চট্টগ্রাম অঞ্চলকে ঘিরে উন্নয়ন বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের মহাপরিকল্পনা এবং স্বপ্ন এখন বাস্তবতা। এসব প্রকল্প বাস্তবেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে একের পর এক উদ্যোগের ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে। সেই সাথে সুযোগ তৈরি হচ্ছে ব্যাপক কর্মসংস্থানের। আনোয়ারায় চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) অবকাঠামো নির্মাণকাজ চলছে পুরোদমে। ওই শিল্প জোনে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হবে। কয়েকশ’ কারখানায় কর্মসংস্থান হবে লাখো মানুষের। একই এলাকায় দেশের প্রথম এবং সর্ববৃহৎ বেসরকারি ইপিজেড কোরিয়ান ইপিজেডেও ব্যাপক বিনিয়োগ আসছে। মীরসরাই শিল্পনগরেও কল-কারখানা চালুর প্রস্তুতি চলছে।
চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলী টানেল হয়ে আনোয়ারার শিল্পজোনের সাথে কক্সবাজারের মহেশখালীর জ্বালানি হাব, মাতারবাড়িতে জাপানের কাশিমা বন্দরের একই আদলে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী বহু সুবিধাসম্পন্ন গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ তৈরি হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারিত বে টার্মিনাল, মীরসরাই শিল্পনগর মিলিয়ে টেকনাফ থেকে ফেনী পর্যন্ত বিশাল সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় শিল্পায়ন, পর্যটন, আবাসনখাতে ব্যাপক উন্নয়ন বিনিয়োগ আসছে। মীরসরাই-সীতাকু- শিল্পনগরটিতে পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো সুবিধাসহ কল-কারখানা চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
এসব উন্নয়ন প্রকল্প দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের গতিশীলতা আনবে। সেই সাথে এই অঞ্চলে পর্যটন ও আবাসন খাতে সম্ভাবনা বাড়ছে।
কর্ণফুলী টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে সাড়ে চারশ’ কোটি টাকার তারকা মানের রিসোর্ট প্রস্তুত রয়েছে। পারকি সৈকতকে বিশ^মানের পর্যটন কেন্দ্রে উন্নীত করতে সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। বিশে^র দীর্ঘতম সৈকত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের উন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে নানা প্রকল্প। দক্ষিণ ও উত্তর চট্টগ্রামে একাধিক স্যাটেলাইট শহর গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তেল, গ্যাস, মৎস্যসম্পদসহ বিশাল সমুদ্র সম্পদ আহরণ শুরু হলে দেশের অর্থনীতি দ্রুত পাল্টে যাবে। তাতে বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত ‘ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনগঠন ও পুনরুদ্ধার’ প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি উন্নীত করার পথ সুগম হবে। কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এক ধাপ এগিয়ে যাবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে মানুষের জীবনমানের উন্নতি হবে।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পথে প্রধান বাধা গ্যাস, বিদ্যুৎসহ জ্বালানি সঙ্কটের অবসানেও ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোমে চীনের সহযোগিতায় দেশের তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। উপকূলের দ্বীপ ও চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমিতে স্বল্প খরচে সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশে সুলভে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণের প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী একটি টেকসই জ্বালানি উন্নয়ন পরিকল্পনাও নিয়েছে সরকার। বিদ্যমান ১২শ’ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ মহেশখালীর জ¦ালানি হাবকে আরো সমৃদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে।
এই অঞ্চলে সড়ক অবকাঠামো নির্মাণেও প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। কর্ণফুলী টানেল, আউটার রিং রোড, নগরীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয় চালু হয়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের পিএবি-টইটং আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়নে ১১৮৩ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা হবে। টেকনাফ থেকে মীরসরাই পর্যন্ত এলাকায় সাগর উপকূলে চালু হবে মেরিনড্রাইভ। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হয়ে এই অর্থনৈতিক হাবের সাথে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডোর বাস্তবায়নে অপরিহার্যতা বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দর এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে নেপাল, ভূটান, মিয়ানমারসহ প্রতিবেশি দেশগুলোও লাভবান হতে পারে। সেই সাথে দেশের সমুদ্রবন্দরের আয়বৃদ্ধি, আমদানি-রফতানিতেও আরো গতি আসবে।
দেশের অর্থনীতিকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একের পর এক উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। তার প্রচেষ্টায় চীনের শিল্পজোনের ১০ বছরের অচলাবস্থার অবসান হয়েছে। সেখানে এখন অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ চলছে। খুব দ্রুত সেখানে কল-কারখানা চালু হবে। গত রোববার দিনব্যাপী চট্টগ্রাম সফরকালে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে মীরসরাই থেকে মহেশখালী পর্যন্ত বিশাল এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পরিদর্শন করেন। পরে দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় বাঁশখালীর বাহারছড়া সমুদ্র সৈকতে এক বিশাল জনসভায় তিনি দেশের শিল্পের বিপ্লব ঘটানোর কথা বলেন। চীনের শিল্পজোনে কয়েকশ কল-কারখানা হবে এবং সেখানে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে বলেও জানান তিনি। তিনি সমুদ্র সম্পদের ব্যবহার নিশ্চিত করার কথাও বলেন।
পরে হাটহাজারীর সমাবেশে তিনি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে জ্বালানি নিশ্চয়তার বিষয়টি তুলে ধরেন। খুব সহসা জাতীয় সংসদে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই জ্বালানি রূপরেখা তুলে ধরারও ঘোষণা দেন তিনি। চট্টগ্রাম সফরকালে এ অঞ্চলকে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা উন্নয়ন-বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট এবং সেই সাথে সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করেছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর মুহাম্মদ সিকান্দার খান বলেন, বিনিয়োগ, শিল্পায়নের জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ভূ-প্রাকৃতিকভাবে সবচেয়ে সুবিধাজনক ও উপযুক্ত গন্তব্য। চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। চীনের একক বিনিয়োগে চট্টগ্রামে যখন কয়েকশ’ কল-কারখানা গড়ে উঠবে সেখানে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থানের পথ খুলে যাবে। চট্টগ্রামকে ঘিরে বন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর, পর্যটন, সামুদ্রিক সম্পদ বিশেষ করে খনিজ সম্পদ তেল গ্যাসের মজুদ থেকে উত্তোলন করতে পারলে আমরা স্বাবলম্বী জাতি হয়ে উঠতে পারি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য পূরণে আমাদের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। আর, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য অতীতের মতো চট্টগ্রাম নগরীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই।
কেননা জনবহুল নগর এলাকায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তাই চট্টগ্রামের বিস্তৃত এলাকায় বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এখন সরকার কর্তৃক সেই উদ্যোগই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চীন মিয়ানমার বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে চট্টগ্রামই হবে আঞ্চলিক অর্থনীতির হাব বা কেন্দ্রস্থল। এক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে অগ্রসর হতে হবে। দেশের বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা নিরাপত্তা স্বাভাবিক রাখা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত থাকাটা জরুরি। বিরোধী দলের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হিংসা হানাহানি বিশৃঙ্খলা কিংবা অবৈধ উপায়ে ক্ষমতায় আসার চিন্তা ভাবনা পরিহার করতে হবে। জনগণের স্বার্থে তাদের প্রত্যাশা হলো গঠনমূলক রাজনৈতিক চর্চা। সেই সঙ্গে বিনিয়োগ ও শিল্প এলাকায় রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো প্রসারিত করা অপরিহার্য। অন্যথায় চীন কেন; কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারীই আসবে না।
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তারেক রহমান অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা শুরু করেন। তার অংশ হিসাবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে তিনি একের পর এক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছেন। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোটি মানুষের কর্মসংস্থান এবং দেশে শিল্পবিপ্লব ঘটাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কোন বিকল্প নেই। বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে অবকাঠামো এবং জ¦ালানি খাতের উন্নয়ন করা হচ্ছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে এ অঞ্চলের বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। সরকার এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে শিল্পবিপ্লবের পাশাপাশি পর্যটন খাতেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সব ধরনের প্রচেষ্টা নিয়েছেন।
চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রাম সফরকালে শিল্পে বিপ্লব ঘটানোর যে ঘোষণা দিয়ে গেছেন সেটি সময়উপযোগী এবং প্রত্যাশিত। চট্টগ্রামকে ঘিরে একটি অর্থনৈতিক হাব গড়ে তোলার স্বপ্ন দীর্ঘদিনের। সেটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরেই বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর ফলে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি সহজ হয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে চীনসহ বিদেশি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থানের রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য মীরসরাই-সীতাকু- থেকে নগরীর কাট্টলী-হালিশহর-পতেঙ্গা হয়ে আনোয়ারা-বাঁশখালী-পেকুয়া-চকরিয়া-মহেশখালী মাতারবাড়ী পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভওয়ে কাম সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা অপরিহার্য গুরুত্বপূর্ণ। কেননা উত্তাল বঙ্গোপসাগর উপকূল দ্বীপ ও চরাঞ্চল বেষ্টিত এই অঞ্চলটি ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস, ঢল-বন্যা ও পানিবদ্ধতা তথা প্রতিনিয়ত দুর্যোগ প্রবণ অঞ্চল। এখানে উপকূল সুরক্ষার জন্য টেকসই সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা প্রয়োজন। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল টিকিয়ে রাখতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ। চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং আবহাওয়া-জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। এ অবস্থায় পরিবেশ প্রকৃতি ও জলবায়ু বান্ধব পরিকল্পনা উপেক্ষা করা যায় না।