Image description
নিরীক্ষা প্রতিবেদন

রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের সুবিধার্থে সরকার শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দিয়ে আসছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ সুবিধা আরও বাড়ানো হয়েছে। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান সরকারি এ সুবিধার চরম অপব্যবহার করছে। এতে প্রতি বছর সরকার শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এমনি একটি চট্টগ্রামভিত্তিক গ্রুপ হচ্ছে ‘ফাল্গুন গ্রুপ’।

এই গ্রুপের দুটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হলো—জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেড ও মডিস্ট (সিইপিজেড) লিমিটেড। শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এ দুটি প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে। অভিযোগ রয়েছে, আমদানি করা এসব পণ্যের একটি অংশ রপ্তানি না করে অবৈধভাবে অপসারণ করা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ৭২২ কোটি টাকার বেশি শুল্ক-রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য রপ্তানি না করে অবৈধভাবে অপসারণের বিষয়ে প্রতিষ্ঠান দুটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস ও বন্ড কমিশনারেট। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামভিত্তিক ফাল্গুন গ্রুপের শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান জেএমএস গার্মেন্টস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি গত তিন বছরে বন্ড সুবিধায় বিপুল পরিমাণ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করেছে। তবে রপ্তানির শর্তে এসব পণ্য আমদানির সুবিধা নিলেও অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি পণ্য রপ্তানি না করে ওয়্যারহাউস থেকে বন্ডেড পণ্য অবৈধভাবে অপসারণ করেছে। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শন করে এ ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন বন্ড কর্মকর্তারা। তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদনে পণ্য অবৈধভাবে অপসারণের বিষয়টি উঠে এসেছে।

প্রতিষ্ঠানটির আমদানি-রপ্তানির তথ্যের সঙ্গেও ওয়্যারহাউসে থাকা পণ্যের হিসাবের মিল পাওয়া যায়নি। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামালের বিপরীতে নির্ধারিত পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। ফলে রপ্তানি শেষে ওয়্যারহাউসে যে পরিমাণ পণ্য থাকার কথা, বাস্তবে তারও হদিস পাওয়া যায়নি। বন্ডেড পণ্য অবৈধভাবে অপসারণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের প্রায় ৫৮৫ কোটি ৩২ লাখ ১৭ হাজার টাকা শুল্ক ফাঁকি দিয়েছে। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে বন্ড কমিশনারেট। শুধু বন্ড সুবিধার অপব্যবহার নয়, ব্যাংকঋণ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রপ্তানির শর্তে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না করায় তা ফোর্স লোনে রূপান্তরিত হয়েছে। এর পরিমাণ প্রায় ১১৭ কোটি ৯৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় ফেব্রিক্স ও বিভিন্ন অ্যাক্সেসরিজ

আমদানি করে। এসব কাঁচামাল দিয়ে পোশাক তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নথি ও পরিদর্শন তথ্যে দেখা গেছে, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্যের তুলনায় নির্ধারিত পরিমাণ রপ্তানি করা হয়নি।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বন্ড টু বন্ড পণ্য স্থানান্তরেরও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী, রপ্তানির উদ্দেশ্যে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে পণ্য রপ্তানির পর অব্যবহৃত কাঁচামাল ওয়্যারহাউসে মজুত থাকার কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির ক্ষেত্রে সেই হিসাবও মেলেনি। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের শুল্ক দাবি (ডিমান্ড) জারি করেছে বন্ড কমিশনারেট। সংশ্লিষ্ট শুল্ক কর্মকর্তারা বলছেন, সুদ, জরিমানাসহ চূড়ান্ত হিসাব করা হলে জেএমএস গার্মেন্টসের শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ফোর্স লোনের বিষয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত রপ্তানিকারকরা রপ্তানির অর্ডারে বিপরীতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল (চলতি মূলধন) হিসেবে ব্যাংক থেকে অগ্রিম ঋণ নিয়ে থাকেন। এ ঋণের মেয়াদ হয়ে থাকে সাধারণত ছয় মাস। আর রপ্তানিকারকরা আবেদন সাপেক্ষে এ ঋণ পরিশোধের জন্য আরও ৬ মাস মেয়াদ বাড়াতে পারেন। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে এ অগ্রিম ঋণ পরিশোধ না করলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এ ঋণকে ফোর্স লোন হিসেবে রূপান্তর করে।

