স্কুলে না পাঠালে বাবা-মায়ের অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। রুশ পাসপোর্ট না নিলে সন্তানকে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকি। স্কুলে ইউক্রেনীয় ভাষার জায়গায় রুশ ভাষা। ইতিহাসের বইয়ে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলাকে দেখানো হচ্ছে পশ্চিমের বিরুদ্ধে ‘আত্মরক্ষার যুদ্ধ’ হিসেবে। আর বয়স একটু বাড়লেই পাঠ্যসূচিতে ঢুকছে গ্রেনেড, রাইফেল, ট্যাঙ্কবিধ্বংসী অস্ত্র, ড্রোন চালানো ও যুদ্ধক্ষেত্রের চিকিৎসা।
রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে শিশুদের জীবন নিয়ে তিন স্বাধীন বিশেষজ্ঞের তদন্তে উঠে এসেছে এমনই এক বিস্তৃত ব্যবস্থা। তাদের সিদ্ধান্ত, বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি স্কুল বা শিবিরের ঘটনা নয়; ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর শুরু হওয়া একটি ব্যবস্থা ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর আরও দ্রুত, সংগঠিত ও বিস্তৃত হয়েছে। শিশুদের ইউক্রেনীয় পরিচয় দুর্বল করে রুশ নাগরিক পরিচয় গড়ে তোলা এবং একাংশকে ভবিষ্যতে রাশিয়ার সামরিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি ধারাবাহিক কাঠামো তাঁরা শনাক্ত করেছেন।
অরগানাইজেশান ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কোঅপারেশন ইন ইউরোপ (ওএসসিই)-র ‘মস্কো মেকানিজম’-এর আওতায় তদন্তটি করেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ স্টেফান উলফ, মানবাধিকার আইনবিশেষজ্ঞ এলিনা স্টেইনার্তে এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক এরভে আসেনসিও। ৪১টি ওএসসিই সদস্যদেশের উদ্যোগে ১৪ মে তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়। তিন বিশেষজ্ঞ জুনে ইউক্রেনে গিয়ে তিন সপ্তাহ ধরে তথ্য সংগ্রহ করেন। তরুণ-তরুণী, যাঁরা শিশু অবস্থায় রুশ দখলে এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। কথা বলা হয় দখল করা এলাকা থেকে পালিয়ে আসা শিক্ষক, ইউক্রেনীয় সরকারি কর্মকর্তা ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কাউন্সিল অব ইউরোপ এবং ওএসসিই-র আগের নথিও পরীক্ষা করেন তারা। প্রতিবেদনটি ৯ জুলাই ওএসসিই স্থায়ী পরিষদে উপস্থাপন করা হয়। রাশিয়াকে তদন্তে সহযোগিতার অনুরোধ জানানো হলেও মস্কো উত্তর দেয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্তে পাওয়া একটি সাক্ষ্য বিশেষজ্ঞদেরও স্তম্ভিত করেছে। একটি এলাকার স্কুলপ্রধান সশস্ত্র সেনাদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়েছিলেন বলে সাক্ষ্যে দাবি করা হয়েছে। লক্ষ্য ছিল সেই সব পরিবার, যারা সন্তানকে রুশ নিয়ন্ত্রিত স্কুলে পাঠায়নি কিংবা রুশ পাসপোর্টের আবেদন করেনি। বাবা-মাকে জানানো হয়, নির্দেশ না মানলে তাদের অভিভাবকত্বের অধিকার কেড়ে নেওয়া হতে পারে এবং সন্তানদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত চাপের মুখে পরিবারটি রাজি হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; জাতিসংঘ ও ওএসসিই-র আগের অনুসন্ধানেও একই ধরনের জবরদস্তির নজির রয়েছে।
ওএসসিই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সন্তানকে রুশ স্কুলে ভর্তি করতে অস্বীকার করলে বাবা-মাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে; রুশ পাঠক্রম পড়াতে না চাইলে শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতি, হয়রানি, বাড়িতে তল্লাশি কিংবা আটক হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইউক্রেনপন্থী মত প্রকাশ, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অবস্থান নিলেও শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদ বা তল্লাশির মুখে পড়ার ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
