জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের আগের অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে। কিন্তু বর্তমান খসড়া আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্বও এমন বাহিনীর হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ থাকতে পারে। তিনি বলেন, “সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে বরং আরও উল্টো পথে তাদের পা বাড়িয়েছে।”
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ খসড়া আইন, ২০২৬: আইনি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।
এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক অ্যাডভোকেট আরমান হুসাইনের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আখতার হোসেন বলেন, গুমের ভুক্তভোগী কোনো পরিবার অভিযোগ করতে গেলে, অভিযোগ মিথ্যা হলে পাঁচ বছরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ফলে গুমের ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখানোর সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, “আমরা একটা ফেয়ার সিস্টেম বাংলাদেশে চাই। একটা জবাবদিহি চাই। বাংলাদেশের গণতন্ত্রটা আমরা সামনের দিকে নিয়ে যেতে চাই।” তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধুমাত্র আমলা ও বাহিনীর মতামতের ভিত্তিতে নয়, সাধারণ নাগরিকদের মতামতকে ধারণ করে নতুন করে আইনগুলো প্রণয়ন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান খসড়া আইন এভাবেই সংসদে পাস হলে মানবাধিকার সুরক্ষায় যে অগ্রগতি হয়েছিল, বাংলাদেশ আবার পিছিয়ে যাবে। “অতীতে তো বাহিনীগুলো গুম করত, মানবাধিকার লঙ্ঘন করত, তারা দায়মুক্তি পেত। তো সামনেও কি আমরা এরকম দেখতে চাই?”
তিনি বলেন, অতীতের মতো দায়মুক্তির সংস্কৃতি আর ফিরিয়ে আনা উচিত নয় এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে।
আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী শহীদুল আলম বলেন, “আমরা আজকে এখানে এইভাবে কথা বলতে পারছি—এটা একটা বিশাল ব্যাপার এবং এটাকে ভুলে গেলে চলবে না।” স্বৈরাচার চলে যাওয়ার পর একটি ভিন্ন বাংলাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্বশীল রাজনীতি নিশ্চিত করা জরুরি এবং রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গেলে জনগণের কথা যেন ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করা জনগণের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়িয়েছে, আমরা যদি ইনডেক্সটা দেখি… সেখানে সবচেয়ে নিচে এখন বাংলাদেশ।” বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশে স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনীর কারণে যদি দেশ চলে, তাহলে তো ওই কুকুর ওভাবেই নড়ছে এবং লেজ তার মতো করে ঠিকই নাড়াচ্ছে।”
শহীদুল আলম নিরাপত্তা বাহিনী সংক্রান্ত অভিযোগে এনএইচআরসির স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা বহাল, কমিশনার বাছাই প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা রক্ষা এবং গুম আইনের দুর্বলতা সংশোধনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নতুন সরকার অতীতের পথ থেকে সরে এসেছে—এটি শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, একটি জাতি বা রাষ্ট্রের একটি শক্ত আদর্শগত ভিত্তি প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পরও স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ, রাজাকার-নন-রাজাকারসহ নানা বিতর্ক সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে। তার মতে, এসব বিতর্কের কারণে রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যা ও মানুষের অধিকার-প্রাপ্তির বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর না করলে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব নয়। গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল বা দলীয়করণ করা হলে এগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না। বিশেষ করে গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছে দেওয়া নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি ও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া উচিত নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি এই ভুল পথ থেকে সরে এসে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর পুরোনো খাসলত বদলায় না কেন—এটি বোঝা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কিছু ওয়াদা করে, কিন্তু বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে না। এর পেছনে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকট রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা ও জবাবদিহিতার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করার পরিবর্তে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মানবিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মানুষকে অধিকার না দিলে তাকে মর্যাদা দেওয়া সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পুলিশ কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। রাষ্ট্রের সংকট কাটাতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন, যার ভিত্তি হবে ক্ষমতার কাঠামো আলাদা করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি করা।
আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এই অমরত্বের ধারণাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি ও প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের পথ তৈরি করে। তাই শুধু নতুন রাজনৈতিক দল বা নতুন নেতৃত্ব এলেই হবে না; রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। তা না হলে নতুনরাও পুরোনোদের মতো হয়ে যাবে। তিনি বলেন, “জাতিগত খাসলত যদি না বদলায়, তাহলে যা কিছু নতুন তাকে পুরাতন বলিয়াই মনে হবে।”
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন যদি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে তা সরকারকে জবাবদিহি করতে পারবে না। গত ১৫-১৬ বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই সনদ ও নির্বাচনি ইশতেহারে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, “আপনারা ভোটের আগে বলে আসছেন, আপনারা ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করবেন, সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন করবেন, মানবাধিকার স্বাধীন করবেন। এটাও আছে নির্বাচন ইশতেহারে যে মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন হবে এবং এটাকে একটা গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড মেনে প্রতিষ্ঠা করা হবে। তো একটা কথাও তো আপনারা মানছেন না।”
তিনি আরও বলেন, পুরোনো মানবাধিকার ও গুম আইন বাতিলের সময় নতুন ও আরও ভালো আইন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বর্তমান খসড়া দেখে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমাদের কথা আমাদের ১০০ বার, হাজার বার বলতে হবে।”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন বলেন, গুম আইনের বিষয়বস্তু হলো শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গুম থেকে বিরত রাখা এবং এমন মেকানিজম তৈরি করা, যাতে তারা এ ধরনের অপরাধ করার আগে চিন্তা করে। কিন্তু বর্তমান খসড়ায় গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবার কোনো কমিশন বা নিরপেক্ষ বডির কাছে যেতে পারবে না। “অধ্যাদেশে ছিল যে, গুমের অভিযোগ তদন্ত করবে একটা কমিশন। আমরা মানবাধিকার কমিশনকে সে দায়িত্ব দেব, দিয়েছিলাম। কিন্তু এখানে কোনো কমিশন মেকানিজম রাখা হয়নি। আপনার পুলিশের কাছে দিতে হবে।”
মানবাধিকার কমিশন আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের অধ্যাদেশ তৈরির সময় প্যারিস প্রিন্সিপলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান খসড়ায় সেই নীতিমালার প্রাথমিক শর্তগুলো প্রতিফলিত হয়নি। “এই খসড়া অনুযায়ী যদি কোনো মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়, নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এটা দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর একটা কমিশন।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা যদি আমাদের দেশে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে না দিই, তাহলে আমাদের ভাগ্যে যেটা ঘটেছিল ২৪-এ, সেরকমই ভাগ্য হয়তো আবার আমাদের বরণ করতে হবে। কারণ প্রতিষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই।”
এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপ-প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, গুম প্রতিরোধের খসড়া আইনে গুম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দেওয়া হয়েছে। অথচ এই সরকারি বাহিনীগুলোই কিন্তু এই ধরনের সম্ভাব্য গুমের সাথে জড়িত থাকে এবং তারাই ঠিক করবে, গুম হয়েছে কি হয় নাই। মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগকারী পরিবারকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যিনি ভিকটিম, যারা গুমের ভিকটিম, তাদেরকে উল্টো শায়েস্তা করার একটা রাস্তা উনারা করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, পুলিশকে আগের মতো পরিচালনা করা হলে আগের মতোই আচরণ করবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাবিতে মিছিল করতে চাওয়া এক সাবেক সমন্বয়ককে আটকের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক ও সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। এখন তাদেরকে আপনি প্রতিবাদটাও করতে দেবেন না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয়করণ ও অপদস্ত করার অভিযোগও করেন তিনি।
