বিএনপির সরকারের প্রথম ৬ মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে ১৬ আগস্ট। অন্যদিকে, ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে রাষ্ট্রপতি হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেবেন ২০ অথবা ২১ আগস্ট। দায়িত্বশীল সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির শপথগ্রহণের পরপরই বর্তমান মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন করা হতে পারে।
এ নিয়ে বর্তমানে বিএনপির সর্বস্তরে আলোচনা ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হতে আগ্রহীদের মধ্যে যেমন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে; তেমনি অস্থিরতা ছড়িয়েছে বাদ পড়ার আশঙ্কায় থাকা মন্ত্রীদের মধ্যেও। উভয়পক্ষই প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের প্রভাশালী কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সিনিয়র মন্ত্রী ও নেতাদের কাছে দৌড়ঝাঁপ করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন।
আগ্রহীরা তদবির করছেন মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে; আর বাদ পড়ার আশঙ্কায় থাকা মন্ত্রীরা চেষ্টা চালাচ্ছেন টিকে থাকতে। তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বিএনপির মিত্র দলের সংসদ-সদস্য বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ মন্ত্রী হচ্ছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে। এছাড়া টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন ড. আসাদুজ্জামান রিপন।
গত ৬ মাসে বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর কাজের পারফরম্যান্স সন্তোষজনক নয় বলে আলোচনা আছে। এছাড়া বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে দু-একজনের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় বিষয়টি জোর আলোচনায় এসেছে। সূত্রমতে, এসব কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে সরকারের ভেতরে-বাইরে আলোচনা হচ্ছে।
ফলে মন্ত্রিসভার ওই সদস্যরা মনে করছেন, তারা কিছুটা ঝুঁকিতে রয়েছেন। সূত্রমতে, পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে তারা নিজেরাই দৌড়ঝাঁপ করছেন। পাশাপাশি নতুন যুক্ত হওয়ার আশায় অনেকেই ছুটছেন সিনিয়র মন্ত্রী ও নেতাদের বাসায় বাসায়। মন্ত্রিসভায় নতুন কারা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন, তা জানার চেষ্টা করছেন তারা। আগ্রহী নেতারা বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ভূমিকার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি দলের জন্য ত্যাগ-তিতিক্ষার বিষয়টি সামনে আনছেন।
এই কাজ করতে গিয়ে মন্ত্রিসভায় থাকা সদস্যদের অতীত ভূমিকারও কথাও টেনে আনছেন কেউ কেউ। তবে সূত্র জানাচ্ছে, এসব কর্মকাণ্ড এখনো শুধু বিএনপি নেতাদের অভ্যন্তরীণ আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর ওপরই নির্ভর করছে।
যদিও বেশকিছু সিদ্ধান্তের বিষয়ে সাম্প্রতিককালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বেশির ভাগ নেতার সঙ্গে তিনি পৃথক পৃথকভাবে কথা বলেছেন। কথা বলেছেন সংসদের সব হুইপ ও বিএনপির বেশ কয়েকজন যুগ্ম মহাসচিবের সঙ্গে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের মতে, দু-একজন ছাড়া প্রায় সবাই মির্জা ফখরুলকে মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। ফলে অনেকের ধারণা, মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের আগে এবারও প্রধানমন্ত্রী সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্বে এ মুহূর্তে কেউ নেই। গুঞ্জন রয়েছে, একজন সিনিয়র মন্ত্রীকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাকে আনা হবে তা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। অনেকের মতে, সালাহউদ্দিন আহমদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নেওয়া হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
তবে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানান, মন্ত্রিসভার রদবদল এবং তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ কিছু গণমাধ্যমে যে খবর ছড়ানো হয়েছে, তাতে তিনি বিব্রত।
একটি মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিমন্ত্রী যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রিসভায় রদবদল এটি সরকারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে এখন যে তিনটি মন্ত্রণালয় নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে, সেখানে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে রদবদল আসবে এটা নিশ্চিত। তিনি এও বলেন, ওই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আলোচনাও করা হয়েছে।
মন্ত্রিসভায় থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, বেশ কয়েকজন মন্ত্রী একাধিক মন্ত্রণালয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এক্ষেত্রে দু-একজন প্রতিমন্ত্রীর ‘পারফরম্যান্স’ তুলনামূলক অনেক ভালো। মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন হলে তারা পূর্ণ মন্ত্রীও হতে পারেন। এছাড়া সংসদ-সদস্য এবং বিএনপি ও সমমনা দলের দু-একজন নেতা টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রিসভায় নতুন করে জায়গা পেতে পারেন। সংসদ-সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ ছাড়াও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং ড. আসাদুজ্জামান রিপন মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন। এছাড়া সংসদের হুইপদের মধ্যে দু-একজনকে মন্ত্রী করা হতে পারে। বিএনপির ‘বঞ্চিত’ বলে আলোচনায় থাকা নেতারাও মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের দিকে তাকিয়ে আছেন। এদের মধ্যে ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে হামলা-মামলা ও নির্যাতন সহ্য করেও মূল্যায়ন না হওয়া নেতাদের নিয়ে আলোচনা বেশি। এদের মধ্যে, শামসুজ্জামান দুদু, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
ঢাকার একজন মন্ত্রী ও দেশের উত্তরাঞ্চলের ২ জন প্রতিমন্ত্রীর বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক আলোচনা ছড়িয়েছে। ফলে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন হলে তাদের অবস্থান কী হবে এ নিয়ে নেতাকর্মীরা অপেক্ষায় রয়েছেন।
সংসদ উপনেতা পদ কি এবারও শূন্য থাকবে? : এদিকে, জাতীয় সংসদের সরকারি দলের উপনেতা পদটি নিয়ে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি। সংসদীয় রীতিনীতি অনুযায়ী উপনেতা সাধারণত সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনটিতে বসেন। বর্তমানে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে বসতেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর পরের আসনটিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং তার পরবর্তী আসনটি সালাহউদ্দিন আহমদের। এখন যাকেই উপনেতা করা হোক তিনিই প্রধানমন্ত্রীর পাশে বসবেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ। তিনি রাষ্ট্রপতি পদে অন্যতম দাবিদার ছিলেন। সংসদ উপনেতা পদেও প্রবীণ হিসাবে বিবেচিত ছিলেন তিনি। কিন্তু এখন কাকে উপনেতা করা হবে সে বিষয়টি নিশ্চিত নয়। তবে নতুন কাউকে উপনেতা করা হলে সংসদের আসনের পুনর্বিন্যাস করতে হবে। তবে বিএনপির ইতিহাসে অতীতে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার কারণে উপনেতা পদটি ফাঁকা রাখার নজির রয়েছে।
১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারে সংসদ উপনেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। ২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এলে দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার কারণে অষ্টম সংসদে আর কাউকে সংসদ উপনেতা করা হয়নি। ওই সময় বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম সাইফুর রহমান ও ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকায় এ পদটি শেষ পর্যন্ত খালিই ছিল। আবার ২০০৮ সালের নবম সংসদে বিএনপি বিরোধী দলে গেলে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নাম আলোচনায় এলেও কাউকেই বিরোধীদলীয় উপনেতা করা হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতি হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বঙ্গভবনে যাওয়ার পর এবার সংসদ উপনেতা পদটি ফাঁকা রাখা হবে নাকি নতুন কাউকে বসানো হবে, তা স্পষ্ট নয়।
মহাসচিবের শূন্য পদ নিয়ে কৌতূহল : মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন ও সংসদ উপনেতার পাশাপাশি বিএনপির ‘মহাসচিব’ পদটি নিয়ে নেতাকর্মীদের মাঝে কৌতূহল তুঙ্গে রয়েছে। অতীতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব থেকে যেভাবে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ছিলেন, সেই আদলে বর্তমানে রুহুল কবির রিজভীকে অনেকেই ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসাবে বিবেচনা করছেন। তবে এই পদের দৌড়ে সিনিয়র নেতাদের একটি অংশ সক্রিয় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার পক্ষে যায় তা পুরোপুরি নির্ভর করছে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর ওপর।