রপ্তানি করতে ব্যর্থ হলেই সাধারণত ফোর্স লোন তৈরি হয় বলেও জানান ব্যাংক কর্মকর্তারা। আর রপ্তানি না করায় বিশাল অঙ্কের ফোর্স লোন তৈরি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে জেএমএস গার্মেন্টসের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির সুপারিশও করেছে নিরীক্ষা কমিটি।

বন্ড কমিশনারেট সূত্রে জানা গেছে, ফাল্গুনী গ্রুপের শুধু জেএমএস গার্মেন্টসেই নয়, একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে গ্রুপের আরেক প্রতিষ্ঠান মডিস্ট (সিইপিজেড) লিমিটেডের বিরুদ্ধেও। চট্টগ্রাম ইপিজেডের এ প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রপ্তানিমুখী হিসেবে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় ফেব্রিক্স, অ্যাক্সেসরিজ ও কেমিক্যাল আমদানি করে। এসব কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করার কথা। তবে বন্ড কমিশনারেটের তথ্য অনুযায়ী, আমদানি করা পণ্যের পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রপ্তানি করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্য অন্য বন্ডেড প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরেরও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রতিষ্ঠানটির তিন বছরের নথি ও কার্যক্রম পর্যালোচনা করে ১৩৭ কোটি টাকার বন্ডেড পণ্য অবৈধভাবে অপসারণের প্রমাণ পেয়েছে নিরীক্ষা কমিটি। আমদানি-রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণ করে ওয়্যারহাউসে যে পরিমাণ পণ্য থাকার কথা, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম পণ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শুল্ক সুবিধায় বিপুল পরিমাণ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করা হলেও তার বিপরীতে নির্ধারিত পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়নি। আবার রপ্তানি শেষে অবশিষ্ট থাকার কথা যে কাঁচামাল, সেটিও ওয়্যারহাউসে পাওয়া যায়নি।

এ অবস্থায় বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট শুল্ক কর্মকর্তারা। তাদের মতে, ওয়্যারহাউস থেকে বন্ডেড পণ্য অবৈধভাবে সরিয়ে নেওয়া গুরুতর অনিয়ম। এ ঘটনায় অবৈধভাবে অপসারণ করা পণ্যের শুল্ক-কর পরিশোধের জন্য প্রতিষ্ঠানটির কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেট।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংকঋণ নিয়েও অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। দুটি ব্যাংকে মডিস্টের ঋণ ফোর্স লোনে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের একটি ব্যাংকে ২০ লাখ ৪৫ হাজার ৯৬৫ মার্কিন ডলারের ফোর্স লোন রয়েছে। অন্য একটি ব্যাংকে রয়েছে ৩১ মিলিয়ন টাকা। সব মিলিয়ে ফোর্স লোনের পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা। রপ্তানির শর্তে নেওয়া ঋণ পরিশোধ না করায় এসব ঋণ ফোর্স লোনে পরিণত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানির জন্য অর্থায়ন পেলেও প্রতিষ্ঠানটি নির্ধারিত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারেনি।

একদিকে ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যর্থতা, অন্যদিকে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামালের হিসাবেও বড় ধরনের অসংগতি। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অথচ কয়েক বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে বন্ড সুবিধা পেয়ে আসছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার মো. জাকির হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী যারা সঠিকভাবে শুল্ক-কর পরিশোধ করছে না, তাদের বিষয়ে নিরীক্ষা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে জেএমএসেরও নিরীক্ষা করা হয়েছে। এতে রপ্তানি না করে কাঁচামাল অবৈধভাবে অপসারণের তথ্য পাওয়া গেছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে দাবিনামা জারি করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির ফোর্স লোনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কত পরিমাণ কাঁচামাল ব্যবহার হয়েছে, তা নির্ধারণে এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। নিরীক্ষা ও তদন্তের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে জানতে জেএমএস গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুস্তফা মাহমুদের ফোনে একাধিকবার কল করলে তিনি কল রিসিভ করেননি। পরবর্তী সময়ে জেএমএস গার্মেন্টস ও মডিস্টের শুল্ক ফাঁকির বিষয়টি উল্লেখ করে খুদে বার্তা পাঠালেও তারও উত্তর মেলেনি।