দখল করা অঞ্চলের স্কুলব্যবস্থার পরিবর্তনকেই তদন্তকারীরা পুরো কাঠামোর কেন্দ্র মনে করছেন। ওএসসিই বলেছে, রুশ পাঠক্রম সেখানে ইউক্রেনীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে জারি করা রুশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পর স্কুলে ইউক্রেনীয় ভাষায় শিক্ষা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়। কিন্ডারগার্টেন থেকে উচ্চবিদ্যালয় পর্যন্ত রুশ নাগরিক পরিচয় ও রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য তৈরিকে শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে বসানো হয়েছে।
ইতিহাসের বইও এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। একাদশ শ্রেণির একটি রুশ ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে ইউক্রেনে চলমান তথাকথিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ নিয়ে ২৯টি পৃষ্ঠা রাখা হয়েছে। সেখানে ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার আক্রমণকে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে তদন্তকারীদের দাবি। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নিচের বয়সের শিক্ষার্থীদের জন্যও একই ধরনের সংস্করণ দখল করা অঞ্চলে ব্যবহার হচ্ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর আগে ওই পাঠ্যক্রমকে শিশুদের বেআইনিভাবে মতাদর্শগতভাবে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা বলে সমালোচনা করেছিল।
শুধু ইতিহাস কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়। সাধারণ স্কুলশিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সামরিক প্রশিক্ষণ জুড়ে দেওয়ার প্রমাণও পেয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। অষ্টম থেকে একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মাতৃভূমির নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার মৌলিক বিষয়’ নামে একটি বাধ্যতামূলক পাঠ চালু হয়েছে। ওএসসিই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে অস্ত্র ব্যবহার, ড্রোন পরিচালনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসার মতো বিষয় রয়েছে। জাতিসংঘের আগের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় মোট ১৭০ ঘণ্টা পর্যন্ত সামরিক প্রশিক্ষণ থাকতে পারে যেখানে বিভিন্ন ধরনের গ্রেনেড, ছোট আগ্নেয়াস্ত্র, হাতে বহনযোগ্য ট্যাঙ্কবিধ্বংসী গ্রেনেড লঞ্চার এবং স্নাইপার রাইফেল সম্পর্কেও শেখানো হয়।
স্কুলের বাইরেও সামরিকীকরণের বিস্তার আরও বড়। রুশ রাষ্ট্রপৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ‘মুভমেন্ট অব দ্য ফার্স্ট’, ‘ইউনারমিয়া’, ‘ভোইন’ এবং অন্যান্য সংগঠনের মাধ্যমে শিশুদের সামরিক-দেশপ্রেমমূলক কর্মসূচিতে নেওয়া হচ্ছে। ‘ভোইন’ কেন্দ্রগুলোতে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের অস্ত্র ও ড্রোন পরিচালনার প্রশিক্ষণের তথ্য পেয়েছে তদন্তকারী দল। আবার একটি নৌ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে আট বছর বয়সী শিশুদেরও ড্রোন চালানো শেখানোর নজিরের কথা জানিয়েছে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে ভ্লাদিমির পুতিনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘মুভমেন্ট অব দ্য ফার্স্ট’ সোভিয়েত আমলের একটি সামরিক খেলা নতুন করে চালু করেছে। ২০২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে রুশ অধিকৃত ইউক্রেনেও তার বিস্তার ঘটেছে।
