Image description
 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনও সংসদ সদস্য অসুস্থতা, বিদেশে অবস্থান কিংবা অন্য কোনও কারণে ভোট দিতে না পারলে তার হয়ে অন্য কোনও সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারবেন না। একইভাবে ওই সদস্যের অনুপস্থিতির কারণে তার ভোট অন্য কারও মাধ্যমে দেওয়ারও সুযোগ নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য ভোট না দিলে তার ভোটটি গণনায় আসবে না।

তবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেউ দলীয় প্রার্থীকে ভোট না দিলে কী হবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, এ ক্ষেত্রে ওই সংসদ সদস্যের সদস্যপদ বাতিল হবে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের (১) দফায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি সংসদ-সদস্যগণের দ্বারা নির্বাচিত হইবেন।’ অর্থাৎ জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রণীত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১০ ধারায় ভোটগ্রহণের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ধারার (১) উপধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হবেন। আর (২) উপধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীনে কোনো নির্বাচনে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি মাত্র ভোট থাকবে।

আইনের ১০(৩) ও ১০(৪) উপধারায় ভোট দেওয়ার পদ্ধতিও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। প্রত্যেক সংসদ সদস্য তার জন্য নির্দিষ্ট ব্যালট সংগ্রহ করবেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নামের বিপরীতে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট দেবেন। অর্থাৎ ভোটটি সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত ভোট।

ফলে কোনও সংসদ সদস্য ভোটের দিন অসুস্থতার কারণে উপস্থিত হতে না পারলে তার ভোট অন্য কোনও সদস্য দিতে পারবেন না। একইভাবে কোনও সংসদ সদস্য বিদেশে অবস্থান করলে দূতাবাস, অনলাইন বা অন্য কোনও সংসদ সদস্যের মাধ্যমে তার ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ১০ ধারায় নেই।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কীভাবে হয়

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনি কর্তা’ হিসেবে এই নির্বাচন পরিচালনা করবেন। এ জন্য জাতীয় সংসদ কক্ষে সংসদ সদস্যদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে নির্বাচনি কর্তা সভাপতিত্ব করবেন।

সংসদের অধিবেশন চলাকালে নির্বাচনের প্রয়োজন হলে কমিশন ভোটগ্রহণের অন্যূন সাত দিন আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটের সময়সূচি নির্ধারণ করবে। আর সংসদ অধিবেশন না থাকলে ভোটগ্রহণের দিনে স্পিকারের সঙ্গে অন্যূন সাত দিন আগে আলোচনা করে সংসদের বৈঠক সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আহ্বান করবে।

রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্যের প্রস্তাবক ও একজন সংসদ সদস্যের সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর থাকতে হবে। এছাড়া যিনি মনোনীত হবেন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে তার সম্মতিসূচক একটি বিবৃতিও থাকতে হবে। এই নির্বাচনে ভোটার হবেন সংসদ সদস্যরা। কমিশন একটি ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে।

বৈধ একাধিক প্রার্থী থাকলে এবং মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন শেষে একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদের বৈঠকে নির্ধারিত দিনে দুপুর ১২টার পর ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোটগ্রহণ যেমন প্রকাশ্যে হবে, তেমনি ভোট গণনাও প্রকাশ্যে অনুষ্ঠিত হবে। সর্বোচ্চ ভোট যদি একাধিক প্রার্থী পেয়ে যান, তবে তাদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার ফলাফল নির্ধারণ করবেন। ফলাফল ঘোষণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণাই চূড়ান্ত।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার কারা

সংসদ সদস্যদের ভোটের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের বর্তমানে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। আইন অনুযায়ী, তাদের নাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার তালিকায় তোলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনায় একজন নির্বাচিত প্রার্থীর অযোগ্য হওয়ায় চট্টগ্রাম-৪ আসনে কোনও ভোটার নেই।

সংসদে সাধারণ আসনে বিএনপির সংসদ সদস্য ২১১ জন, জামায়াতের ৬৮ জন, এনসিপির ৬ জন, অন্যান্য দলের ৭ জন ও স্বতন্ত্র ৭ জন রয়েছেন। আর সংরক্ষিত আসনে বিএনপি ও সমমনাদের ৩৬ জন, জামায়াত জোটের ১৩ জন ও স্বতন্ত্র একজন সদস্য রয়েছেন।

