আইনজীবীদের পেশাগত মানোন্নয়নের দাবিতে দফতরে এসে স্মারকলিপি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘বার কাউন্সিলের নেতা যারা আছেন তাদের কাছে প্রত্যাশা করবো, আপনারা আমাকে ঘেরাও করতে সাহস না করেন। অ্যাটলিস্ট এসে কাপ চা খেয়ে স্মারকলিপিটা দিয়ে দেন। চা খাওয়া যাবে। কিন্তু এই উদ্যোগ আপনাদের নিতে হবে। আপনাদের একটু না দৌড়ালে এটা হবে না।’
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবনে আইনজীবীদের জন্য একটি বেসরকারি ব্যাংকের উপশাখার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনজীবীদের পেশাগত মানোন্নয়নে প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা যদি আমরা পাই, আমরা ৮০ হাজার লইয়ারকে পর্যায়ক্রমিকভাবে ট্রেনিংয়ের আওতায় আনতে চাই।’
আইন পেশায় দক্ষতা বাড়াতে পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, বর্তমানে শর্টকাটে অনেকেই আইনজীবী হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পেশাগত প্রশিক্ষণের অভাবে দক্ষ আইনজীবী গড়ে উঠছে না। তিনি বলেন, ‘কারণ এটা একমাত্র প্রফেশন যাদের কোনও ট্রেনিং হয় না। আপনি চাকরিতে ঢুকেন, সরকারি চাকরিজীবীদের ট্রেনিং হচ্ছে। জজদের ট্রেনিং নিতে হচ্ছে। সবার ট্রেনিং আছে। কিন্তু লইয়াররা হলো মুরগির বাচ্চার মতো।’
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘দেখবেন গ্রামে যারা আমাদের মতো গ্রাম থেকে আমরা উঠে এসেছি। কাদামাটির গন্ধ আমাদের গায়ে লেগে আছে, তারা জানি। তা দিয়ে মুরগি যখন বাচ্চা ফুটাই, বাচ্চা ফুটানোর পরে বাচ্চাগুলো হাঁটা শুরু করে। তারপর মা যায় ধানটা, কুড়াটা এগুলো খেতে। বাচ্চাগুলো তার সঙ্গে কিন্তু খেতে খেতে আগায়। এবং এরকম করতে করতে ওই বাচ্চাটা বড় হয়ে যায়।’
আইনজীবীদের পেশাগত প্রশিক্ষণের অভাব বোঝাতে তিনি বলেন, ‘আমাদের লয়াররা সার্টিফিকেট পাওয়ার পরে কোর্ট-কাছারিতে সিনিয়রের পিছনে কালো কোট করে দৌড়াইতে দৌড়াইতে একদিন সেই সিনিয়র হয়ে যায়। এর মাঝামাঝি তার আর কোনও ট্রেনিংয়ের কোনও ব্যবস্থা নাই।’
আইনমন্ত্রী বলেন, সুপ্রিম কোর্টে প্রায় ১৭ হাজার আইনজীবী থাকলেও চূড়ান্ত শুনানি করার মতো আইনজীবী পর্যাপ্ত সংখ্যায় তৈরি করা যাচ্ছে না। আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, নিজেদের সমৃদ্ধ, প্রস্তুত ও প্রশিক্ষিত করার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বার কাউন্সিলের যে প্রশিক্ষণব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, বিগত বছরগুলোতে তা করা সম্ভব হয়নি। তাই বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের আইন পেশাকেও ঢেলে সাজাতে চান বলে জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের মাধ্যমে আইন পেশাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে হলে যা করা সম্ভব, তারা সেটা করতে চান। তবে এ জন্য বার কাউন্সিলের সদস্য ও আইনজীবীদেরও দায়িত্ব রয়েছে।
আইনজীবীদের পেশাগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় সরকারের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, পেশার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরকারের কাছে দাবি জানাতে হয়। কিন্তু গত ছয় মাসে তাঁর কাছে এ ধরনের কোনো দাবি জানানো হয়নি।
আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নামে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, পর্যায়ক্রমে প্রতিবছর এই বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে।
আইনজীবীদের পেশাগত পরিসরও ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহারসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ এখন নানা ধরনের বিরোধের সমাধান নিজেরাই করার চেষ্টা করছেন বলেও জানান তিনি।
বিচার বিভাগ থেকে সরকারের রাজস্ব আয় ও বিচার বিভাগের বাজেট নিয়েও কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোর্ট ফি ও ওকালতনামার মাধ্যমে বিচার বিভাগ থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা আয় হলেও পুরো বিচার বিভাগের জন্য বার্ষিক বাজেট দুই হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। তাঁর মতে, সুপ্রিম কোর্টের জন্য বরাদ্দও খুবই অপ্রতুল।
আইনজীবী পেশার মর্যাদা বাড়াতে বার কাউন্সিলকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বার কাউন্সিলকে সত্যিকার অর্থে শিক্ষায়-দীক্ষায়, মেধায়-মননে, প্রজ্ঞায়, ঘামে-শ্রমে এমন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলি, যে প্রতিষ্ঠান আগামী প্রজন্মের কাছে এই প্রফেশনের মানুষ প্রফেশনে আসার জন্য আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।’
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সভাপতি রুহুল কুদ্দুস কাজলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন ও সদস্য বদরুদ্দোজা বাদল প্রমুখ।