সেই খেলায় শিশুদের বিভিন্ন ‘সেনাদলে’ ভাগ করা হয়। অস্ত্র জোড়া লাগানো, ড্রোন পরিচালনা, হামলাকারী সেনার ভূমিকায় কৌশল অনুশীলন এবং সামরিক বাধা অতিক্রমের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর সঙ্গে রয়েছে সাইবার যুদ্ধ ও তথ্যযুদ্ধের অনুশীলনও। বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলার ছদ্মবেশে শিশুদের সামরিক সংস্কৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলাই এর একটি ফল।
এই ব্যবস্থার ব্যাপ্তিও দ্রুত বাড়ছে। তদন্তকারীদের হিসাবে, বছরে আনুমানিক ৫০ হাজার শিশুকে এমন ‘বিনোদনমূলক’ শিবিরে পাঠানো হচ্ছে, যেখানে রুশ জাতীয়তাবাদী শিক্ষা ও সামরিক কার্যক্রম থাকে। রাষ্ট্রীয় ‘মুভমেন্ট অব দ্য ফার্স্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত শিশুর সংখ্যা ২০২২ সালের প্রায় ৬০ হাজার থেকে এখন ৩ লাখ ৪০ হাজারের বেশি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় উঠে এসেছে।
তদন্তকারীরা সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে ধারাটির কথা বলেছেন, তার নাম দিয়েছেন ‘কনস্ক্রিপশন পাইপলাইন’—অর্থাৎ শিশু বয়স থেকে এমন একটি পথে নেওয়া, যার শেষ প্রান্তে থাকতে পারে রুশ সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক চাকরি।
রুশ পাসপোর্ট গ্রহণের চাপকে এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে ওএসসিই। শিক্ষা, চিকিৎসা, চাকরি, ব্যাংকিংসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে রুশ কাগজপত্র কার্যত বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সেই নাগরিকত্ব গ্রহণের পর দখল করা এলাকার ইউক্রেনীয় ছেলেদের ১৬ বছর বয়স থেকেই সেনায় যোগদানের প্রস্তুতিমূলক নোটিশ দেওয়া হচ্ছে এবং ১৮ বছর হলে তাঁদের রুশ বাধ্যতামূলক সামরিক ব্যবস্থার আওতায় নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, বিষয়টি শুধু সাধারণ বাধ্যতামূলক সেনাসেবায় সীমাবদ্ধ নেই। দখল করা অঞ্চল থেকে রুশ সেনাবাহিনীতে নেওয়া কিছু তরুণকে ইউক্রেনের বিরুদ্ধেই সম্মুখযুদ্ধে পাঠানো হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে দখলদার শক্তি কোনো অধিকৃত অঞ্চলের সুরক্ষিত ব্যক্তিকে নিজের সশস্ত্র বাহিনীতে কাজ করতে বাধ্য করতে পারে না।
রুশ পরিচয়পত্র না থাকলে চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা, শিক্ষা, ব্যাংকিং এবং যাতায়াতেও বাধা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে ইউক্রেনীয় ভাষা, ইতিহাস ও পরিচয় প্রকাশকে কিছু ক্ষেত্রে ‘নিরাপত্তার হুমকি’ হিসেবে বিবেচনার আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে। রুশ সেনাবাহিনীকে ‘অসম্মান’ করা কিংবা ‘নাৎসিবাদ পুনর্বাসন’-এর মতো বিস্তৃত অপরাধের বিধানও ভিন্নমত দমনে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ।
এই ব্যবস্থার সঙ্গে শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড, বিভিন্ন সামরিক যুবসংগঠন, রুশ অর্থোডক্স চার্চ এবং রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততার কথাও জানিয়েছে তদন্তকারী দল।
শিশুদের মতাদর্শগত ও সামরিক প্রশিক্ষণের প্রশ্নটি আবার তাদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের বৃহত্তর অভিযোগের সঙ্গেও যুক্ত।
ওএসসিই-র জুলাইয়ের প্রতিবেদনে ইউক্রেনীয় সরকারি হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ২০ হাজার ৬১০ শিশুকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া বা জোর করে অন্যত্র স্থানান্তরের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে ২ হাজার ২৬৪ শিশুকে ফেরানো সম্ভব হয়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন মার্চে আলাদাভাবে বলেছে, তারা পাঁচটি অঞ্চল থেকে ১,২০০-র বেশি শিশুর জোরপূর্বক স্থানান্তর বা রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সরাসরি যাচাই করেছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত, শিশুদের নির্বাসন ও জোরপূর্বক স্থানান্তর এবং তাদের দীর্ঘদিন নিখোঁজ অবস্থায় রাখা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