ভোটদানে বিরত থাকলে কী হবে?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনও সংসদ সদস্য যথাযথ কারণ ছাড়া ভোটদান থেকে বিরত থাকলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এ কোনও সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান নেই। আইনের ১০ ধারায় প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোটের কথা বলা হলেও ভোট না দেওয়ার জন্য জরিমানা, সদস্যপদ বাতিল বা অন্য কোনও শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়নি।

তবে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, কেউ উপস্থিত থেকে ভোট না দিলে সেটি দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। দলীয় প্রার্থীকে ভোট দিতে বলা হয়েছে, তাই ভোট দেওয়া উচিত। ভোট না দেওয়া মানে উপস্থিত থেকেও ভোট না দেওয়া। তিনি বলেন, কেউ সুস্থ অবস্থায় থেকে ভোট না দিলে তার সদস্যপদ যাওয়ার শামিল। আর দলের বিপক্ষে অন্য প্রার্থীকে ভোট দিলে অবশ্যই সদস্যপদ চলে যাবে।

কেউ ভোট দিতে পারা অবস্থায় না থাকলে বা বিদেশে থাকলে কী হবে জানতে চাইলে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, কেউ ভোট দিতে না পারলে, দেশের বাইরে থাকলে বা অসুস্থ থাকলে তিনি ছুটি নেবেন।

কতজন এমপি ভোট দিলে নির্বাচন হবে?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনও সংসদ সদস্য অনুপস্থিত থাকলে তার ভোট গণনায় না এলেও শুধু এ কারণে নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাবে, এমন বিধান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনের ১০ ধারায় নেই। আইনে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোটের কথা বলা হয়েছে এবং ভোট দেওয়ার ব্যক্তিগত পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংসদে ৩৫০ জন সদস্যের মধ্যে ২০ জন অসুস্থতা বা বিদেশে থাকার কারণে ভোট দিতে পারলেন না। তাহলে বাকি ৩৩০ জন সদস্য ভোট দিতে পারবেন। অনুপস্থিত ২০ জনের ভোট অন্য কোনও সদস্যের ভোটের সঙ্গে যোগ হবে না।

একাধিক প্রার্থী থাকলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ৯ ধারায় ভোটগ্রহণের জন্য নির্ধারিত দিনে সংসদ সদস্যদের বৈঠকের শুরুতে নির্বাচন কমিশনার প্রার্থীদের এবং তাদের প্রস্তাবক ও সমর্থকদের নাম ঘোষণা করার কথা বলা হয়েছে। এরপর ১০ ধারায় নির্ধারিত পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করা হয়।

প্রকাশ্য ভোট, তবে ব্যালটে

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, এটি ‘প্রকাশ্য ভোট’। তবে ভোট দেওয়ার জন্য ব্যালট পেপার ব্যবহার করা হয়। ব্যালটের নির্দিষ্ট অংশে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যকে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করতে হয় এবং যে প্রার্থীকে ভোট দেবেন, তার নামের বিপরীতেও নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট দিতে হয়।

অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একজন সংসদ সদস্যের ভোট অন্য কেউ দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে কোনও সদস্য অসুস্থতা, বিদেশে অবস্থান বা অন্য কোনও কারণে ভোট দিতে না পারলে তার ভোটটি বাদ দিয়েই উপস্থিত সদস্যদের ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল

গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সাংবিধানিক সংস্থাটি জানায়, নির্বাচনি কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। এরপর থেকে শুরু হয় নির্বাচনের কার্যক্রম।

তফসিল অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন প্রার্থীরা। ১৬ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।

যাচাই-বাছাই শেষে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে কমিশন। একই দিন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদের মনোনয়নপত্রও বৈধ ঘোষণা করা হয়।

তফসিল অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট বিকাল ৪টা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। আর ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রবিবার (১৬ আগস্ট) ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২৬-এর মনোনয়নপত্র পরীক্ষার দিন ছিল। অলি আহমেদের দুটি মনোনয়নপত্র এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি মনোনয়নপত্র পাওয়া গেছে। অলি আহমেদের মনোনয়নপত্র সকালে বাছাই করে যথার্থতা পাওয়া গেছে এবং সেটি গ্রহণ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্রও যথার্থ পাওয়া গেছে। ফলে দুটি মনোনয়নপত্রই বৈধ।

তিনি আরও বলেন, ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের দিন এবং ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।