ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর শেষ হয়েছে অনেকটা নীরবতায়। দুই দিনের এই সফরের আনুষ্ঠানিক আলোচ্যসূচি প্রকাশ করা হয়নি। তবে সফরকালে তিনি বাংলাদেশের নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। তার সঙ্গে ছিলেন সংস্থাটির আরও তিন কর্মকর্তা।
গত রোববার দুপুরে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে দিল্লি থেকে ঢাকায় আসেন পরাগ জৈন। তার সঙ্গে ছিলেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবাল রায় চৌধুরী। চার সদস্যের প্রতিনিধিদলটি ঢাকার একটি পাঁচতারকা হোটেলে অবস্থান করে। গতকাল সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে তারা একই এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল প্রথম তার ঢাকা সফরের খবর প্রকাশ করে। পরে দেশের সুখবর ডটকমসহ অন্য সংবাদমাধ্যমও বিষয়টি প্রকাশ করে। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরাগ জৈন সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক করেন। গুলশানে তার বাসভবনে এই বৈঠক হয়।
সূত্র জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের আমন্ত্রণে পরাগ জৈন ঢাকায় এসেছিলেন। এটি ছিল একটি নিয়মিত সফর। বাংলাদেশ থেকে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিদল যেমন ভারতে যায়, তেমনি ভারতের ‘র’-এর কর্মকর্তারাও নিয়মিত ঢাকায় আসেন।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সফরে দুই পক্ষ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ এবং মতামত বিনিময় করে। পরাগ জৈনের এবারের সফরেও এমন আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সফরটি শুধু একটি বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ‘র’-প্রধান ও তার প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের অন্য কয়েকটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার প্রধান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। ফলে সফরের পরিধি ছিল তুলনামূলক বিস্তৃত। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক নিয়েই এসব বৈঠকে কথা হয়ে থাকতে পারে।
এই সফরের সময়টিই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সম্ভাব্য ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণা এবং তাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লির সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ঢাকায় এসেছেন ভারতের ‘র’-প্রধান। গত জুলাইয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। একই সাক্ষাৎকারে তিনি দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার বা প্রাণহানির আশঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন।
এরপর গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। ওই বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে আপত্তি জানানো হয়। ঢাকার বক্তব্য ছিল, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য বলেছে, ওই অনুষ্ঠান ছিল বেসরকারি উদ্যোগের। এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। ফলে বিষয়টি নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হলেও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ‘র’-প্রধানের ঢাকা সফর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করতেই পরাগ জৈন ঢাকায় এসেছেন। এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অবশ্য ‘র’-এর মতো একটি বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের সফরের আলোচ্যসূচি সাধারণত প্রকাশ করা হয় না। ফলে তিনি কার সঙ্গে কী বিষয়ে কথা বলেছেন, তার পুরো চিত্র প্রকাশ্যে আসেনি।
তবে দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার সাম্প্রতিক যোগাযোগ এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি তৈরি করেছে। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশীদ চৌধুরী দিল্লি সফর করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ওই সফরে তিনি ভারতের ‘র’-প্রধান পরাগ জৈন এবং সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আর এস রমনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও ওই সফরের কথা নিশ্চিত করেছিলেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তখন বলা হয়েছিল, দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা হিসেবে এই যোগাযোগকে দেখা হচ্ছে।
প্রিন্ট জানিয়েছিল, দুই দেশের ভূখণ্ড যেন পরস্পরের স্বার্থবিরোধী কাজে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে একটি বোঝাপড়ার বিষয় আলোচনায় এসেছিল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এই দীর্ঘ সীমান্তে চোরাচালান, মাদক ও অস্ত্র পাচার, মানবপাচার এবং অন্যান্য আন্তসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি রয়েছে। জঙ্গিবাদ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাও দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সমন্বয় প্রয়োজন।
এ ছাড়া সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং ভিসা পরিস্থিতি নিয়েও দুই দেশের সম্পর্কের নানা বিষয় রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বৈঠকে রাজনৈতিক আলোচনার বাইরেও অনেক বিষয় উঠে আসতে পারে।
এর মধ্যে শেখ হাসিনার বিষয়টি অবশ্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত অনুরোধ আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনা যদি তার ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফেরেন, তাহলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে। বিমানবন্দর থেকে তাকে কীভাবে নেওয়া হবে, আদালতে আত্মসমর্পণের সময় কী ধরনের নিরাপত্তা থাকবে, গ্রেপ্তার হলে কোথায় রাখা হবে এবং বিচারিক কার্যক্রমের সময় নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্ন সামনে আসবে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাকে আইনের আওতায় আনা পরস্পরবিরোধী নয়। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিচার আইন অনুযায়ী চলবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তাই দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে যদি শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়ে থাকে, সেটিকে শুধু রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশও হতে পারে। তবে এমন আলোচনা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি নিশ্চিত তথ্য নেই।
পরাগ জৈনের সফরের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, একই সময়ে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
একই দিনে ‘র’-প্রধানের ঢাকা সফর হওয়ায় দুই ঘটনাকে পাশাপাশি রেখে দেখছেন অনেকে। তবে দুই বৈঠকের মধ্যে সরাসরি কোনো সমন্বয় ছিল কি না, তা বলার মতো তথ্য নেই।
গত দুই বছরে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিলেন শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তিনি ভারতে চলে যান। এরপর তার ভারতে অবস্থান, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অবশ্য দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যেও যোগাযোগের নজির দেখা যাচ্ছে। মার্চে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দাপ্রধানের দিল্লি সফর এবং এবার ভারতের ‘র’-প্রধানের ঢাকা সফর সেই ধারাবাহিকতারই ইঙ্গিত দিতে পারে।
তবে রাজনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তার রাজনৈতিক বক্তব্য এবং প্রত্যর্পণের দাবি দুই দেশের মধ্যে অস্বস্তির কারণ হয়ে আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত, পানি, ভিসা ও বাণিজ্যের মতো পুরোনো বিষয়।
এই অবস্থায় পরাগ জৈনের ঢাকা সফরের সবচেয়ে বড় বার্তা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নয়। বরং দুই দেশের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে যোগাযোগ আবার সক্রিয় হচ্ছে—এটাই বড় বিষয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল সফরটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। দ্য প্রিন্ট ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের আগের প্রতিবেদনগুলোও দেখিয়েছে, দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে যোগাযোগের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দ্য ডেইলি স্টারের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের সফর নিয়মিত যোগাযোগের অংশ। এসব তথ্য একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও নিরাপত্তা সহযোগিতা চালু রাখার চেষ্টা রয়েছে।
পরাগ জৈন কী বার্তা দিয়ে গেলেন—এর সরাসরি উত্তর এখনো অজানা। তবে তার সফর তিনটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। প্রথমত, ঢাকা ও নয়াদিল্লির নিরাপত্তা যোগাযোগ আবার দৃশ্যমান হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক অস্বস্তির মধ্যেও দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যোগাযোগ ধরে রাখতে চাইছে। তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার বিষয়টি দুই দেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হয়ে উঠেছে।
এখন দেখার বিষয়, এই সফরের পর দুই দেশের নিরাপত্তা যোগাযোগ কতটা বাড়ে এবং শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লির অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে কোনো অগ্রগতি হয় কি না। আপাতত পরাগ জৈনের সফরের আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য অপ্রকাশিত। কিন্তু সফরের সময়, বৈঠকের পরিধি এবং সাম্প্রতিক ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের প্রেক্ষাপট এটিকে নিছক একটি নিয়মিত সফরের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।