Image description

সরকারি চাকরিজীবীদের বাইরে অন্যান্য পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে তিন বছর আগে চালু হয়েছিল সর্বজনীন পেনশন স্কিম। নিজস্ব সঞ্চয়ে গড়ে ওঠা তহবিল থেকে ৬০ বছর বয়সের পর করমুক্ত মাসিক পেনশন দেওয়ার এই উদ্যোগ চালুর সময় প্রশংসিত হলেও বাস্তবে সঞ্চয়ে জনগণের অনাগ্রহের কারণে এর অগ্রগতি থমকে গেছে।

মেয়াদের পর মোট জমার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত এককালীন উত্তোলনের সুবিধা দিয়ে সরকারি আদেশ জারি হলেও সর্বজনীন পেনশন নিয়ে সাধারণ মানুষের সাড়া এখনো খুবই কম।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এপ্রিলের শেষে পেনশনের জন্য মোট নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৫২৪ জন। চলতি আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত এ সংখ্যা ৩ লাখ ৭৯ হাজার ১২ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ সাড়ে তিন মাসে নতুন গ্রাহক যুক্ত হয়েছেন মাত্র দেড় হাজারের মতো। তা ছাড়া ইতিমধ্যে নিবন্ধিত গ্রাহকদের বড় একটি অংশ নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করছেন না।

পেনশন কর্তৃপক্ষের কাঠামো অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী যেকোনো নাগরিক এতে অংশ নিতে পারেন। এতে ১৮ বছর বয়সে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা কিস্তি দিলে ৬০ বছর পর পাওয়া যাবে মাসে ৩৪ হাজার টাকার কিছু বেশি।

অপরদিকে, ৫০ বছর বয়সে মাসে ১০ হাজার টাকা জমা দেওয়া শুরু করলে মাসিক পেনশন মিলবে ১৫ হাজার টাকার কিছু বেশি। চালু থাকা চারটি স্কিমের মধ্যে বেসরকারি খাতের কর্মীদের ‘প্রগতি’ স্কিমে অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি হলেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য গঠিত ‘প্রবাস’ স্কিমে সাড়া সর্বনিম্ন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রচারণার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনিশ্চয়তা এবং তহবিলের সুরক্ষা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকাই এর মূল বাধা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী টাইম অব বাংলাদেশকে জানান, দীর্ঘমেয়াদি এই ব্যবস্থার সফলতার জন্য বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক শ্রেণিকে যুক্ত করার স্পষ্ট রোডম্যাপ এবং কোথায় অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক হবে তা নির্ধারণ করা জরুরি। পাশাপাশি গ্রাহকের আমানত সুরক্ষিত থাকবে—এমন বিশ্বাস তৈরি করা আবশ্যক।

তহবিলের সুরক্ষার বিষয়টি প্রধান বাধা হিসেবে মেনে নিয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ কামরুল হাসান নিশ্চিত করেন, গ্রাহকদের টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকে সংরক্ষিত আছে। সরকার এটি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করছে না।

সম্প্রতি গ্রাহক বৃদ্ধির গতি ধীর হওয়ায় আস্থা বাড়াতে চুয়াডাঙ্গা, মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় মাঠপর্যায়ে সভা এবং ঢাকাসহ দেশব্যাপী ‘পেনশন সচেতনতা সপ্তাহ’ পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে চার কোটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে পেনশনের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও বর্তমান গতিতে তা অর্জিত হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে নতুন অর্থ বছরের মুনাফার হার নির্ধারিত না হওয়া সাধারণ মানুষের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে।

নীতিনির্ধারণী সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জিত না হলে এই উদ্যোগ কার্যকর সামাজিক সুরক্ষায় রূপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।