ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেওয়া বায়তুল মোকাররমের সাবেক খতিব মুফতি রুহুল আমিনের ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানার সাজা বহাল রেখেছেন আদালত। পৈতৃক সম্পত্তির দখল নিয়ে নিজের বড় ভাইয়ের স্ত্রীর করা মামলায় সাজা বহাল রাখার পাশাপাশি তাকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার গোপালগঞ্জ জেলার পারিবারিক আপিল আদালতের বিচারক শাহনাজ নাসরীন খান মুফতি রুহুল আমিনের করা আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন।
একই মামলায় বাদীপক্ষের করা সাজা বৃদ্ধির আবেদনও খারিজ করে দেন আদালত।
মামলার বাদী ফাতেমা বেগম হলেন মুফতি রুহুল আমিনের বড় ভাই ‘বড় পীর’ হিসেবে পরিচিত প্রয়াত হাফেজ মাওলানা ওমর আহমদের স্ত্রী।
তিনি ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি টুঙ্গিপাড়া থানা আমলী আদালত, গোপালগঞ্জে নালিশি আবেদন করে রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে পৈতৃক সম্পত্তি দখলের অভিযোগ আনেন।
জমি নিয়ে বিরোধ
মামলার নথিতে বাদীপক্ষের অভিযোগ, টুঙ্গিপাড়া থানার ২৩ নম্বর শ্রীরামকান্দি মৌজার ২৮৬২ নম্বর খতিয়ানের বিআরএস ৪৯৭৯ নম্বর দাগে মোট ৩৪ শতাংশ জমি রয়েছে। এর মধ্যে ফাতেমা বেগমের স্বামী মরহুম মাওলানা ওমর আহমদের অংশ ১৭ শতাংশ এবং মুফতি রুহুল আমিনের অংশও ১৭ শতাংশ।
বাদীর অভিযোগ, নিজের অংশ ১৭ শতাংশ হওয়ার পরও মুফতি রুহুল আমিন পুরো ৩৪ শতাংশ জমি জোরপূর্বক নিজের দখলে নেন। পরে ওই জমিতে ইট, বালু ও সিমেন্ট দিয়ে দেয়াল নির্মাণ করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে এতে বাধা দেওয়া হলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো এবং ফাতেমা বেগমকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করা হয়।
নিম্ন আদালতে ছয় মাসের কারাদণ্ড
মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মাদ আলী তালহা রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে মর্মে রায় দেন।
রায়ে তাকে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার টাকা পরিশোধ না করলে আরও এক মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে বলেও আদেশ দেন আদালত।
তবে নিম্ন আদালতের এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন মুফতি রুহুল আমিন। অন্যদিকে বাদী ফাতেমা বেগমও আসামির সাজা আরও বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে আপিল করেন।
দুই পক্ষের আপিলের শুনানি শেষে বুধবার গোপালগঞ্জ জেলার পারিবারিক আপিল আদালত উভয় আপিলই খারিজ করে দেন। ফলে নিম্ন আদালতের দেওয়া ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার সাজাই বহাল থাকল। একই সঙ্গে রুহুল আমিনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয় ও বায়তুল মোকাররম ঘিরেও বিতর্ক
মুফতি রুহুল আমিন শুধু পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলাতেই আলোচনায় আসেননি। অতীতে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিবের দায়িত্ব পালন নিয়েও নানা সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ আখ্যা দেওয়ায় তিনি আলেম-ওলামাদের একটি অংশের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নড়াইল থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টিও তখন আলোচনায় আসে।
পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে তিনি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিবের দায়িত্ব পান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বায়তুল মোকাররমে তার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে নৈরাজ্যের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একটি মামলাও চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে এসব রাজনৈতিক ও অন্যান্য অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান মামলার বিচারিক বিষয়কে আলাদা করে দেখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান মামলায় আদালতের রায়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ২৩ নম্বর শ্রীরামকান্দি মৌজার ৩৪ শতাংশ পৈতৃক জমির দখল নিয়ে বিরোধ।
আত্মসমর্পণের পালা
নিম্ন আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পর আপিলেও রেহাই না পাওয়ায় মুফতি রুহুল আমিনের জন্য এখন পরবর্তী পদক্ষেপ হলো আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করা। অন্যদিকে বাদীপক্ষ বলছে, তারা এখন আদালতের রায় বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
দীর্ঘদিনের পারিবারিক সম্পত্তি বিরোধ থেকে শুরু হওয়া এ মামলায় দুই দফা বিচারিক সিদ্ধান্তে রুহুল আমিনের সাজা বহাল থাকায় গওহারডাঙ্গার এই প্রভাবশালী ধর্মীয় ব্যক্তিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।