি কোম্পানি। গতকাল শনিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দিয়েছে দেশটির শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ডন।
সরকারের দাবি, ‘সংবেদনশীল নিরাপত্তা দায়িত্ব’ পালন এবং ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’ মোকাবিলার জন্যই এ ব্যবস্থা। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো হুমকি বা ঘটনার কথা জানানো হয়নি। ফলে ইমরান খানকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদমুখী লংমার্চের আগে সম্ভাব্য গণবিক্ষোভের আশঙ্কাই কি এই অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের নেপথ্যে— এমন প্রশ্ন উঠছে।
ঘটনাপ্রবাহের শুরু গত ২০ আগস্ট। ওইদিন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ডিফেন্স ফোর্সেস অ্যাক্ট, ২০২৬ এবং ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি অ্যাক্ট, ২০১০-এর সংশোধনী অনুমোদন করে। বিরোধীরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছিল। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিল দুটির অনুমোদন হয়। পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জাতীয় পরিষদে বিল পেশ করেন। বিরোধীদের আপত্তি সত্ত্বেও তা পাস হয়। একই দিনে সিনেটও বিল দুটির অনুমোদন দেয়।
নতুন আইনে মুনিরের ক্ষমতার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি একই সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান এবং সিডিএফ। অর্থাৎ সেনাবাহিনীর ওপর সরাসরি কমান্ডের পাশাপাশি নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ওপরও তার অপারেশনাল কমান্ড থাকবে। তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়, যৌথ সামরিক কার্যক্রম, কৌশলগত বিষয়ে নজরদারি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সিডিএফের কর্তৃত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রধান সামরিক উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করবেন।
শুধু বাহিনীর পরিচালনাগত ক্ষমতাই নয়, সামরিক কর্মীদের চাকরি নিয়েও মুনিরের হাতে এসেছে বড় ক্ষমতা। নতুন আইনে তিনি কোনো সামরিক কর্মীকে অবসরে পাঠাতে, চাকরি থেকে বাদ দিতে, পদত্যাগ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে, চাকরিতে বহাল রাখতে এবং নির্ধারিত বয়স বা চাকরির মেয়াদ পেরিয়েও তাকে বহাল রাখার সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ সামরিক বাহিনীর বহু সদস্যের কর্মজীবন ও অবসরের সিদ্ধান্তে সিডিএফের প্রভাব আরও বেড়েছে। এই আইনি কাঠামো আবার পুরোপুরি নতুন করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তানের ২৭তম সাংবিধানিক সংশোধনী, যার মাধ্যমে গত বছরের নভেম্বরে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ড কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। সেই সংশোধনীতে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যানের পদ বিলুপ্ত করে সিডিএফের পদ তৈরি করা হয় এবং সেনাপ্রধানকেই একই সঙ্গে সিডিএফ করার ব্যবস্থা করা হয়। মুনির গত ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ সিডিএফের দায়িত্ব নেন। নতুন প্রতিরক্ষা আইন সে কাঠামোকেই আইনি ভিত্তি দিয়েছে এবং আইনটির কার্যকারিতা ১৩ নভেম্বর ২০২৫ থেকে পূর্ববর্তী তারিখে কার্যকর ধরা হয়েছে।


আইন পাসের পরদিন অর্থাৎ ২১ আগস্ট, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাওয়ালপিন্ডিতে তিনটি সেনা কোম্পানি মোতায়েনের অনুমোদন দেয়। সেনা মোতায়েনের মেয়াদ ছয় মাস এবং সিদ্ধান্তটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। পাঞ্জাব সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ২২ জুলাইয়ের একটি অনুরোধের ভিত্তিতেই এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের সংবিধানের ২৪৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বেসামরিক প্রশাসনকে নিরাপত্তা রক্ষায় সহায়তা করার জন্য সেনাবাহিনীকে কাজে লাগানো যায়। সে ধারাতেই এই মোতায়েন।
তবে সরকারি আদেশে কোনো নির্দিষ্ট সন্ত্রাসী হামলা, বিদ্রোহ, গণবিক্ষোভ বা অন্য কোনো নিরাপত্তা হুমকির কথা উল্লেখ নেই। বলা হয়েছে, সেনারা ‘সংবেদনশীল নিরাপত্তা দায়িত্ব’ পালন করবে, ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’ মোকাবিলা করবে এবং ‘অপ্রত্যাশিত হুমকি’ দেখা দিলে তা সামলাবে। ফলে সেনা মোতায়েনের প্রকৃত কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। আর সে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠছে রাওয়ালপিন্ডির অবস্থানের কারণে। শহরটিই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স বা জিএইচকিউয়ের কেন্দ্র। একই শহরের আদিয়ালা জেলে বন্দি রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান। তার চিকিৎসা নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধীদের সংঘাতও এখন তীব্র আকার নিয়েছে। এরই মধ্যে পিটিআই আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদমুখী লংমার্চ ও পূর্ণাঙ্গ বিক্ষোভের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া হাউজে গত শুক্রবার বিরোধী নেতাদের বৈঠকেও কর্মসূচি আরও জোরদার এবং বৃহত্তর বিরোধী দলগুলোকে আন্দোলনে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে নতুন প্রতিরক্ষা আইন, মুনিরের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং তার ঠিক পরই রাওয়ালপিন্ডিতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন— এ তিনটি ঘটনাকে একই সূত্রে দেখছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠছে, পাকিস্তান কি সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য আগেভাগেই নিরাপত্তাবলয় শক্ত করছে?