» কোথাও কোথাও ইউরিয়ার দাম কেজিতে ৮ টাকা বেশি । » ডিএপি ও টিএসপিও নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬ থেকে ৮ টাকা বেশি । » সার কিনতে গিয়ে ফিরে আসছেন অনেক কৃষক । » দোকানিরা বলছেন , সার নেই । জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে , মজুত পর্যাপ্ত । সাজন আহম্মেদ পাপন , কিশোরগঞ্জ
আমন মৌসুম শুরু হয়েছে । কৃষকেরা জমি প্রস্তুত করছেন । বীজতলা থেকে চারা তোলা হচ্ছে । কোথাও কোথাও চারা রোপণও শুরু হয়েছে । তবে কৃষকেরা সারের দোকানে গিয়ে সার পাচ্ছেন না । ডিলাররা বলছেন , চাহিদার তুলনায় বিসিআইসি ও বিএডিসি তাঁদের সার সরবরাহ করছে না । এ পরিস্থিতিতে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন । সরেজমিনে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষক , ডিলার ও সারের খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে । কৃষকেরা
আমন রোপণের জন্য জমি প্রস্তুত করছেন কৃষক । গতকাল কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার গুনধরের খয়রত গ্রামে । ছবি : আজকের পত্রিকা
বলছেন , সারসংকটের কারণে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছ তাঁদের । সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের বালিয়াবাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায় , বর্ষার পানি নেমে যাওয়ায় একরের পর একর জমি ভেসে উঠেছে । সেখানে ট্রাক্টর দিয়ে হাল চাষ করছেন কৃষকেরা । হালের পর মই দিয়ে জমি সমান করছেন কেউ কেউ । সেখানে কথা হয় সিদ্ৰীপ গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নানের ( ৬৬ ) সঙ্গে । আমন আবাদ করবেন , সে অনুযায়ী জমি প্রস্তুত করেছেন । নিয়ম
অনুযায়ী জমি প্রস্তুতের সময় শেষ চাষের আগে ডিএপি বা টিএসপি সার দিতে হয় । আব্দুল মান্নান বলেন , ' বীজতলায় ৩৫ টাকা কেজি করে ইউরিয়া সার কিনে দিতে পেরেছিলাম । কিন্তু রোপণ করার জমিতে সার দেওয়ার জন্য দুই দিন ধরে ঘুরছি । কোনো সার পাচ্ছি না । এখন সার ছাড়াই জমি রোপণ করতে হবে । ' উপজেলার বারঘরিয়া ইউনিয়নের চাতল বাজারের বিএডিসি অনুমোদিত বীজ ডিলার মেসার্স ভূঁইয়া ট্রেডার্সে গিয়ে দেখা যায় , সেখানে চার বস্তা ইউরিয়া সার , খোলা বস্তায় দুই থেকে
তিন কেজি ডিএপি , কয়েক কেজি টিএসপি ও ১৫ থেকে ১৬ কেজির মতো এমওপি সার নিয়ে বিক্রির জন্য বসে আছেন প্রোপাইটার আসাদুজ্জামান রিপনের বাবা আক্কাস আলী মেম্বার । সার কোনটা কত টাকা করে বিক্রি করছেন ? জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন , ‘ ডিএপি ও টিএসপি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা , এমওপি ২২ টাকা এবং ইউরিয়া সার ৩৫ টাকা কেজি করে বিক্রি করছি । ' অথচ এই দোকানেই টাঙানো লাল বোর্ডে মূল্যতালিকায় লেখা আছে ইউরিয়া সংকটে সারের দাম বাড়তি প্রতি কেজি ২৭ টাকা , টিএসপি ২৭ টাকা , ডিএপি ২১ টাকা ও এমওপি ২০ টাকা । একটু পরেই দোকানে এসে বসলেন প্রোপাইটার আসাদুজ্জামান রিপন ।