মে মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নও ইউক্রেনীয় শিশুদের অবৈধ স্থানান্তর, রুশিকরণ, মতাদর্শগত প্রভাব ও সামরিক শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আরও ১৬ ব্যক্তি ও সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে
তিন বিশেষজ্ঞের আইনি মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুতর। তাঁদের মতে, দখল করা অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা বদলে দেওয়া হেগ রেগুলেশনের ৪৩ নম্বর ধারা এবং চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ৫০ নম্বর ধারার লঙ্ঘন। পাশাপাশি পরিচয়, পরিবার, শিক্ষা, মতপ্রকাশ ও বিবেকের স্বাধীনতা, স্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ শিশু অধিকার সনদের একাধিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।
আরও এক ধাপ এগিয়ে ওএসসিই বিশেষজ্ঞেরা বলেছেন, পরিকল্পিত ও ব্যাপকভাবে শিশুদের মতাদর্শগতভাবে প্রভাবিত করা এবং সামরিকীকরণের এই ব্যবস্থা নিপীড়নের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাঁদের প্রতিবেদনে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে নির্যাতন, অমানবিক আচরণ এবং শিশুদের অবৈধ স্থানান্তরের বিষয়ও চিহ্নিত করা হয়েছে।
রাশিয়া কী বলছে
নতুন ওএসসিই তদন্তে সহযোগিতার অনুরোধে রাশিয়া কোনো জবাব দেয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে রুশ কর্মকর্তারা দখল করা অঞ্চলের শিশুদের ‘দেশপ্রেমমূলক’ শিক্ষাকে গোপনও করছেন না। রুশ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এসব শিশুর মধ্যে ‘মাতৃভূমির অনুভূতি’ তৈরি করার কথা প্রকাশ্যেই এসেছে।
অন্যদিকে শিশু অপহরণ, জোর করে ‘রুশিকরণ’ কিংবা বেআইনি পুনঃশিক্ষার বৃহত্তর অভিযোগ বরাবর প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো। ২০২৫ সালে একই বিষয়ে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি প্রতিবেদনের জবাবে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটিকে ‘মনগড়া’ ও রাজনৈতিক প্রচার বলে দাবি করেছিল এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। মস্কোর দাবি, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শিশুদের নিরাপত্তার জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছে; ইউক্রেন ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয়।
‘শান্তিচুক্তি শুধু কিলোমিটারের হিসাব হতে পারে না’
তিন তদন্তকারীর শেষ সতর্কবার্তাটি যুদ্ধের ভবিষ্যৎ আলোচনাকে ঘিরে। তাঁরা বলেছেন, কোনো যুদ্ধবিরতি বা শান্তি আলোচনায় ভূখণ্ড, সীমান্ত কিংবা সেনা সরানোর প্রশ্নের পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা, পরিচয় এবং পরিবারের কাছে ফেরার অধিকারকে কেন্দ্রীয় বিষয় করতে হবে। রাশিয়াকে শিশুদের সামরিকীকরণ ও মতাদর্শগত প্রভাব বন্ধ, পরিবার ও শিক্ষকদের উপর চাপ প্রত্যাহার এবং স্থানান্তরিত শিশুদের ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানিয়েছে মিশন।
কিয়েভে তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলা এক ব্যক্তির কথাতেই প্রতিবেদনের শেষ সতর্কবার্তাটি সবচেয়ে সংক্ষিপ্তভাবে ধরা পড়ে, “যুদ্ধ শেষের কোনো চুক্তি শুধু কত কিলোমিটার জমি কার হাতে থাকবে, সেই হিসাব হতে পারে না।” কারণ এই তদন্তের দাবি সত্য হলে, যুদ্ধের মানচিত্রে শুধু সীমান্তই বদলাচ্ছে না। একটি প্রজন্মের ভাষা, ইতিহাস, পরিচয় এমনকি ভবিষ্যতে কোন দেশের হয়ে অস্ত্র ধরবে, সেই প্রশ্নটিও বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।