Image description

‘জেলে থাকতি দুবেলা খাওন পাইতাম, এখন অনেক সময় না খাইয়া থাকতি হয়। বৌ ঘর ছাড়ছে, মাইয়েটা একপ্রকার পথের ভিখারি। জেল থেকে মুক্তি পাইছি, কিন্তু জীবন পাই নাই।’

কথাগুলো বলতে বলতে হতাশায় নুয়ে পড়েন ইব্রাহিম আলী শেখ (সাগর)। একসময় কারাগারের অন্ধকার কক্ষই ছিল তার ঠিকানা। এখন মুক্ত আকাশের নিচে থাকলেও মাথা গোঁজার নিজের কোনো ঠাঁই নেই, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তাও। ২১ বছর কারাভোগের পর মুক্তি পেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ যেন এখনো অধরাই রয়ে গেছে তার।

২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান ইব্রাহিম। অথচ তিনি খালাস পেয়েছিলেন তারও আট বছর আগে, ২০১৭ সালে। খালাসের সেই রায়ের কপি কারাগারে না পৌঁছানোয় রায় হওয়ার পরও আরও আট বছর ফাঁসির সেলের অন্ধকারে বন্দি থাকতে হয় তাকে।

 

মুক্তির পর দেড় বছর হতে চললেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি ইব্রাহিম। বর্তমানে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার লখপুর ইউনিয়নের ভবনা-খড়িবুনিয়া গ্রামের মরা পশুর নদীর চরের খাসজমিতে ভগ্নিপতির পরিবারের সঙ্গে আশ্রিত হয়ে আছেন। নিজের কোনো জমি নেই। যে পরিবারে আশ্রয় নিয়েছেন, তারাও দরিদ্র। ফলে দীর্ঘ কারাবাসে হারানো সময়ের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে পরিবার, বাসস্থান ও জীবিকার অনিশ্চয়তা।

 

সরেজমিন মরা পশুর নদীর চরের খাসজমিতে ইব্রাহিমের ভগ্নিপতির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ ঘরের এক কোণে কোনোরকমে দিন কাটছে তার। দীর্ঘ কারাবাসের ছাপ তার শরীর ও চলাফেরায় স্পষ্ট। চোখে-মুখে ক্লান্তি, কথায় হতাশা। নিজের বলতে নেই কোনো ঘর, জমি কিংবা স্থায়ী আয়ের উৎস।

২০ বছর বয়সে কারাগারে, ফিরলেন ৪১ বছরে

২০০৩ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন ইব্রাহিম। একই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় নিজের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি তিনি। এরপর একে একে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয় তার।

কারাগারে থাকা এক কয়েদির পরিবারের সহযোগিতায় পরে উচ্চ আদালতে আপিল করেন ইব্রাহিম। ২০১৭ সালে হত্যা ও যাবজ্জীবন মামলায় খালাস পান তিনি। অন্য দুই মামলার সাজাও এরই মধ্যে কারাভোগ করে শেষ করেন। কিন্তু খালাসের আদেশ কারাগারে পৌঁছাতে লেগে যায় আরও আট বছর।

পরিবারের পক্ষ থেকে তদবির এবং কারা কর্তৃপক্ষের উদ্যোগের পর অবশেষে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পান তিনি। কিন্তু ২১ বছর পর কারাগারের দরজা খুললেও তার সামনে খুলে যায়নি স্বাভাবিক জীবনের দরজা।

হারিয়ে গেছে সংসার, বড় হয়েছে সন্তান

গ্রেপ্তারের সময় ইব্রাহিমের সন্তানের বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। ২১ বছরের কারাবাসে সেই সন্তান বড় হয়ে বিয়েও করেছেন। স্ত্রীও অনেক আগেই তাকে ছেড়ে চলে গেছেন।

ইব্রাহিমের দাবি, ‘খুনের আসামি’ পরিচয়ের কারণে সামাজিকভাবে তার মেয়ের বিয়েতেও নানা বাধা এসেছে।

তিনি বলেন, ‘আমি মিথ্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে জেলে ছিলাম। আমার স্ত্রী আমাকে আর আমার ছোট মেয়েকে ফেলে গেছে। আমার দরিদ্র মা মেয়েটাকে মানুষ করেছে। বড় হওয়ার পর ভালো কোনো পরিবার বিয়ের জন্য এগিয়ে আসেনি। সবাই বলত, বাপ খুনি, মা চলে গেছে।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘জেলে বসেই শুনছিলাম, বাধ্য হয়ে আমার মা মেয়েকে খুব গরিব এক পরিবারে বিয়ে দিয়েছে। মুক্তির পর এসে দেখি, মেয়েও কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। জেল জীবন শেষ করা একজন অক্ষম বাবা হয়ে মেয়ের এই কষ্ট দেখা আমার কাছে মৃত্যুর চেয়েও ভারী।’

 

শ্রমে চলত সংসার, জেলে হারালেন কর্মক্ষম সময়

শৈশবেই বাবার দ্বিতীয় বিয়ের পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল ইব্রাহিমকে। দিনে রিকশা চালানো আর রাতে বাজারে নাইটগার্ডের কাজ করে মা, ভাই-বোন, স্ত্রী ও শিশুসন্তানের ভরণপোষণ করতেন তিনি।