এ সময় নোয়াবাদ ইউনিয়নের ভাঙ্গাখালী গ্রামের জয়নাল মিয়া ( ৫২ ) নামের এক কৃষক তাঁর দোকানে এলেন সার কিনতে । জয়নাল মিয়া ২০ কাঠা জমিতে এবার আমন আবাদ করবেন । ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে তাঁর দুই বস্তা সারের প্রয়োজন । সার নেই বলে কৃষককে ফিরিয়ে দেন আসাদুজ্জামান রিপন । কৃষক জয়নাল মিয়া বলেন , ‘ কয়েক বাজার ঘুরে এখানে এসেছি । কোনখানেই সার পাচ্ছি না ।
এখন যে অবস্থা সার ছাড়াই চারা রোপণ করতে হবে । এতে ধানের ফলন কম হবে । ' বাজারের খুচরা সার বিক্রেতা মো . খোকন মিয়া বলেন , ‘ প্রতিদিনই এখন কৃষকেরা আসছেন সার নিতে । আমরা সার দিতে পারছি না । আমরা ডিলারদের কাছ থেকে সার আনি । ডিলাররা আমাদেরকে সার দিচ্ছে না । ডিলাররা বলছে সারের নাকি সংকট । ’ চাতল বাজারে চায়ের স্টলে বসে কথা হয় নোয়াবাদ ইউনিয়নের সিঙ্গুয়া গ্রামের কৃষক মো . আসাদুল্লাহর ( ৫৫ ) সঙ্গে ।
তিনি বলেন , ‘ দুই একর জমিতে আমি এবার আমন আবাদ করব । এর মধ্যে এক একর জমি সার ছাড়াই রোপণ করে ফেলেছি । বাকি এক একর জমি প্রস্তুত করে রেখেছি রোপণের জন্য । কিন্তু সার পাচ্ছি না । সারের দোকানে গেলে দুই - তিন কেজি করে সার দিতে চায় , তাও আবার দাম বেশি চায় । ’ জহিরাবাদ গ্রামের কৃষক শাহাবুদ্দীন ( ৫০ ) ক্ষোভের সঙ্গে বলেন ,
‘ তিন কাঠা জমিতে হাল চাষ করে রেখেছি । বৃষ্টি হলেই জমি রোপণ করে ফেলতে হবে । কিন্তু সার পাচ্ছি না । দোকানে গেলে কয় সরকার নাকি সরকারে দিচ্ছে না । ” একই সময়ে জেলার পাকুন্দিয়া , কটিয়াদী ও হোসেনপুর উপজেলায়ও সার সংকটের খবর পাওয়া গেছে । কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের নাগেররগ্রামের কৃষক আব্দুল খালেক ( ৬০ ) বলেন , “ আমি তিন দিন ধরে ধরনা দিয়েও এক বস্তা সার জোগাড় করতে পারিনি । সারের ডিলাররা কয় সার নাই । দোকানে গেলেও সার পাই না ।
মো .তবে সার সংকট কথা অস্বীকার করেছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান । তথ্য দিয়ে তিনি বলেন , ‘ কিশোরগঞ্জে এ বছর ৮৫ হাজার ৪০০ হেক্টর রোপা আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে । এর মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ জমি রোপণ করা হয়েছে । ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলায় ইউরিয়া সারের চাহিদা ৫৩ হাজার ৪১২ মেট্রিক টন , টিএসপি সারের চাহিদা ১২ হাজার ১৬ টন , ডিএপি সারে চাহিদা ২৪ হাজার ৭০০ টন এবং এমওপি সারের চাহিদা ১৮ হাজার ১৬৫ টন ।
চাহিদার বিপরীতে কিশোরগঞ্জে পর্যাপ্ত সার রয়েছে । সারের কোনো সংকট নাই । এরপরেও কৃষকেরা কেন সার পাচ্ছেন না আমরা খোঁজ নিয়ে দেখছি । ' জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন , ‘ জেলায় কৃষিজমির আয়তন ও চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে । চাহিদা যদি বাড়ে তাহলে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব । '