Image description
বিআরটিএর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে সংশয়

সারা দেশে গণপরিবহনের চলাচল কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে যানবাহনে জিপিএস ডিভাইস সংযোজনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এ জন্য ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সার্ভিস (ভিটিএস) দিতে পারে এমন ২৭টি প্রতিষ্ঠানের তালিকাও করেছে সংস্থাটি। তবে কালবেলার অনুসন্ধানে তালিকাভুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২১টির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম, কারিগরি সক্ষমতা ও গণপরিবহনে ভিটিএস সেবা দেওয়ার দৃশ্যমান উপস্থিতি খুবই সীমিত।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট প্রকাশিত প্রাথমিক তালিকায় ছিল ২০টি ভিটিএস প্রতিষ্ঠান। মাত্র আট দিন পর ১০ আগস্ট হালনাগাদ তালিকায় আরও ছয়টি এবং এবং ১৮ আগস্ট হাইপার সিস্টেম লিমিটেডকে যুক্ত করার ফলে সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭-এ। কিন্তু তালিকায় নাম থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিভাইসের কারিগরি মান, সার্ভার সক্ষমতা, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদে বিপুলসংখ্যক গণপরিবহনের লাইভ ডাটা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য মেলেনি।

বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যেও উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভার বা পূর্ণাঙ্গ কারিগরি সক্ষমতা সরাসরি যাচাই করেনি সংস্থাটি। মূলত বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) লাইসেন্স এবং বিআরটিএর সিস্টেমে এপিআই সংযোগ করতে পারার বিষয়টি বিবেচনা করে এসব প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

বিআরটিএর ২ আগস্টের তালিকায় থাকা ২০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল এনআইটিএস সার্ভিস, অন্যরকম ইলেকট্রনিকস, মোনিকো টেকনোলজিস, ট্র্যাকিং অ্যান্ড সার্ভে সলিউশনস, আইএফএড ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি, থানে সিস্টেমস, বন্ডস্টেইন টেকনোলজিস, ওভহাই সলিউশন, ইজিট্র্যাক্স ওয়ার্ল্ড, অটো জেনারেশন, ডুপনো ইন্টারন্যাশনাল, ফরবিট, অটোনেমো, এম ট্র্যাক, সান সিটি বিজ, জিকার সলিউশন্স, মাকট্রো ইলেকট্রনিক্স, ট্র্যাকিং বিডি, এমওয়াইজিপিএস ও আয়শা টেকনোলজি।

১০ আগস্টের হালনাগাদ তালিকায় নেক্সডেকেড টেকনোলজিস, এম২এম কমিউনিকেশন্স, ফ্যালকনস, আজান টেক, বঙ্গ টেকনোলজি, গ্রামীণফোন এবং ১৮ আগস্ট হাইপার সিস্টেম লিমিটেড যুক্ত হয়। তিন তালিকাতেই প্রতিষ্ঠানের ভিটিএস লাইসেন্স নম্বর, লাইসেন্সের মেয়াদ এবং ‘টেস্টিং এপিআই কানেকটেড’ স্ট্যাটাস উল্লেখ রয়েছে। কয়েকটির ক্ষেত্রে এপিআই সংযোগ পরীক্ষার তারিখও দেওয়া হয়েছে।

বিআরটিএর পরিচালক (অপারেশন) মোছাম্মাৎ মমতাজ বেগম বলেন, গণপরিবহনে জিপিএস বসানোর জন্য এরই মধ্যে গণবিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত এর রিপোর্ট নেওয়া হচ্ছে। শুরুতে ৩০টি প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমানে তালিকায় ২৭টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানকে বাদ দেওয়া হয়েছে, কারণ তাদের বিটিআরসির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ পর্যায়ে ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিআরটিএ মূলত তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করছে—বিটিআরসির হালনাগাদ লাইসেন্স, বিটিআরসির শর্ত পালন এবং বিআরটিএর সিস্টেমে এপিআই সংযোগ সক্ষমতা।

তবে এসব প্রতিষ্ঠানকে একই মানদণ্ডে কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তাদের ডিভাইস ও সার্ভারের সক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর তিনি অপারেশন শাখার সিস্টেম অ্যানালিস্ট হোসেন মমতাজের কাছ থেকে নিতে বলেন।

এ বিষয়ে হোসেন মমতাজ বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভার বা সক্ষমতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে বিআরটিএ সরাসরি দায়িত্ব নেয়নি। এ ক্ষেত্রে বিটিআরসির লাইসেন্স এবং তালিকার ওপর নির্ভর করা হচ্ছে।

তবে চলতি বছরের ১৯ জুলাই প্রকাশিত বিআরটিএর ‘জিপিএস ডিভাইস স্পেসিফিকেশন (ন্যূনতম)’ নথিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত ন্যূনতম স্পেসিফিকেশনের জিপিএস ডিভাইস বিটিআরসি নিবন্ধিত ভিটিএস সেবা প্রদানকারীর মাধ্যমে স্থাপন করতে হবে। সেবা প্রদানকারীর ট্র্যাকিং সফটওয়্যার, স্থানীয় ডেডিকেটেড সার্ভার এবং বিআরটিএ সার্ভারের সঙ্গে এপিআইয়ের মাধ্যমে ডাটা সংযোগের সক্ষমতা থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে তালিকায় ‘টেস্টিং এপিআই কানেকটেড’ লেখা থাকলেও এই পরীক্ষায় ঠিক কী যাচাই করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

বিআরটিএর অপারেশন শাখার সিস্টেম অ্যানালিস্ট হোসেন মমতাজ আরও বলেন, যারা বিআরটিএর সিস্টেমে ডাটা পাঠাতে পারছে, তাদেরই তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। পরীক্ষার সময় মূলত গাড়ির গতি ও অবস্থানসংক্রান্ত ডাটা দেখা হচ্ছে।

কিন্তু একটি গাড়ির অবস্থান ও গতির তথ্য বিআরটিএর সার্ভারে পাঠানো সম্ভব হয়েছে—এটিই যদি প্রাথমিক পরীক্ষার মূল বিষয় হয়, তাহলে হাজার হাজার গাড়ির রিয়েল টাইম ডাটা দীর্ঘ সময় ধরে গ্রহণ, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ করার সক্ষমতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এর জন্য সার্ভারের ধারণক্ষমতা, ব্যাকআপ ব্যবস্থা, ডাটা সংরক্ষণ, নেটওয়ার্ক স্থিতিশীলতা এবং সার্ভার ডাউন হলে বিকল্প ব্যবস্থা থাকা জরুরি বলে মনে করেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

বিআরটিএর উপপরিচালক (প্রশাসন) সামিউল মাসুদ (উপসচিব) কালবেলাকে বলেন, জিপিএস ডিভাইসের জন্য বিআরটিএ একটি কারিগরি স্পেসিফিকেশন তৈরি করেছে। নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিটিআরসি ও তালিকাভুক্ত ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের ওপর থাকবে।

কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন লঙ্ঘন করে জিপিএস ডিভাইস বিক্রি করলে ফিটনেস বা রেজিস্ট্রেশনের সময় তা শনাক্ত করার সুযোগ থাকবে বলেও জানান তিনি। জিপিএস সেবা দেওয়া তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে সে বিষয়ে তিনি বলেন, ভেন্ডরদের লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব বিটিআরসির। ফলে ভেন্ডর নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিটিআরসিকেই দায়িত্ব নিতে হবে। বিআরটিএ সংশ্লিষ্ট ভেন্ডরদের কাছ থেকে এপিআই লিঙ্ক নেবে এবং ওই এপিআই-এর মাধ্যমে জিপিএস সংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থায় যুক্ত করা হবে।

প্রকাশিত তথ্যেও বড় পার্থক্য কালবেলার পর্যালোচনায় ০২, ১০ এবং ১৮ আগস্টের তালিকায় থাকা ডিভাইস বিক্রির ২৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রকাশ্য তথ্য, বাজারে উপস্থিতি, কার্যক্রমের সময়কাল এবং ভিটিএস-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত তথ্য দেখা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রকাশিত তথ্যের পরিমাণ ও দৃশ্যমান কার্যক্রমে বড় পার্থক্য দেখা গেছে।

গ্রামীণফোন, মোনিকো টেকনোলজিস, বন্ডস্টেইন টেকনোলজিস, এনআইটিএস সার্ভিস, ইজিট্র্যাক্স ওয়ার্ল্ড এবং ডুপনো ইন্টারন্যাশনালের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়। এসব প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের কার্যক্রম, গ্রাহকভিত্তি, প্রযুক্তিগত সেবা বা বাজারে উপস্থিতির তথ্য রয়েছে।

অন্যদিকে নেক্সডেকেড টেকনোলজিস, অন্যরকম ইলেকট্রনিক্স, হাইপার সিস্টেম লি., আইএফএড ইনফরমেশন অ্যান্ড টেকনোলজি, এম২এম কমিউনিকেশনস, ফ্যালকনস, হাইপার সিস্টেম লিমিটেড, জিকার সলিউশনস ও ওভহাই সলিউশনের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত।

থানে সিস্টেমস, ট্র্যাকিং অ্যান্ড সার্ভে সলিউশনস, অটো জেনারেশন, অটোনেমো, এম ট্র্যাক, বঙ্গ টেকনোলজি, সান সিটি বিজ, মাকট্রো ইলেকট্রনিক্স, ফরবিট, আজান টেক, ট্র্যাকিং বিডি, এমওয়াইজিপিএস ও আয়শা টেকনোলজির ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি বড় পরিসরের ভিটিএস কার্যক্রমের স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রকাশ্য তথ্য একেবারেই সীমিত।

কন্ট্রোল রুমেও বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ডিজিটাল মনিটরিং এবং কন্ট্রোল রুম স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বিআরটিএ। এর মাধ্যমে সড়কে যানজট কমানো, যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং অপরাধ রোধ করা সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। এ বিষয়ে বিআরটিএর উপপরিচালক (প্রশাসন) সামিউল মাসুদ কালবেলাকে বলেন, পরিকল্পিত জিপিএস কন্ট্রোল রুমটি বিআরটিএ ভবনের লিফটের পাশের তৃতীয় তলার উত্তর পাশে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে একাধিক সভার পর চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারণ হবে। তবে প্রাথমিক হিসাবে ব্যয় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার কিছু বেশি হতে পারে। পুলিশের বা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের বিদ্যমান ব্যবস্থার তুলনায় বিআরটিএর ব্যবস্থাটি আরও উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেইসঙ্গে আগামী বছরের জুলাইয়ের মধ্যে সব গণপরিবহনকে জিপিএস-এর আওতায় আনা সম্ভব। কারণ যানবাহনের ফিটনেস নবায়নের জন্য মালিকদের বিআরটিএতে আসতেই হবে।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, ২ থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত ২২৩টি বাস-মিনিবাসে জিপিএস সংযোগ করা হয়েছে। বিআরটিএ এসব যানের ডাটা সংগ্রহ করছে। আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মনিটরিং সেল বা কন্ট্রোল রুম স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিআরটিএর তথ্যমতে, এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জিও-প্ল্যানিং ফর অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্ট (জিপেড) কারিগরি, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ফিজিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউর রহমান বলেন, স্টাডির খসড়া রিপোর্ট বর্তমানে পর্যালোচনায় রয়েছে। আগামী মাসে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা হবে। এরপর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সফটওয়্যার উন্নয়নের কাজ শুরু হবে। তার মতে, জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, রুট ভায়োলেশন শনাক্তকরণ এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে।

ভিটিএস নিয়ে বিআরটিএর সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন-ট্রাফিক অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ড. মো. শামসুল হকের পর্যবেক্ষণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, গণপরিবহনে ভিটিএস /জিপিএস সংযোজন নিঃসন্দেহে সড়ক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু কতটি গাড়িতে ডিভাইস বসানো হলো, তা দিয়ে নির্ণয় করা যাবে না। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্য কতটা নির্ভুলভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হচ্ছে এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে রিয়েল টাইম কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তার ওপর।

জিপিএস ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নে বিআরটিএর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়েও সংশয় ড. শামসুল হকের। তার মতে, ডিজিটাল লাইসেন্স প্লেট ও আরএফআইডি কার্ড চালু করা হলেও দীর্ঘ সময়েও সেগুলোর রিডার স্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর করা যায়নি। তার ভাষায়, এটি বিআরটিএর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার একটি উদাহরণ।