কিন্তু মাত্র ২০ বছর বয়সে কারাগারে যাওয়ার পর তার জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময় কেটে যায় বন্দিজীবনে। ২১ বছর পর যখন মুক্তি পেলেন, তখন শরীর আর আগের মতো নেই।

দীর্ঘ সময় কনডেম সেলের অন্ধকারে থাকার প্রভাব পড়েছে তার শরীরেও। আলো সহ্য করতে পারেন না, চোখে কম দেখেন। বয়সের তুলনায় শরীরে আগেভাগেই বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে। হাত-পা অনেকটা অসাড় হয়ে গেছে। ভারী কাজ তো দূরের কথা, সাধারণ কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

‘আর মানুষ কাজ দিতেও চায় না। গরিব আছিলাম, তাই নিজেরে বাঁচাইতে পারি নাই। মিথ্যা মামলায় ২১ বছর জেল খাটলাম। তার মধ্যে খালাস পাওয়ার পরও আটটা বছর ফাও জেলে থাকলাম। এখন সরকারের কাছে চাই—আমারে বাঁচার একটা ব্যবস্থা করে দিক।’

স্থানীয় বাসিন্দা সাগর শেখ বলেন, ‘ইব্রাহিম যখন জেলে যায়, তখন সে ছিল তরতাজা যুবক। এখন তাকে দেখে মনে হয় অনেক বয়স্ক একজন মানুষ। এত বছর জেল খেটে এসে নিজের কোনো ঘরবাড়ি নেই, কাজ করার শক্তিও নেই। অন্যের আশ্রয়ে কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছে। তার মতো একজন মানুষকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখা খুবই কষ্টের।’

স্থানীয় বাসিন্দা আহসান হাবীব বলেন, ‘ইব্রাহিমের নিজের কোনো জায়গা নেই। যে বাড়িতে আছে, তারাও গরিব। কতদিন অন্যের ওপর নির্ভর করে থাকবে? সরকারের পক্ষ থেকে একটি ঘর, চিকিৎসা এবং কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দিলে অন্তত বাকি জীবনটা একটু শান্তিতে কাটাতে পারবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন মানুষ দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর যদি মুক্ত হয়ে আবার সমাজে ফিরতে না পারে, তাহলে সেই মুক্তির অর্থ কী? তার সংসার ভেঙে গেছে, শরীর ভেঙে গেছে, উপার্জনের ক্ষমতা নেই। এখন সমাজেরও দায়িত্ব আছে তার পাশে দাঁড়ানোর।’

ইব্রাহিমের বৃদ্ধ মা কোহিনূর বেগম বলেন, ‘ছেলেকে ২১ বছর পর বুকে পাইছি। ছেলেকে ছাড়ানোর জন্য ইটভাটায় কাজ করছি, মানুষের বাড়িতেও কাজ করছি। শেষ পর্যন্ত বটিয়াঘাটায় আমার নিজের ঘরটুকুও বিক্রি করছি। এখন জামাইবাড়িতে ছেলেকে নিয়ে থাকি। কিন্তু ছেলের তো এখন কাজ করে খাওয়ার ক্ষমতা নাই। আমি আর কতদিন পারব?’

স্থানীয়দের দাবি, ইব্রাহিমের দীর্ঘ কারাবাস, খালাসের পরও আট বছর কারাগারে থাকার ঘটনা এবং বর্তমানে তার অসহায় অবস্থার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। দ্রুত তার চিকিৎসা, পুনর্বাসন, বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং জীবিকার সুযোগ তৈরি করা দরকার।

বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘ইব্রাহিম আলী শেখের চাহিদা ও সক্ষমতা অনুযায়ী কাজের ব্যবস্থা করা হবে। ফকিরহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে তার কাছে পাঠিয়ে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

তিনি আরোও বলেন বলেন, ‘সরকারের যে সক্ষমতা রয়েছে, তার মধ্য থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি আমাদের বিত্তবান মানুষের কাছেও আবেদন জানাব—তারা যদি মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে ইব্রাহিমকে একটি সুন্দর জীবন দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি যাতে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারেন, সে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

মরা পশুর নদীর পাড়ে নোনা বাতাসের মধ্যে এখনো বসে থাকেন ইব্রাহিম। যে বয়সে থাকার কথা ছিল নিজের ঘর-সংসারে, সেই বয়সে তিনি আশ্রিত অন্যের ঘরে। জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম ২১ বছর কেটেছে কারাগারের অন্ধকারে। আর খালাস পাওয়ার পরও হারিয়ে গেছে আরও আটটি বছর।

ইব্রাহিমের ঝাপসা চোখে এখন ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন নেই। আছে শুধু হারিয়ে যাওয়া জীবনের হিসাব। তার একটাই প্রশ্ন—খালাস পাওয়ার পরও যে আটটি বছর তিনি কারাগারে কাটালেন, সেই সময়ের মূল্য দেবে কে? শুধু কারাগারের দরজা খুলে দেওয়াই কি একজন মানুষের মুক্তি? ইব্রাহিমের বর্তমান জীবন সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে।