চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইউনাইটেড চট্টগ্রাম পাওয়ার লিমিটেডের (ইউসিপিএল) এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ও স্বত্বাধিকারীদের ওপর হামলা করেছে স্থানীয় যুবদল নেতা আলী হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা। বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইউসিপিএল প্রকল্পের বাইরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এফএম এন্টারপ্রাইজের প্রকৌশলী শাহরিয়ার আমিরের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে কর্ণফুলী থানায় অভিযোগের পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে পুলিশের সামনেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের ওপর আবার হামলার চেষ্টা করা হয়।
হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন এফএম এন্টারপ্রাইজের প্রকৌশলী শাহরিয়ার আমির ও স্বত্বাধিকারী মো. দেলোয়ার হোসেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ও স্থানীয় সাংবাদিক জিন্নাত আয়ূবও হামলার শিকার হন।
এক মাস আগে ম্যানেজারকে মারধর
ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে প্রতিষ্ঠানের অংশীদার সাংবাদিক জিন্নাত আয়ূব বলেন, প্রায় এক মাস আগে আলী হোসেন তাঁদের এক ম্যানেজারকে আটকে রেখে মারধর করেছিলেন। এরপর একটি বৈঠকে আলী হোসেন ও তাঁর অনুসারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ওই এলাকায় কাজ করতে হলে চুক্তির ৫০ শতাংশ চাঁদা দিতে হবে। চাঁদা না দিলে সেখানে কাজ করা যাবে না বলেও তাঁরা জানান।
জিন্নাত আয়ূব বলেন, তাঁদের অধীনে থাকা ৩০ জন শ্রমিকের বেতন দিতে হয়। ৫০ শতাংশ চাঁদা দেওয়ার দাবি উঠলে তিনি এর প্রতিবাদ করেন। তবে কীসের ভিত্তিতে ৫০ শতাংশ দাবি করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট না করেই তাঁদের ক্রমাগত হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। চাঁদা দিতে না পারলে বাঁশখালীতে গিয়ে কাজ করতে বলা হয় বলেও তিনি জানান।
একটি বৈঠকের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ৬০ লাখ টাকার কাজের বিপরীতে এক পয়সাও চাঁদা দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে কাজ বন্ধ রাখার কথাও বলা হয়। অন্যদিকে ভিডিওতে আলী হোসেনকে বলতে শোনা যায়, এলাকার মানুষ বেকার, কিন্তু কারখানায় কাজ নেওয়ার জন্য তাঁদের লাইসেন্স বা কাজের অভিজ্ঞতা নেই। সংসদ সদস্যের সুপারিশেও কারখানার লোকেরা অভিজ্ঞতা খুঁজছে বলে তিনি ওই ভিডিওতে জানান।
চাঁদা না দেওয়ায় হামলা
প্রকৌশলী শাহরিয়ার আমিরের অভিযোগ, স্থানীয় যুবদল নেতা পরিচয়ে আলী হোসেন দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। কয়েকবার লোকজন নিয়ে এসে বলা হয়, এখানে ব্যবসা করতে হলে তাঁকে ৫০ শতাংশ চাঁদা দিতে হবে। মালিকপক্ষ এতে রাজি না হওয়ায় বুধবার সকালে আলী হোসেনের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁর পথ আটকে মারধর করে। স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে এলে তিনি কোনো রকমে রক্ষা পান।
জিন্নাত আয়ূব জানান, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় বুধবার সকালে প্রকৌশলী শাহরিয়ার আমিরের ওপর হামলা চালানো হয়। হামলার আরেকটি ভিডিও ফুটেজে হামলাকারীদের সাংবাদিক ও প্রকৌশলীকে মারধরের জন্য অন্যদের উসকে দিতে দেখা যায়। এ সময় ধাক্কাধাক্কির পাশাপাশি তাঁদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এরপর আহত প্রকৌশলী শাহরিয়ার আমিরকে নিয়ে তাঁরা কর্ণফুলী থানায় অভিযোগ করতে যান। অভিযোগ পেয়ে কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইখতিয়ার উদ্দিনের নির্দেশে বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নূরে আলম সিদ্দিকী তাঁদের নিয়ে ঘটনাস্থলে যান।
পুলিশের সামনেও হামলার চেষ্টা
শাহরিয়ার আমিরের অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর আলী হোসেন ও তাঁর লোকজন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পুলিশের উপস্থিতিতেই তাঁরা আবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের ওপর হামলার চেষ্টা করেন।
কর্ণফুলী থানার বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে ওসি স্যারের নির্দেশ অনুযায়ী পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ক্ষিপ্ত হয়ে দলবল নিয়ে হামলার চেষ্টা চালায়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।’
মেসার্স এফএম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনায় আলী হোসেনসহ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পুলিশ আমাদের আইনি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে এর সুষ্ঠু বিচার ও নিরাপত্তা কামনা করছি।’
আনোয়ারা উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক হারেছ আহমেদ বলেন, ‘সে (আলী হোসেন) যুবদলের পদধারী নেতা নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং সে কারানির্যাতিত নেতা।’
কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে।
যুবদল নেতা পরিচয়ে আলী হোসেনের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আলী হোসেন নামে বন্দর কমিউনিটি সেন্টারে কোনো যুবদল নেতাকে আমি চিনি না। আপনারা তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিন।’