সারোয়ার তুষার বলেন, এই ধরনের আইন করে আবারও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ তৈরি করা উচিত নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, আপনি যদি মনে করেন যে আপনার আগামী ১০ বছর একেবারে নিশ্চিন্ত, সেটা সবসময় যে হবে—ব্যাপারটা এরকম না। যেকোনো সময় মানুষের ক্ষোভ বিস্ফোরণে পরিণত হতে পারে। বিএনপি ক্ষমতায় এলেই দেশে কানসাট, ফুলবাড়িয়া, শনির আখড়া ঘটে।
গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবাধিকার নিশ্চিত করার জন্য সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা। জুলাই সনদে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, সুরক্ষা ও বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্পেসিফিক কোনো নির্দেশনা জুলাই সনদে রাখা হয়নি। আমাদের মনে হয়, অ্যাট লিস্ট টেনশনের পারপাস হলেও হয়তো দরকার ছিল।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের খসড়া আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নয় সদস্যের বাছাই কমিটির মধ্যে আটজনই সরকার সংশ্লিষ্ট। ফলে এই কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য সদস্য কারা হবেন, তা সহজেই বোঝা যায়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় একটি অংশ রাষ্ট্রীয় বা সরকারদলীয় জায়গা থেকে হয়। সেখানে তাদেরকেই যদি বিচার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়, যারা বেসিক্যালি সরকারি দলের আনুকূল্যেই এই পদগুলোতে বহাল থাকছেন, তাহলে মানবাধিকার কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। তাই মানবাধিকার কমিশনের নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দলগুলোর কনসেনসাসের ভিত্তিতে বাইপার্টিজান নিয়োগ দেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, আইন সংসদে পাস হওয়ার আগে নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট সবার মিলে সিভিল প্রেশার, নাগরিক প্রেশার ও রাজনৈতিক প্রেশার তৈরি করা দরকার। সংসদ সদস্যদেরও এই বিষয়টি নিয়ে ফাইট করার জন্য চাপ দিতে হবে। আইন যতক্ষণ পর্যন্ত সংসদে পাস না হয়, ততক্ষণ এই ফাইট চালিয়ে যেতে হবে।
মানবাধিকার কর্মী রুবি আমাতুল্লাহ বলেন, জনগণ সাহসের সঙ্গে কথা বলেছে, আন্দোলন করেছে এবং পরিবর্তন এনেছে। তাই শুধু একবার নয়, সাধারণ মানুষের কাছে বারবার গিয়ে এসব বিষয়ে কথা বলতে হবে। সমাজে পরিবর্তনের জন্য ফোর্সফুল ডায়লগ চালিয়ে যেতে হবে। জনগণকে বোঝাতে ব্যর্থ হলে সেটা আমাদের ব্যর্থতা।
তিনি বলেন, মানবাধিকার হচ্ছে বিচারের পিলার। কোনো অধিকার লঙ্ঘনই অবিচার এবং অবিচার হলে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কারণ শান্তি দাঁড়িয়ে থাকে বিচারের ওপর, আর বিচার দাঁড়িয়ে থাকে সত্যের ওপর। তাই সত্যকে সামনে আনতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে বড় পরিবর্তনের সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ নষ্ট না করে পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়; সত্যিকার পরিবর্তনের জন্য প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এজন্য জনগণকে সবসময় সচেতন ও সোচ্চার থাকতে হবে।
বৈঠকে শিক্ষাবিদ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি এসময় বলেন, সাম্প্রতিক তিনটি আইনি পরিবর্তনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করা হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত ক্ষমতা সীমিত করা এবং অভিযোগ অভিযুক্ত বাহিনীর কাছেই পাঠানোর ব্যবস্থা এর উদাহরণ। র্যাবের ক্ষেত্রেও প্রস্তাবিত তদন্ত কাঠামো স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করে না।
তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের সুরক্ষার যুক্তিতে স্বাধীন তদন্ত বন্ধ করা ঠিক নয়। দীর্ঘদিন পরও পুরোনো অপরাধের ঘটনায় কর্মকর্তারা আইনের আওতায় আসতে পারেন। এমনকি বহু বছর পরও সামান্য একটি সূত্র ধরে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উদ্ধার করা সম্ভব।
তবে সংবেদনশীল রাষ্ট্রীয় অভিযানের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তিনি স্বীকার করেন। এজন্য স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা বাতিল না করে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা ও আলাদা আইনি কাঠামো করা উচিত বলে মত দেন তিনি। তার মতে, স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করলে কর্মকর্তাদের প্রকৃত সুরক্ষা হবে না; বরং ভবিষ্যতে তারাই বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন।